রাশিয়ার শোধনাগারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, জবাবে ইউক্রেনের পেট্রোল পাম্প গুঁড়িয়ে দিচ্ছে রাশিয়া
ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখভ গাড়িচালকদের সতর্ক করে বলেছেন, 'দ্রুত জ্বালানি নিন এবং চলে যান।'
ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই শহরের দুটি পেট্রোল স্টেশনে সোমবার রুশ ড্রোন হামলা চালানো হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। এর আগে গত সপ্তাহে শহরটির বাইরে ক্রিভি রিহ এলাকায় একটি পেট্রোল স্টেশনে হামলায় তিনজন নিহত হন।
বেসামরিক জ্বালানি স্টেশনগুলোকে ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে রাশিয়ার হামলা এপ্রিল থেকে ব্যাপকভাবে শুরু হয়। শুরুতে এসব হামলা মূলত সম্মুখসারির কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে চালানো হলেও এখন হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।
একই সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতেও দুই দফায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
ইউক্রেনের জ্বালানি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নাফতো রিনক'-এর বিশ্লেষক ওলেক্সান্দর সিরেঙ্কোর হিসাবে, এ পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের অন্তত ২৪৬টি জ্বালানি স্টেশনে হামলা চালিয়েছে।
শুধু জুলাই মাসেই 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স' নামের উন্মুক্ত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানকারী একটি অলাভজনক সংস্থা রাশিয়ার ১১৪টি জ্বালানি স্টেশনে হামলার তথ্য যাচাই করেছে। এর আগের মাসে এই সংখ্যা ছিল ৬৬টি।
এই ধরনের হামলার ঝুঁকির কারণে পুলিশ গাড়িচালকদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজলে গাড়িচালকদের দ্রুত পেট্রোল স্টেশন ছেড়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের গাড়িও ফেলে যেতে হবে।
দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের একটি পুলিশ বাহিনী বলেছে, 'গাড়ি মেরামত করা সম্ভব, কিন্তু জীবন ফিরে পাওয়া যায় না।'
এসব হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং বেসামরিক মানুষও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
সিরেঙ্কো জানান, শুরুতে এসব হামলা তুলনামূলক ছোট আকারের দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন দিয়ে চালানো হতো। পরে রাশিয়া আরও বড়, ব্যয়বহুল ও বেশি ধ্বংসক্ষম ইরানি তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার শুরু করে।
একটি শাহেদ ড্রোনের দাম আনুমানিক ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সিরেঙ্কো বিবিসিকে বলেন, 'একটি পেট্রোল স্টেশনে পাঁচটি শাহেদ ড্রোন আঘাত হেনেছিল। এসব শাহেদের দাম ওই পেট্রোল স্টেশনের চেয়েও বেশি।'
কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখন আর কোনো সচল পেট্রোল স্টেশন অবশিষ্ট নেই। এর মধ্যে খারকিভ ও দনিপ্রো—এই দুই বড় শহরের সংযোগকারী সড়কও রয়েছে।
প্রতিবেশী পোলতাভা অঞ্চলের একটি বড় গ্রাম ওপিশনিয়ার আশপাশের সব পেট্রোল স্টেশনই ধ্বংস হয়ে গেছে।
গ্রামের প্রধান মিকোলা রিজনিক বলেন, 'আপনারা আমাদের শত্রুর কৌশল দেখতে পাচ্ছেন। তারা আমাদের জ্বালানি থেকে বঞ্চিত করতে চায়।' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিওতে তিনি জানান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জ্বালানি মজুত করা শুরু করেছে এবং হামলায় যাতে সব জ্বালানি একসঙ্গে নষ্ট না হয়ে যায়, সে জন্য বিভিন্ন স্থানে অল্প অল্প করে তা সংরক্ষণ করছে।
দক্ষিণ ইউক্রেনের মিকোলাইভ শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ও গাড়িচালক কাটেরিনা স্তোকোলিয়া বলেন, বিমান হামলার সতর্কসংকেত চলাকালে এখন সর্বত্রই পেট্রোল স্টেশনগুলো বন্ধ রাখার ব্যাপারে আরও কঠোর হচ্ছে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, 'এখন সবাই বিষয়টি মেনে নিচ্ছে, তাই এটি কোনো সমস্যা নয়। নিরাপত্তাই সবার আগে। এখন জ্বালানি নিতে না পারলে পরে নেবেন। কোনো দীর্ঘ সারি বা আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার ঘটনা নেই।'
