বুনোকে পোষ মানানোর অ-রূপকথা!
সোভিয়েত আমলের সেই বইটির কথা মনে আছে—ন। গের্নেৎ-এর 'বুদ্ধিমতী মাশা'? ছোট্ট মাশা বিপদে পড়লে ঘাবড়ে যায় না। সামনে যত বড় সমস্যাই আসুক, সে শক্তির সঙ্গে শক্তির লড়াইয়ে যায় না। বুদ্ধি খাটায়। কখনো প্রকাণ্ড হাঁসকে সামলাতে হয়, কখনো একগুঁয়ে গাধাকে নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। কিন্তু মাশা জানে, সবকিছুকে জোর করে নিজের মতো করানো যায় না। আগে বুঝতে হয় পরিস্থিতি। তারপর বের করতে হয় কৌশল।
বুনো প্রাণীকে পোষ মানানোর গল্পটাও যেন কিছুটা তেমন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে 'টেমিং ওয়াইল্ডলাইফ' শীর্ষক নিবন্ধে সে কাহিনি শুনিয়েছেন মার্কিন সাংবাদিক ইভান র্যাটলিফ। তবে এই গল্পে মাশা নেই। নেই কোনো জাদুর কৌশলও। আছে মানুষ আর বুনো প্রাণী। আছে দীর্ঘ সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাছাই এবং প্রজনন। আর আছে এমন এক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা প্রাণীর আচরণ থেকে তার জিন পর্যন্ত সবই খুঁটিয়ে দেখছেন।
পৃথিবীতে বুনো প্রাণীর সংখ্যা অগণিত। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতিকে মানুষ সত্যিকার অর্থে গৃহপালনের উপযোগী করতে পেরেছে। কেন? কেন কিছু প্রাণী মানুষের কাছাকাছি এসে থাকতে শিখল, মানুষের স্পর্শ মেনে নিল, এমনকি মানুষের সঙ্গই চাইতে শুরু করল? পাশাপাশি অন্যরা কেন রয়ে গেল বুনো?
হয়তো বুনোকে পোষ মানাতে গিয়ে মানুষকেও একটু মাশা হতে হয়েছিল—ধৈর্যশীল, কৌতূহলী, সতর্ক এবং বুদ্ধিমান। কারণ, কোনো প্রাণীকে শুধু ধরে এনে খাঁচায় রাখলেই সে গৃহপালিত হয় না। মানুষ তাকে খাওয়াতে পারে, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাকে ভয় দেখিয়ে বাধ্যও করতে পারে। কিন্তু গৃহপালন তার চেয়ে অনেক গভীর ব্যাপার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাণীর আচরণ বদলায়। বদলায় তার শরীরও। আর সেই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে নির্বাচন ও বংশগতির জটিল প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা এখন জানতে চাইছেন, এই বিশাল পরিবর্তনের চাবিকাঠি কি প্রাণীর জিনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হবে রাশিয়ার দক্ষিণ সাইবেরিয়ায়, নোভোসিবির্স্ক শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে একটি খামার আছে, যা বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ। চারদিকে বার্চবন। জায়গাটি ঘিরে আছে পুরোনো, মরচে ধরা লোহার ফটক। ভেতরে পাশাপাশি লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে আছে তারের খাঁচা। খাঁচাগুলোর একটির গায়ে লেখা—'মাভরিক'।
সেই খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ৭৬ বছর বয়সী জীববিজ্ঞানী লুদমিলা ত্রুত। তিনি নিচু হয়ে খাঁচার দরজার ছিটকিনি খুলতে খুলতে বললেন, 'হ্যালো! কেমন আছ?' কথাটা আমাকে উদ্দেশ করে নয়। খাঁচার ভেতরের প্রাণীটিকে বলা। রুশ ভাষা র্যাটলিফ বোঝেন না। কিন্তু তার গলার স্বর বুঝতে কোনো ভাষার দরকার হয় না। পোষা প্রাণীকে আদর করার সময় কুকুরের মালিকেরা যে কোমল, প্রায় মাতৃসুলভ স্বরে কথা বলেন, ত্রুতের গলাতেও ঠিক সেই সুর।
