ডলারের দর বাড়ায় ফরওয়ার্ড-বুকিং করা আমদানিকারকদের ডলারপ্রতি ১ টাকা পর্যন্ত লাভ
দুই সপ্তাহ আগে ডলার ফরওয়ার্ড বুকিং করা আমদানিকারকরা এখন প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ ১ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পাচ্ছেন। কারণ কয়েক দিনের ব্যবধানে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩.৫০ টাকায় উঠেছে।
ব্যাংকের কয়েকজন ট্রেজারি কর্মকর্তার মতে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ডলারের বিনিময় হার ১২৩.৫০ টাকায় ওঠে, যা ১০ দিন আগেও ছিল ১২২ টাকা। এতে ভবিষ্যৎ ডলার পরিশোধের জন্য আগে থেকেই হেজিং করা ব্যবসায়ীরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
বড় পণ্য আমদানিকারক ও দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি) আমদানিকারকরা সাধারণত ডলারের দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় ফরওয়ার্ড চুক্তির মাধ্যমে বিনিময় হার আগেই নির্ধারণ করে রাখেন। কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও আগে ডলারের ঝুঁকি হেজ করত। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, এখন তারা আর তা করছে না।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, "ফরওয়ার্ড বুকিং আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি পদ্ধতি। আমদানিকারকরা যখন মনে করেন ডলারের দর অস্থির অথবা আরও বাড়তে পারে, তখন তারা ফরওয়ার্ড বুকিং বেছে নেন।"
ফরওয়ার্ড চুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে ডলারের বাজারদর চুক্তিতে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি হলে আমদানিকারক লাভবান হন। তবে ডলারের দাম কমে গেলেও তাকে চুক্তিতে নির্ধারিত দরেই অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
রেফাত উল্লাহ খান বলেন, "বর্তমানে ব্যাংকগুলো মূলত ভালো ট্র্যাক রেকর্ড ও দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং সম্পর্ক রয়েছে—এমন আমদানিকারকদের কাছ থেকেই ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের আবেদন গ্রহণ করছে।"
তিনি বলেন, "অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং ডলারের বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি এবং আমদানিকারকদের এটি ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। সমস্যা হলো, বর্তমানে অনেক ব্যাংক এই সুবিধা দিতে পারছে না।"
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ফরওয়ার্ড বুকিং ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ায় এবং একটি সুষ্ঠু বাজার নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা যথাযথভাবে চালু রাখা উচিত।
তিনি বলেন, "ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের সুবিধা পাওয়া যাবে—এই নিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।"
বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, গত দুই সপ্তাহে তারা প্রায় এক মাস পর পরিশোধযোগ্য আমদানি এলসির জন্য ডলার বুক করেছেন। ফলে পরিশোধের সময় ডলারের দাম আরও বাড়লেও তাদের চুক্তিতে নির্ধারিত দরেই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
একটি শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি আগস্টে ৩০ দিনের জন্য ২ কোটি ডলার হেজ করেছে। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২.৬০ টাকা।
ডলার লক-ইনের খরচ
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী জানান, দুই সপ্তাহ আগে ডলারের দর ১২২ টাকায় নেমে এলে তিনি এক মাস পরের একটি পেমেন্টের জন্য ডলার বুক করেন।
৩০ দিনের ফরওয়ার্ড প্রিমিয়াম যোগ করার পর কার্যকর বিনিময় হার দাঁড়ায় প্রতি ডলারে ১২২.৬০ টাকা। এখন ডলারের দর আরও বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটি ওই হারেই অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। তবে ডলারের দাম কমে গেলেও একই হারেই পরিশোধ করতে হবে।
আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এক মাস পরের পেমেন্টের জন্য ১২২.২০ টাকা দরে ডলার বুক করে। ফরওয়ার্ড প্রিমিয়াম যোগ করার পর কার্যকর খরচ দাঁড়ায় প্রতি ডলারে ১২২.৮০ টাকা।
ওই কর্মকর্তা বলেন, চলতি মাসের ১৩ আগস্ট ডলারের দর ১ টাকা পর্যন্ত কমে যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডলারের দর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় দুই সপ্তাহ আগে বিভিন্ন ব্যাংকে ফরওয়ার্ড বুকিং বেড়ে যায়।
দুই সপ্তাহ আগে যারা ডলার বুক করেছিলেন, তারা প্রতি ডলারে ১২৩ টাকার কম দরে তাদের পেমেন্ট নিষ্পত্তি করতে পারবেন। অথচ এক মাস আগে একই পেমেন্টের জন্য তাদের ১২৪ টাকার বেশি দিতে হতো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে না থাকায় ব্যাংকগুলোও ডলার ধরে রাখছে
ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামায় বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট ডলার বাজারে অনুপস্থিতিও প্রভাব ফেলেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ডলারের দর যখন কমতে শুরু করেছিল, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে হস্তক্ষেপ করলে দর সম্ভবত ১২২ টাকায় নেমে আসত না।
ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ ১২২.৮০ টাকা দরে ডলার কিনেছিল। এতে ব্যাংকারদের ধারণা হয়েছিল, দর ওই পর্যায়ের কাছাকাছি এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কোনো ডলার কেনেনি।
অনেক ব্যাংকের এখনও উচ্চ নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) রয়েছে। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক লেনদেনের প্রয়োজনের তুলনায় তাদের হাতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে। ফলে কিছু ব্যাংক কম দরে ডলার বিক্রি করতে অনাগ্রহী। কারণ এতে তাদের হাতে থাকা ডলারের ওপর লোকসান হতে পারে।
অন্য এক ব্যাংকার বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের বাইরে থাকলে ডলারের দর আরও কমতে পারে। তাই ব্যাংকগুলো এমন একটি পর্যায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার ডলার কেনা শুরু করতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ডলারের দর বাড়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রেতা হিসেবেও বাজারে হস্তক্ষেপ করলে বাজারের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, "এতে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ডলার ধরে রাখতে নিরুৎসাহিত হবে এবং বিনিময় হারকে আরও নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।"
সরকারি পেমেন্ট কমলে ডলারের ওপর চাপও কমতে পারে
সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের বাধ্যবাধকতার পরিবর্তনও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংকারদের মতে, এক সপ্তাহের মধ্যে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার প্রায় ১ টাকা কমে ১২৩.৬০ টাকা থেকে ১২২.৬০ টাকায় নেমেছে। পরে তা আরও কমে ১২২ টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংকাররা জানান, চলতি মাসে সরকারের ১০০ কোটি ডলারের বেশি পেমেন্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহেই প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পেমেন্ট নিষ্পত্তি হয়েছে।
গত মাসে সরকার প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পেমেন্ট করায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এটি ডলারের দর বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ব্যবসায়ীরা যদি মনে করেন ডলারের দর আরও কমবে, তাহলে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, "অনেক বড় আমদানিকারক গ্রুপ এখন মূল্যায়ন করছে, ডলারের দর আরও কমবে কি না।"
চলতি সপ্তাহে সরকারের কিছু এলসি পেমেন্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। এসব পেমেন্ট নিষ্পত্তি হয়ে গেলে ডলারের চাহিদা কমতে পারে। এর ফলে ডলারের বিনিময় হারের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