স্তোকোলিয়ার ধারণা, এ ধরনের হামলা চালিয়ে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হলো 'সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে আমরা সরকারকে আত্মসমর্পণ করতে বা ইউক্রেনের স্বার্থের অনুকূলে নয়—এমন কোনো চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করি।'
আংশিকভাবে দখল হয়ে যাওয়া খেরসন অঞ্চলের ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রায় অর্ধেক পেট্রোল স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে।
আঞ্চলিক প্রশাসনের উপপ্রধান ওলেক্সান্দর তোলোকননিকভ বলেন, বাকি পেট্রোল স্টেশনগুলোতেও 'প্রায় প্রতিদিন' রুশ ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের শহর ত্রস্তিয়ানেতসে সব পেট্রোল স্টেশনই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সড়কে চলাচলকারী জ্বালানি ট্যাংকার থেকেই সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ শুরু করেছে। হামলার ঝুঁকি কমাতে এসব ট্যাংকার নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করছে।
ইউক্রেনের মানুষও কর্তৃপক্ষের পরামর্শ মেনে চলছেন বলে মনে হচ্ছে।
পেট্রোল স্টেশনগুলোর শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান 'বিআরএসএম নাফতা'-র কৌশলগত বিপণন বিভাগের প্রধান ওলেক্সান্দর মেলনিচুক বলেন, 'গ্রাহকেরা এখন আর দোকানের তাক ঘেঁটে আমরা কী কী পণ্য রেখেছি তা দেখছেন না।'
তিনি বলেন, 'তারা দ্রুত জ্বালানি নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে চলে যেতে চাইছেন।'
রুশ হামলায় তার প্রতিষ্ঠানটির আটটি পেট্রোল স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও দুটি স্টেশন হামলার পর পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য বিআরএসএম নাফতা তাদের পেট্রোল স্টেশনগুলোর প্রাঙ্গণে কংক্রিটের আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে। পাশাপাশি সেগুলোতে ড্রোন প্রতিরোধী জালও লাগানো হচ্ছে।
কিছু এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি কাজের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে এবং সেখানে উপস্থিত কর্মীর সংখ্যাও কমিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত ড্রোন হামলার কারণে ইউক্রেনের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।
ইউক্রেনের জাতীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ৪ শতাংশ পেট্রোল স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে এর প্রভাব সামগ্রিক জ্বালানি বাজারে খুবই কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'সম্মুখসারি বা রাশিয়ার সীমান্ত থেকে দূরের অঞ্চলগুলোতে জ্বালানি বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্টেশনগুলোর হারানো বিক্রির ঘাটতি পূরণ হয়ে গেছে।'
রাশিয়ার পরিস্থিতি অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালানোর পর দেশটির পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর ফলে রাশিয়ার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
রাশিয়ার জনপ্রিয় সংবাদপত্র ইজভেস্তিয়া গত সপ্তাহে জানিয়েছে, দেশটির মাত্র ২৮ শতাংশ পেট্রোল স্টেশনে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছিল।
রাশিয়ার মতো ইউক্রেন বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি সংরক্ষণাগারের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং দেশটি সড়কপথে ট্যাংকারে করে জ্বালানি আমদানি করে।
সিরেঙ্কো বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি বাজারে বিপুলসংখ্যক পেট্রোল স্টেশন রয়েছে। ফলে কোনো একটি এলাকায় একটি বা কয়েকটি স্টেশন হামলার শিকার হলে সাধারণত গাড়িচালকদের সামনে অন্য স্টেশনে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
তিনি বলেন, 'আপনি বিরক্ত হয়ে অন্য একটি পেট্রোল স্টেশনের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাবেন। ঠিক আছে, আপনার হিসাবের চেয়ে ১০ কিলোমিটার বেশি পথ যেতে হবে, কিন্তু সেটি খুব বড় কোনো সমস্যা নয়।'
সিরেঙ্কোর মতে, বরং স্থানীয় জ্বালানির দামের ওপর রাশিয়ার হামলার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধই বেশি প্রভাব ফেলছে।
সাধারণত পেট্রোল স্টেশনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশগুলো রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এর মধ্যে রয়েছে মাটির নিচে থাকা পেট্রোল ও ডিজেল সংরক্ষণের ট্যাংক।