মাভরিক তার দিকে তাকিয়ে আছে। আকারে সে অনেকটা শেটল্যান্ড শিপডগের মতো। গায়ে লালচে-কমলা বাদামি লোম। বুকের সামনের দিকে সাদা একটি ছোপ। ত্রুতকে দেখেই তার লেজ নড়ছে। কখনো চিৎ হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। কখনো উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। যেন বহুদিনের পরিচিত কাউকে দেখে আদর পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
পাশের খাঁচাগুলোতেও একই দৃশ্য। সরু, খোলা দিকের শেডের দুই পাশে সারি সারি খাঁচা। ভেতরে ডজন ডজন প্রাণী। কেউ ডাকছে, কেউ লাফাচ্ছে, কেউ খাঁচার গায়ে উঠে আসছে। চারদিকে লোম, ডাকাডাকি আর অবাধ উত্তেজনার এক অদ্ভুত কোলাহল। তার ওপর দিয়ে ত্রুতের গলা শোনা যায়, 'দেখতেই পাচ্ছেন, সবাই মানুষের সংস্পর্শ চায়।'
আজ মাভরিকের ভাগ্যই সবচেয়ে ভালো। ত্রুত খাঁচার ভেতর হাত বাড়িয়ে তাকে তুলে নিলেন।
এই মাভরিক কুকুর নয়। শেয়াল।
আর এই জায়গাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাভরিক একা নয়। বনঘেরা, ঝোপঝাড়ে প্রায় ঢেকে যাওয়া এই খামারের ভেতরে তার সঙ্গে রয়েছে আরও কয়েক শ শেয়াল। তারা সবই পৃথিবীর একমাত্র গৃহপালিত রুপালি শেয়াল। বেশির ভাগের গায়ের লোম রুপালি কিংবা গাঢ় ধূসর। মাভরিকের রং তাই বিরল।
তবে এখানে 'গৃহপালিত' কথাটার অর্থ একটু ভেবে দেখা দরকার। এরা এমন শেয়াল নয়, যাদের জঙ্গল থেকে ধরে এনে মানুষ পুষেছে। এমনও নয় যে খাবার দিয়ে তাদের মানুষের উপস্থিতি সহ্য করতে শেখানো হয়েছে, যাতে সুযোগ পেলে মানুষ তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারে। এরা গৃহপালনের জন্য বেছে বেছে প্রজনন করানো শেয়াল। অর্থাৎ বহু প্রজন্ম ধরে এমন শেয়ালই বেছে নেওয়া হয়েছে, যারা মানুষের প্রতি ভয় কম দেখায়, মানুষের কাছে আসতে চায় এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী।
এই কারণেই মাভরিকের মতো একটি শেয়ালকে কোলে নিয়ে বসলে মনে হয়, সে যেন বহু পুরোনো কোনো বুনো প্রাণীর উত্তরসূরি। যেন সে মানুষের সঙ্গেই থাকার জন্য তৈরি। অথচ একসময় তার পূর্বপুরুষেরা ছিল বুনো শেয়াল। তাদের মধ্যে মানুষকে দেখে লেজ নাড়িয়ে এগিয়ে আসার কোনো স্বভাব ছিল না।
এই অদ্ভুত পরিবর্তনের পেছনে যে পরীক্ষাটি রয়েছে, সেটি শুরু হয়েছিল অর্ধশতাব্দীর বেশি আগে। তখন লুদমিলা ত্রুত নিজেই ছিলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। জীববিজ্ঞানী দিমিত্রি বেলিয়ায়েভের নেতৃত্বে নোভোসিবির্স্কের সাইটোলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা পশমের খামার থেকে ১৩০টি শেয়াল সংগ্রহ করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল আরও অদ্ভুত—নেকড়ে থেকে কুকুরে রূপান্তরের যে দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস হাজার হাজার বছর ধরে ঘটেছিল, তার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ যেন মানুষের চোখের সামনে ঘটিয়ে দেখা।
রূপকথায় মাশা এক বুদ্ধির খেলায় সমস্যার সমাধান করে ফেলে। এখানে সেই কাজের জন্য সময় লাগবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবে প্রশ্নটি প্রায় একই রকম: বুনোকে কীভাবে এমনভাবে বদলানো যায়, যাতে সে নিজেই মানুষের কাছে আসতে চায়?
বেলিয়ায়েভের শেয়ালগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শুধু মানুষের আচরণ বদলাবে না। বদলে দেবে নিজেদের শরীরও। আর সেই পরিবর্তনের সূত্র ধরেই বিজ্ঞানীরা পৌঁছাবেন আরও গভীর এক রহস্যের কাছে—গৃহপালিত প্রাণী হওয়ার ক্ষমতা আসলে কোথায় লেখা থাকে?
