আমদানি ব্যয় বাড়ায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে চলতি হিসাবের ঘাটতি
শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে থাকা আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে পারেনি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল (৯ আগস্ট) প্রকাশিত তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) ভিত্তিতে আমদানি ১০.৫ শতাংশ বেড়ে ৭১.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলার। আর খরচ, বিমা ও পরিবহন ব্যয়সহ (সিআইএফ) আমদানি পেমেন্ট ১০.১ শতাংশ বেড়ে ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এদিকে প্রবাসী আয় ১৭.৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
ব্যালান্স অভ পেমেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১.৫৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৩৮ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ১ শতাংশ কমে ৪৩.৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ২৭.২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২০.৪০ বিলিয়ন ডলার।
চলতি হিসাবের এই অবনতি আগের প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত। এর আগে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসায় চলতি হিসাবের ঘাটতিও কমছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, মে মাস পর্যন্ত চলতি হিসাবের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও পরে এতে অবনতি হয়েছে।
তিনি বলেন, 'চলতি হিসাবের অবস্থার অবনতি হয়েছে, যা মে মাস পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার অর্থ হলো বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে—আমদানি বেড়েছে এবং রপ্তানি কমেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি ব্যালান্স অভ পেমেন্টসে অস্বস্তি তৈরি করেছে।'
সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসা এবং এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পড়তে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মনসুর বলেন, 'গত দুই মাসে রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল, যা ডলারের বাজারের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিনিময় হার কিছুটা শিথিল করা এবং হার নির্ধারণে সীমা আরোপ না করা।
'ঈদুল আজহার পর থেকে দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। ফলে ডলার অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসতে পারত।'
ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রস্তাবিত বিনিময় হার এবং অনানুষ্ঠানিক বাজারের হারের ব্যবধান বাড়তে দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন মনসুর। তার মতে, এ ব্যবধান বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অভ ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, 'রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়তে পারত।'
আর্থিক হিসাবে উন্নতি
চলতি হিসাবে অবনতি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবের অবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে ৭.৮৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরে ৩.৫৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
আর্থিক হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাণিজ্য ঋণও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঋণে ৩.০৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক অবস্থান ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য ঋণের উন্নতি আর্থিক হিসাবকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মনসুর বলেন, 'বাণিজ্য অর্থায়নের উন্নতির ফলে আর্থিক হিসাব শক্তিশালী হয়েছে। বাণিজ্য ঋণ ৩ বিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক অবস্থানে এসেছে, যেখানে আগের অর্থবছরে এটি নেতিবাচক ছিল। অন্যদিকে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ—উভয় ক্ষেত্রেই আর্থিক হিসাবের উন্নতি হয়েছে।'
বাণিজ্য ঋণ বলতে এমন পণ্য বা সেবা বোঝায়, যার মূল্য পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হয়। ব্যালান্স অভ পেমেন্টের হিসাবে এটি আর্থিক হিসাবের আওতায় স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এর মাধ্যমে আমদানির অর্থায়ন করা হয়।
এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক ব্যালান্স ৬.৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩.৩৯ বিলিয়ন ডলার।
এজাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক হিসাবের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে সামগ্রিক ব্যালান্স অভ পেমেন্টের উন্নতি হয়েছে। এ সময়ে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে।
