ছাত্রাবস্থায় ফেসবুকে ‘জিহাদের দাওয়াত’ নিয়ে যেভাবে নব্য জেএমবির ‘বোমারু’ হয়ে উঠলেন মামুন
অনলাইনে শুরু হওয়া যোগাযোগের পর সরাসরি সাক্ষাৎ। এরপর এনক্রিপ্টেড অ্যাপে মেলে নতুন পরিচয়। পড়াশোনা ও পরিবার ছেড়ে উসকানি দেওয়া হয় 'হিজরত'-এর। পাঠানো হয় এক আস্তানা থেকে আরেক আস্তানায়। সেখানে তথাকথিত ধর্মীয় শিক্ষার পর শুরু হয় বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ। আর কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই কলেজপড়ুয়া তরুণই হয়ে ওঠেন জঙ্গি সংগঠনের বোমা তৈরির অন্যতম কারিগর। সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা নথিতে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ধারাবাহিকতার বিবরণ পাওয়া গেছে।
এই তরুণের নাম মো. নাজমুল হাসান মামুন ওরফে 'বোমারু মামুন'। বয়স ২১ বছর, পিতা মো. ইসমাইল মীর। তার বাড়ি বরিশালের রূপাতলীতে। ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করার পর ঢাকার উত্তরার একটি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন তিনি। তবে ২০১৬ সালের পরীক্ষায় দুটি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ (ফেল) হন।
টিবিএসের হাতে আসা মামুন সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, কলেজে পড়ার সময়ই তার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ফেসবুকের একটি আইডি থেকে প্রথম তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আইডিটির নাম ছিল 'আবু মুসলিমাহ'। প্রথমে নানাবিধ ধর্মীয় বিষয়, পোস্ট ও ভিডিও পাঠিয়ে তার মন পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে সেই যোগাযোগ ধীরে ধীরে উগ্র 'জিহাদের দাওয়াত'-এ রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা ও শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে এই বোমারু মামুনকে। সবশেষ সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আরিফ নামের একজনকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর আস্তানা থেকে ১৩টি পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়। এই আরিফের কাছ থেকেই মূলত মামুনের নামটি জানতে পারে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক টিবিএসকে বলেন, 'আরিফের বাসা থেকে বোমা উদ্ধারের পরে বোঝা যায়, একটি প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা দলই এমন বোমার নেপথ্যে থাকতে পারে। এরপর বেরিয়ে আসে বোমারু মামুনের নাম। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।'
ফেসবুক থেকে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ 'থ্রিমা'
গোয়েন্দা নথির তথ্য অনুযায়ী, মামুনের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার গল্পটি কোনো দুর্গম পাহাড় বা গোপন আস্তানা থেকে শুরু হয়নি, বরং শুরু হয়েছিল সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে।
২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে 'আবু মুসলিমাহ'র আমন্ত্রণে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের একটি পার্কে সরাসরি দেখা করেন মামুন। নথিতে বলা হয়েছে, ওই অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারীর প্রকৃত নাম ছিল আবির ওরফে মুয়াজ। সরাসরি সাক্ষাতের পর তার সাথে আলাপচারিতার ধরন বদলে যেতে থাকে। সাধারণ ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে পড়াশোনা, পরিবার এবং প্রচলিত জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা। মামুনকে বোঝানো হতে থাকে যে—পার্থিব পড়াশোনা বা পরিবার তাঁর কোনো কাজে আসবে না; বরং আখেরাত ও 'জিহাদ'-এর পথই তাকে অনুসরণ করতে হবে।
এ পর্যায়ে এসে তাদের যোগাযোগ আর সাধারণ ফেসবুকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মামুনের মোবাইল ফোনে ইনস্টল করা হয় 'থ্রিমা' নামের একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ। সেখানে তাকে দেওয়া হয় নতুন সাংগঠনিক নাম—'আবদুল্লাহ' । মুয়াজের মাধ্যমে এরপর তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয় নব্য জেএমবির আরেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি 'ফায়ারউড' ওরফে মুসার সঙ্গে।
অর্থাৎ, একজন সাধারণ কলেজছাত্রকে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা, এরপর সরাসরি সাক্ষাৎ এবং শেষ পর্যন্ত এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়া—জঙ্গি নেটওয়ার্কে ভেড়ানোর প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।