মাভরিক অবশ্য এই খামারের একমাত্র এমন শেয়াল নয়, নোভোসিবির্স্কের শেয়ালদের মধ্যে আলিসা নামে একটি শেয়াল এখন সেন্ট পিটার্সবার্গের বাইরে এক সচ্ছল পরিবারের পোষ্য। মানুষের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তো আছেই, পরিবারের হলুদ ল্যাব্রাডরের সঙ্গেও তার বেশ ভাব। কিন্তু আলিসা বা মাভরিকের মতো প্রাণীকে দেখে গৃহপালনের অর্থ কী, সেই প্রশ্নটি আরও একটু পরিষ্কার করা দরকার। কারণ, মানুষ কোনো বুনো প্রাণীকে হাতে তুলে বড় করলেই সেটি গৃহপালিত হয়ে যায় না। বাঘের বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকে হাতে করে খাওয়ালে, মানুষের গন্ধ ও স্পর্শে অভ্যস্ত করালে, সে বড় হয়ে তার পরিচর্যাকারীদের পরিবারের সদস্যের মতো মেনে নিতে পারে। কিন্তু সেই বাঘের সন্তান জন্মের মুহূর্তেই আবার বুনো হবে।
গৃহপালন কোনো একক প্রাণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফল নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের কাছাকাছি থাকা এবং বাছাই করে প্রজননের মধ্য দিয়ে একটি গোটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়, সেটিই গৃহপালন। দীর্ঘ সময়ে বুনো প্রাণীর অনেক সহজাত প্রবৃত্তিও হারিয়ে যায়। অর্থাৎ গৃহপালনের বড় অংশই লেখা থাকে জিনে।
তবে বুনো আর গৃহপালিতের সীমারেখা সব সময় এত পরিষ্কার নয়। ক্রমে জমতে থাকা প্রমাণ বলছে, গৃহপালিত প্রাণীরা নিজেরাও হয়তো এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। মানুষ তাদের পোষ মানানোর উদ্যোগ নেওয়ার আগেই কিছু প্রাণী মানুষের আশপাশে থাকতে শুরু করেছিল। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স ও গৃহপালন-বিষয়ক গবেষক গ্রেগার লারসনের ধারণা, প্রথম দিকের অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রেই—প্রথমে কুকুর, পরে শূকর, ভেড়া ও ছাগল—মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ এক অনিচ্ছাকৃত সহাবস্থানের পর্ব ছিল। 'গৃহপালন' শব্দটি শুনলে মনে হয়, মানুষ যেন ওপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রাণীকে বদলে দিয়েছে। আসল গল্প সম্ভবত তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।
আর সেই জটিল গল্পের সূত্র খুঁজতে নোভোসিবির্স্কের শেয়াল-পরীক্ষার গুরুত্ব এত বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ আছে। পরীক্ষাটি শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন সোভিয়েত জীববিজ্ঞানে জেনেটিক্স প্রায় নিষিদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, স্টালিনের আমলে কুখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী ত্রোফিম লাইসেঙ্কোর প্রভাবের কারণে মেন্ডেলীয় জেনেটিক্সের গবেষণা বেআইনি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জীববিজ্ঞানী দিমিত্রি বেলিয়ায়েভ এবং তাঁর বড় ভাই নিকোলাই এই বিজ্ঞানের সম্ভাবনায় গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। লুদমিলা ত্রুতের ভাষায়, তাঁর শিক্ষকের জেনেটিক্সের প্রতি এই বিশেষ আগ্রহের পেছনে বড় ভাইয়ের প্রভাব ছিল। কিন্তু তখন জেনেটিক্সকে 'ভুয়া বিজ্ঞান' বলে বিবেচনা করা হতো। দুই ভাই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মেন্ডেলীয় জেনেটিক্স নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলে বেলিয়ায়েভ পশম-প্রাণী প্রজনন বিভাগের পরিচালকের পদ হারান। নিকোলাইয়ের পরিণতি আরও ভয়াবহ। তাঁকে শ্রমশিবিরে নির্বাসন দেওয়া হয়। সেখানেই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
দিমিত্রি বেলিয়ায়েভ অবশ্য গোপনে জেনেটিক্সের কাজ চালিয়ে যান। নিজের গবেষণাকে প্রাণীর শারীরবৃত্ত নিয়ে গবেষণা হিসেবে দেখাতেন। তাঁর মাথায় ঘুরত একটি প্রশ্ন: নেকড়ের মতো এক প্রাণী থেকে কুকুরের এত বিচিত্র রূপ কীভাবে তৈরি হলো? তিনি জানতেন, উত্তরটি প্রাণীর অণুস্তরের পরিবর্তনের মধ্যেই খুঁজতে হবে। কিন্তু তখন, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরেও কোনো প্রাণীর পুরো জিনোমের ক্রম বিশ্লেষণ করার প্রযুক্তি ছিল না। তাই ইতিহাসের উত্তর খোঁজার জন্য বেলিয়ায়েভ এক অভিনব পথ নিলেন—ইতিহাসের ঘটনাটিই যেন নিজের হাতে আবার ঘটিয়ে দেখা। কুকুরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, কিন্তু কখনো গৃহপালিত না হওয়া রুপালি শেয়ালকে তিনি বেছে নিলেন।
১৯৫৮ সালে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী হিসেবে লুদমিলা ত্রুতের প্রথম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন পশমের খামারে ঘুরে সবচেয়ে শান্ত ও মানুষের প্রতি কম ভীত শেয়ালগুলো বেছে আনা। স্টালিনের মৃত্যুর পর জেনেটিক্সের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হয়েছিল। বেলিয়ায়েভ সাইবেরিয়ার নতুন প্রতিষ্ঠিত সাইটোলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স ইনস্টিটিউটে গবেষণা শুরু করলেন। তবু সতর্ক থাকতে হতো। গবেষণার ভাষায় জিনের কথা না এনে সেটিকে প্রাণীর শারীরবৃত্তের গবেষণা হিসেবেই উপস্থাপন করা হতো। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ একবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে এসে নাকি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, 'ওরা কি এখনো জেনেটিক্স নিয়ে আছে? ওদের কি ধ্বংস করে দেওয়া হয়নি?' বেলিয়ায়েভের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা এবং জেনেটিক্সের পক্ষে ক্রুশ্চেভের সাংবাদিক-কন্যার লেখা কয়েকটি ইতিবাচক প্রতিবেদনের আড়ালে শেয়াল-পরীক্ষাটি ধীরে ধীরে চলতে থাকে।
ফল আসতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। ১৯৬৪ সালের মধ্যে চতুর্থ প্রজন্মের শেয়ালগুলোই গবেষকদের আশা পূরণ করতে শুরু করেছে। ত্রুত আজও সেই প্রথম মুহূর্তটি মনে করতে পারেন, যখন একটি শেয়াল তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখে লেজ নাড়ল। কিছুদিন পর সবচেয়ে শান্ত শেয়ালগুলো এমনই কুকুরসুলভ হয়ে উঠল যে তারা গবেষকদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, মুখ চাটত। কখনো কখনো তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ গবেষকদেরও অবাক করে দিত।
সত্তরের দশকে পরীক্ষার একটি শেয়ালকে এক কর্মী সাময়িকভাবে নিজের বাড়িতে পোষ্য হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন। ত্রুত সেখানে গিয়ে দেখলেন, লোকটি শেয়ালটিকে কুকুরের মতোই দড়ি ছাড়াই হাঁটাচ্ছেন। ত্রুত ভয় পেয়ে বলেছিলেন, 'এভাবে করবেন না। হারিয়ে যাবে! এটা তো ইনস্টিটিউটের শেয়াল!' লোকটি বলেছিলেন, 'অপেক্ষা করুন।' তারপর শেয়ালটির নাম ধরে শিস দিলেন। শেয়ালটি সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল।
এদিকে শেয়ালগুলোর চেহারাতেও পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করেছে। মানুষের পছন্দের আচরণ বেছে বেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রজনন করানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের কান বেশি ঝুলে পড়ছে। গায়ে দেখা দিচ্ছে স্বতন্ত্র সাদা ছোপ। আশির দশকের শুরুতে ত্রুত বলেছিলেন, শেয়ালগুলোর বাহ্যিক চেহারায় যেন একসঙ্গে বিস্ফোরণের মতো পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।
১৯৭২ সালে পরীক্ষায় ইঁদুর যোগ হয়েছিল। পরে বেজি-জাতীয় ছোট মাংসাশী প্রাণী মিংক (উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে পশমের জন্য মিংক পালা হতো)। এ ছাড়া অল্প সময়ের জন্য নদীর উদবিড়াল নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। উদবিড়াল প্রজনন করানো কঠিন হওয়ায় সে পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইঁদুর ও মিংকের আচরণও শেয়ালের মতোই বদলাতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ শুধু শেয়ালের গল্প নয়, একই পরীক্ষায় অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বেছে নিলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছিল।
বেলিয়ায়েভের স্বপ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে প্রাণীর ডিএনএর সম্পর্ক খুঁজে বের করা। কিন্তু ঠিক যখন সেই কাজ করার মতো জেনেটিক প্রযুক্তি হাতে আসতে শুরু করেছে, তখনই পরীক্ষাটি অর্থসংকটে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণার অর্থ কমে গেল। গবেষকেরা কোনোরকমে শেয়ালগুলোর সংখ্যা টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ১৯৮৫ সালে ক্যানসারে বেলিয়ায়েভের মৃত্যু হলে ত্রুত গবেষণার দায়িত্ব নিলেন। অর্থ জোগাড় করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে লড়াই করতে হলো। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে পরীক্ষাটি বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার জেনেটিক্সের গবেষণা করতেন আন্না কুকেকোভা। রুশ বংশোদ্ভূত এ গবেষক বহুদিনের পরিচিত এই পরীক্ষাটির আর্থিক সংকটের কথা জানতে পারেন। শেয়াল-খামারের গবেষণা তাঁকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছিল। এবার নিজের গবেষণার বিষয় হিসেবে তিনি সেটিকেই বেছে নিলেন। ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ডন লার্কের সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের অনুদান পেলেন তিনি। এরই ভিত্তিতে ত্রুতের সঙ্গে কাজ শুরু করলেন আন্না কুকেকোভা। লক্ষ্য একটাই—বেলিয়ায়েভ যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছিলেন, এবার জেনেটিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেটিকে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া।
তবে মাভরিকের মতো বন্ধুসুলভ শেয়াল দিয়ে এই রহস্যের পুরো সমাধান সম্ভব নয়। তার পাশের রাস্তার ওপারেই রয়েছে একই রকম আরেক সারি তারের খাঁচা। সেখানে থাকা শেয়ালগুলো মানুষের কাছে এলেই ফোঁসফোঁস করে, দাঁত খিচায়, খাঁচার সামনে ছোবল মারার মতো করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গবেষকেরা এদের বলেন 'আক্রমণাত্মক শেয়াল'। বন্ধুসুলভ শেয়াল তৈরির পরীক্ষার ঠিক উল্টো পদ্ধতি এখানে চলে। প্রতিটি প্রজন্মে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক শেয়ালগুলোকে বেছে নিয়ে পরের প্রজন্ম তৈরি করা হয়। মাভরিকের এরা যেন ভয়ংকর যমজ। চাইলে রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ডক্টর জেকেল ও মিস্টার হাইডের কথাও মনে পড়তে পারে। একই পরীক্ষার দুই প্রান্তে যেন একই প্রাণীর দুটি বিপরীত রূপ: একদিকে মানুষের সান্নিধ্য খোঁজা মাভরিক, অন্যদিকে মানুষ দেখলেই দাঁত খিচিয়ে ওঠা তার প্রতিপক্ষ।
আর এই দুই দলের তুলনাই বিজ্ঞানীদের জন্য অমূল্য। একবার ত্রুত এমন একটি আক্রমণাত্মক শেয়াল দেখিয়ে বলেছিলেন, 'খেয়াল করুন, কতটা আক্রমণাত্মক। তার মা ছিল আক্রমণাত্মক। কিন্তু তাকে বড় করা হয়েছে একটি শান্ত শেয়ালের কাছে।' ঘটনাটি যেন প্রকৃতি আর লালন-পালনের পুরোনো বিতর্কে একটি উত্তর ছুড়ে দিল। একই পরিবেশে বড় হওয়া সত্ত্বেও শেয়ালটির আচরণ বদলায়নি। অর্থাৎ মানুষের প্রতি তার প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশের চেয়ে বংশগতির প্রভাবই বেশি। ত্রুতের ভাষায়, 'এখানে জিনই বদলায়।'
কিন্তু ঠিক কোন জিন? এখানেই গবেষণাটি কঠিন হয়ে ওঠে। 'বন্ধুসুলভ' বা 'আক্রমণাত্মক' আচরণ আসলে একটি মাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। এর ভেতরে ভয়, সাহস, কৌতূহল, নিষ্ক্রিয়তা, সক্রিয়তা—এমন অনেক আলাদা আলাদা আচরণ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য আলাদা করে মাপতে হবে, তারপর দেখতে হবে কোন জিন বা কোন জিনের সমন্বয় তার সাথে জড়িয়ে রয়েছে। আরও একটি প্রশ্ন আছে। মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য দায়ী জিনগুলোই কি শেয়ালের ঝুলে পড়া কান, গায়ের সাদা ছোপ কিংবা গৃহপালিত প্রাণীর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী? নোভোসিবির্স্কের বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী জিন মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পরে শরীরের অন্য বৈশিষ্ট্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এখন কুকেকোভার প্রথম কাজ আরও নির্দিষ্ট—শান্ত আচরণের সঙ্গে জিনের যোগসূত্র খুঁজে বের করা। প্রতি গ্রীষ্মের শেষে তিনি কর্নেল থেকে নোভোসিবির্স্কে আসেন। সেই বছরের জন্মানো শেয়ালছানাগুলোকে পরীক্ষা করেন। প্রতিটি গবেষক একই নিয়মে তাদের সঙ্গে আচরণ করেন। খাঁচা খোলা হয়। হাত ভেতরে নেওয়া হয়। শেয়ালছানাকে স্পর্শ করা হয়। পুরো ঘটনাটি ভিডিও করা হয়। পরে কুকেকোভা সেই ভিডিও খুঁটিয়ে দেখেন। শেয়ালছানার শরীরের ভঙ্গি, ডাকাডাকি এবং মানুষের উপস্থিতিতে অন্যান্য আচরণকে সংখ্যায় প্রকাশ করেন। সেই তথ্য আবার মিলিয়ে দেখা হয় তাদের বংশপরিচয়ের সঙ্গে—কোনটি শান্ত শেয়ালের সন্তান, কোনটি আক্রমণাত্মক শেয়ালের, আর কোনটি দুই দলের মিশ্র বংশের।
এইভাবে মাভরিকের লেজ নাড়ার মতো আপাত সরল একটি আচরণ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে জটিল জেনেটিক রহস্যের সূত্রে।