'হিজরত' ও গোপন আস্তানায় বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ
২০১৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে আসে পরবর্তী বড় নির্দেশনা। নথির ভাষ্য অনুযায়ী, জঙ্গি নেতা মুসার নির্দেশে মামুনকে বাসা ছাড়তে বলা হয়। উত্তরার একটি বাস কাউন্টার থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছে একটি গোপন আস্তানায় রাখা হয় তাকে।
সেখানে তার সাথে আরও কয়েকজন তরুণ ছিলেন। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং কড়া পাহারার ব্যবস্থা ছিল। একই সঙ্গে সেখানে তাদের তাওহিদ, 'জিহাদ', ঈমান ও তওবাসহ উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শের পাঠ দেওয়া হতো।
প্রায় দেড় মাস পর তাকে আরেকটি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। নথিতে বলা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষার পরই তার কর্মকাণ্ডের ধরন বদলাতে শুরু করে এবং শুরু হয় বিস্ফোরক প্রশিক্ষণ।
চট্টগ্রামের পর মামুনকে সিলেটের একটি আস্তানায় নেওয়া হয়। সেখানে তার প্রশিক্ষক ছিলেন নৌবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া 'সবুজ পাখি' ওরফে মাহফুজ। প্রায় দুই মাস ধরে সেখানে তাকে সরাসরি হাতে-কলমে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এরপর প্রশিক্ষণের পরিধি আরও বাড়াতে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেকটি আস্তানায় নেওয়া হয়। সেখানে মাহফুজসহ অন্য দক্ষ প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে বিস্ফোরক তৈরির বিষয়ে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে ঝিনাইদহের আস্তানাতেও তাঁর প্রশিক্ষণ চলে। সেখানে তিনি টাইম বোমা, রিমোট বোমা এবং প্রেশার কুকার বোমা তৈরির বিশেষ কৌশল রপ্ত করেন।
ওলিও ইন্টারন্যাশনালে হামলা ও গুমের অভিযোগ
শুধু নিজে শেখাই নয়, নথির বর্ণনায়, একপর্যায়ে মামুন অন্যদেরও বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। অর্থাৎ, একজন নতুন সদস্য থেকে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনের প্রশিক্ষিত বোমা প্রস্তুতকারক হয়ে উঠছিলেন, এমন দাবি করা হয়েছে নথিতে।
২০১৭ সালের শুরুতে তার এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড আরও জোরদার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আস্তানায় থেকে অন্য সদস্যদের বিস্ফোরক সরবরাহ করা এবং সেগুলো নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার ওপর।
পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে ২০১৭ সালের আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকের যোগসূত্রের অভিযোগে বলা হয়েছে হামলায় ব্যবহৃত বোমা তৈরির সঙ্গে মামুন জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
হোটেল ওলিও মামলায় গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে একটি চক্রের সহায়তায় তিনি জামিন পান এবং সেপ্টেম্বরে কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামুন ওই মামলা থেকে পুরোপুরি খালাস পান বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মামুন নিজেকে নির্দোষ ভুক্তভোগী দাবি করে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, তিনি গুমের শিকার হয়েছিলেন।
আবারও সক্রিয় ও নতুন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ 'এলিমেন্ট'
তবে কারাগার থেকে মুক্তির পর নিজেকে ভুক্তভোগী সাজিয়ে তিনি আবারও নব্য জেএমবির সামরিক শাখার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। বর্তমানে মামুন এবং তার সহযোগী নেটওয়ার্ক 'এলিমেন্ট' নামের একটি সুরক্ষিত এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। তাদের যোগাযোগ ও প্রচারণার জন্য মূলত তিনটি গোপনীয় চ্যানেলের ব্যবহার শনাক্ত করেছে গোয়েন্দারা। এগুলো হলো— আত-তামকিন মিডিয়া : উগ্র মতাদর্শের দাওয়াত ও প্রচারণার জন্য; ফুরসান আল তৌহিদ: হুমকি প্রদান, প্রচারণা এবং হামলার দায় স্বীকারের বার্তা প্রচারের জন্য; ট্র্যাশ মিডিয়া: অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও গোপন নির্দেশনা আদান-প্রদানের জন্য।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, সাধারণ যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নজরদারি জোরদার হওয়ায় এই উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলো এখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করছে।