আমেরিকান ও রুশ গবেষকদের যৌথ দল এবার আরও গভীরে ঢুকল। গবেষণায় থাকা প্রতিটি শেয়ালের রক্ত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে তারা পুরো জিনোমে খুঁজতে লাগলেন—কোথায় শান্ত শেয়াল আর আক্রমণাত্মক শেয়ালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য। আচরণগত পরীক্ষায় পাওয়া ফলের সঙ্গে জিনগত তথ্য মিলিয়ে তাঁরা দুটি অঞ্চল চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো দুই ধরনের শেয়ালের মধ্যে বেশ আলাদা। সম্ভবত সেখানেই লুকিয়ে আছে গৃহপালনের গুরুত্বপূর্ণ জিন। তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে: গৃহপালন সম্ভবত কোনো একটিমাত্র জিনের কাজ নয়। বরং একসঙ্গে অনেক জিনে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ফল। গবেষণাপত্রটির ভাষায়, গৃহপালন নিজেই এক অত্যন্ত জটিল বৈশিষ্ট্য।
নোভোসিবির্স্ক থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মাইল পশ্চিমে, জার্মানির লাইপজিগে আরেকটি গবেষণাগারেও বিজ্ঞানীরা প্রায় একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। সেখানে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপলজির গবেষক ফ্রাঙ্ক আলবার্ট কাজ করছেন বেলিয়ায়েভের ইঁদুর নিয়ে। ২০০৪ সালে সাইবেরিয়া থেকে দুটি কাঠের বাক্সে করে তিনি পেয়েছিলেন বেলিয়ায়েভের পরীক্ষার ৩০টি বংশধর—১৫টি মানুষের প্রতি শান্ত, ১৫টি আক্রমণাত্মক। তাদের জিনোম পরীক্ষা করে আলবার্টের দলও এমন কিছু অঞ্চল খুঁজে পেয়েছে, যেগুলো শান্ত ও আক্রমণাত্মক আচরণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কোন জিন এই পার্থক্য তৈরি করছে, সেটি এখনো জানা যায়নি। তাই তাঁরাও ধীরে ধীরে সম্ভাব্য জিনের সংখ্যা কমিয়ে আনছেন।
একবার নির্দিষ্ট কোনো জিন বা জিনের পথ চিহ্নিত করা গেলে গবেষণার পরবর্তী ধাপ আরও বিস্তৃত হয়। একই ধরনের জিন অন্য গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যেও আছে কি না, তা খুঁজে দেখা যায়। কুকেকোভার কাছে এটাই আসল পরীক্ষা। মানুষের প্রতি শান্ত ও বন্ধুসুলভ আচরণের সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট জিন পাওয়া গেলেও শুধু তাকে 'গৃহপালনের জিন' বলা যাবে না। নিশ্চিত হতে হবে, একই জিন অন্য প্রাণীর গৃহপালনের ক্ষেত্রেও কাজ করেছে কি না। শেয়ালের উত্তর তখনই বড় উত্তর হয়ে উঠবে, যখন তার সঙ্গে কুকুর, শূকর, মুরগি, ঘোড়া কিংবা অন্য গৃহপালিত প্রাণীর জিনের গল্পের মিল পাওয়া যাবে।
সত্যি বলকে কি, এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো অপেক্ষা করছে একেবারে অন্য প্রান্তে—মানুষের নিজের মধ্যে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরভাবে গৃহপালিত প্রাণী যদি কোনোটি হয়ে থাকে, তবে সে মানুষ নিজেই কি না, সেই প্রশ্নও উঠতেই পারে। ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক এলেইন অস্ট্রান্ডারের মতে, গৃহপালিত প্রাণীদের শরীরে কী কী বদলেছে, তা বুঝতে পারলে মানুষের এই পরিবর্তনের ধারা, নিজের বিবর্তন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই শেয়াল-খামারের ফলাফলের জন্য শুধু প্রাণীবিজ্ঞানীরাই অপেক্ষা করছেন না। মানব জিনোম নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরাও তাকিয়ে আছেন।
তবে সবাই বেলিয়ায়েভের শেয়ালেই গৃহপালনের রহস্যের চাবিকাঠি দেখছেন না। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ লেইফ অ্যান্ডারসন বেলিয়ায়েভ ও তাঁর সহকর্মীদের কাজের গুরুত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু তিনি সন্দেহ করেন, মানুষের প্রতি শান্ত আচরণ আর গৃহপালিত প্রাণীর চেহারায় দেখা অন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর সম্পর্ক হয়তো এত সরাসরি নয়। একটি বৈশিষ্ট্য বেছে নিয়ে প্রজনন করালে অন্য বৈশিষ্ট্যও বদলে যেতে পারে—কিন্তু তাই বলে একটির কারণেই অন্যটি ঘটছে, এমন প্রমাণ এখনো নেই।
দুই মতের পার্থক্যটা বোঝার জন্য কল্পনা করা যাক, হাজার হাজার বছর আগে গৃহপালনের শুরুটা কীভাবে হতে পারে। দুই পক্ষই মোটামুটি একমত যে প্রথমে সেই প্রাণীরাই মানুষের কাছে এসেছিল, যাদের জিনগত কোনো পরিবর্তনের কারণে মানুষকে অন্যদের তুলনায় কম ভয় লাগত। তারা হয়তো মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেত। মানুষের বসতির আশপাশে থাকায় শিকারির হাত থেকে নিরাপদ আশ্রয়ও পেত। ধীরে ধীরে মানুষের কাছাকাছি থাকা তাদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠল। আর একসময় মানুষও বুঝল, এই প্রাণীগুলো তার কাজে লাগতে পারে। তখন শুরু হলো সচেতন বাছাই—সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে সহজে সামলানো যায় এমন প্রাণীগুলোকে রেখে তাদেরই প্রজনন করানো।
লুদমিলা ত্রুত এই পরিবর্তনকে খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করেন। গৃহপালনের শুরুতে কাজ করেছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন। পরে সেই জায়গা দখল করেছিল কৃত্রিম নির্বাচন—মানুষের বাছাই। কিন্তু এখানেই অ্যান্ডারসনের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য। বেলিয়ায়েভ ও ত্রুতের ধারণা যদি ঠিক হয়, তাহলে মানুষের প্রতি ভয় কমে যাওয়ার মতো একটি বৈশিষ্ট্য বেছে নেওয়াই হয়তো শরীরে গৃহপালিত প্রাণীর আরও কিছু পরিচিত বৈশিষ্ট্য টেনে এনেছিল—কোঁকড়ানো লেজ, ছোট শরীর, ঝুলে পড়া কান, গায়ের সাদা ছোপ।
অ্যান্ডারসন মনে করেন, এতে মানুষের ভূমিকা কম দেখানো হয়। মানুষ যখন প্রাণীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলল, তখন বুনো পরিবেশের অনেক চাপও আর থাকল না। বনে কোনো অদ্ভুত রঙের প্রাণী শিকারির চোখে সহজে পড়ে যেতে পারে। তাই গায়ের সাদা ছোপের মতো কোনো আকস্মিক জিনগত পরিবর্তন বুনো পরিবেশে টিকতে না-ও পারে। কিন্তু মানুষের আশ্রয়ে সেই প্রাণী নিরাপদ। বরং মানুষ যদি তাকে দেখতে সুন্দর মনে করে, তাহলে তাকে বেছে নিয়ে আরও প্রজনন করাতে পারে। অ্যান্ডারসনের ভাষায়, প্রাণীটির আচরণ বদলেছিল বলেই সব পরিবর্তন আসেনি; কিছু পরিবর্তন টিকে গিয়েছিল স্রেফ মানুষ সেগুলোকে আকর্ষণীয় মনে করেছিল বলে।
২০০৯ সালে শূকরের ওপর গবেষণা করে অ্যান্ডারসন তাঁর ধারণার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান। বিভিন্ন গৃহপালিত ও বুনো শূকরের গায়ের রঙের জন্য দায়ী জিনের পরিবর্তন তুলনা করে তিনি দেখতে পান, প্রাচীন কৃষকেরা সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্বাভাবিক রঙের শূকর বেছে নিয়েছিল। কেন? হয়তো বিচিত্র রং তাদের ভালো লাগত। অথবা গায়ের রঙের পরিবর্তনে শূকরগুলো পরিবেশে কম লুকোতে পারত, ফলে মানুষ সহজে তাদের দেখতে ও সামাল দিতে পারত।
নিজের গৃহপালন-জিনের সন্ধানে অ্যান্ডারসন এখন তাকিয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় থাকা গৃহপালিত প্রাণীটির দিকে—মুরগি। তার পূর্বপুরুষ লাল জাঙ্গলফাউল একসময় ভারত, নেপাল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে মানুষ তাদের খাবারের জন্য প্রজনন করাতে শুরু করে। অ্যান্ডারসন ও তাঁর সহকর্মীরা গত বছর গৃহপালিত মুরগির পুরো জিনোমের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় থাকা লাল জাঙ্গলফাউলের কয়েকটি গোষ্ঠীর জিনোম তুলনা করেন। সেখানে তাঁরা টি-এস-এইচ-আর নামে একটি জিনে এমন একটি পরিবর্তন দেখতে পান, যা শুধু গৃহপালিত মুরগির মধ্যে পাওয়া যায়।
এই জিনটি ঠিক কী করে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। অ্যান্ডারসনের ধারণা, এটি হয়তো মুরগির প্রজননচক্রের সঙ্গে যুক্ত। বুনো জাঙ্গলফাউল বছরে নির্দিষ্ট এক সময়ে প্রজনন করে। কিন্তু গৃহপালিত মুরগি মানুষের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরে একাধিকবার, প্রায় যেকোনো ঋতুতেই প্রজনন করতে পারে। প্রাচীন কৃষকদের কাছে এই বৈশিষ্ট্য ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। যে মুরগি বেশি প্রজনন করবে, তারই বংশ বাড়ানো হবে। একই ধরনের পার্থক্য দেখা যায় নেকড়ে ও কুকুরের মধ্যেও। নেকড়ে সাধারণত বছরে একবার, নির্দিষ্ট ঋতুতে প্রজনন করে। কুকুর বছরে একাধিকবার, প্রায় যেকোনো সময় প্রজনন করতে পারে।
অ্যান্ডারসনের ধারণা যদি শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মুরগি বা শূকর কিংবা কুকুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মানুষের নিজের ইতিহাস নিয়েও তা নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। হার্ভার্ডের জীববিজ্ঞানী রিচার্ড র্যাংহ্যাম এমন একটি ধারণা দিয়েছেন যে মানুষ নিজেও হয়তো এক ধরনের গৃহপালনের মধ্য দিয়ে গেছে। এ প্রক্রিয়া আমাদের শরীর ও আচরণ বদলে দিয়েছে।
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর, কিন্তু গভীর। একটি বুনো শূকর আর গৃহপালিত শূকরের পার্থক্য কী? একটি বুনো জাঙ্গলফাউল আর গোশত-আণ্ডার জন্য পোষা গৃহপালিত মুরগির পার্থক্য কী? অ্যান্ডারসনের মতে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে মানুষ আর শিম্পাঞ্জির পার্থক্যের প্রশ্নটির আশ্চর্য মিল আছে। অবশ্য মানুষকে শুধু 'গৃহপালিত শিম্পাঞ্জি' বলা যাবে না। কিন্তু কুকুর, মুরগি ও শূকরের গৃহপালনের জেনেটিক ইতিহাস বুঝতে পারলে মানুষের সামাজিক আচরণ কোথা থেকে এসেছে, তারও কিছু সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
মানুষের মস্তিষ্কে ১৪ হাজারের বেশি জিন সক্রিয় থাকে, অথচ তাদের অল্প কয়েকটির কাজ আমরা ভালোভাবে বুঝি। এর মধ্যে কোনগুলো সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা বের করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষকে নিয়ে তো শেয়ালের মতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাছাই করে পরীক্ষা চালানো সম্ভব নয়। মানুষের আচরণে জন্মগত পার্থক্য খুঁজে বের করার দাবিও তাই অত্যন্ত জটিল এবং সমস্যাপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত 'বুনোকে পোষ মানানোর অ-রূপকথা'র আসল শিক্ষা হল: মানুষ কখনো শুধু প্রাণীকে বদলায়নি। প্রাণীদেরও নিজেদের জিন, আচরণ ও বিবর্তনের পথ ছিল। কোথাও তারা নিজেরাই মানুষের কাছে এসেছে। কোথাও মানুষ তাদের বেছে নিয়েছে। কোথাও মানুষ একটি ছোট বৈশিষ্ট্যকে পছন্দ করেছে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই পছন্দই প্রাণীর শরীরে স্থায়ী হয়ে গেছে। মাশার রূপকথায় বুদ্ধি দিয়ে বিপদ সামলানো যায়। বিজ্ঞানের এই অ-রূপকথায় তার চেয়েও ধীর এক কাহিনি—জিনের সামান্য পরিবর্তন, মানুষের বাছাই, আর হাজার হাজার বছরের সহাবস্থান মিলেই কীভাবে বুনো পৃথিবী থেকে আমাদের ঘরের প্রাণীরা বেরিয়ে এসেছে।
মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের ডিএনএতে উঁকি দিয়েও অবশ্য কিছু চমকপ্রদ সূত্র মিলছে। ২০০৯ সালে ইউসিএলএর জীববিজ্ঞানী রবার্ট ওয়েন নেকড়ে ও কুকুরের জিনোম তুলনা করে একটি গবেষণার নেতৃত্ব দেন। সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল তাঁর এই সিদ্ধান্ত যে কুকুরের উৎপত্তি পূর্ব এশিয়ায় নয়, মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু গবেষণার আরও একটি ছোট্ট পর্যবেক্ষণ ছিল, যার গুরুত্ব তখন তেমন আলোচিত হয়নি। দুই প্রজাতির ডিএনএতে ডব্লিউবিএসসিআর১৭ নামের একটি জিনের কাছাকাছি ছোট একটি অংশে বড় পার্থক্য দেখা যায়। গবেষকেরা ধারণা করেন, কুকুরের প্রাথমিক গৃহপালনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ জিন হয়তো এই অঞ্চলে রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে একই জিনের সঙ্গে উইলিয়ামস-বয়রেন সিনড্রোমের আংশিক সম্পর্ক আছে। এই বিরল জিনগত অবস্থায় মুখাবয়বে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য, নাকের সেতু খাটো হওয়া এবং অস্বাভাবিক মাত্রায় মানুষের সঙ্গে মিশুক স্বভাব দেখা যায়। গবেষণাটি প্রকাশের পর ওয়েনদের কাছে সবচেয়ে বেশি ই-মেইল আসে এমন শিশুদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে। তাঁরা লিখেছিলেন, তাঁদের সন্তানদের আচরণে কুকুরের সঙ্গে আশ্চর্য মিল আছে—মানুষের আচরণ বুঝতে পারে, আবার অপরিচিতের প্রতিও তাদের সামাজিক বাধা কম।
মানুষের ইশারা ও চোখের দৃষ্টি বুঝতে কুকুরের অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করা ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ব্রায়ান হেয়ার ২০০৩ সালে নোভোসিবির্স্কে যান। একই পরীক্ষা তিনি শিয়ালছানাদের ওপর চালিয়ে দেখেন, বয়স সমান হলে তারা কুকুরছানাদের মতোই মানুষের ইশারা ও সামাজিক সংকেত বুঝতে পারে। অর্থাৎ গবেষকেরা শিয়ালকে বেশি বুদ্ধিমান করার জন্য নির্বাচন করেননি; তাঁরা শুধু কম ভয় পাওয়া ও কম আক্রমণাত্মক শিয়াল বেছে নিয়েছেন। তাতেই তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে দক্ষ এক প্রাণী। হেয়ারের ভাষায়, তাঁরা পেয়েছেন 'ভালো' শিয়াল, আর শেষ পর্যন্ত সেই শিয়ালই হয়ে উঠেছে বুদ্ধিমানও। এই ফল মানুষের সামাজিক বিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলে। মানুষ অবশ্য কুকুরের মতো গৃহপালিত প্রাণী নয়। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একে অন্যকে সহ্য করার ক্ষমতা যদি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ত, তাহলে আজকের মানবসমাজ গড়ে উঠত কি না, সেটিও ভাবার বিষয়।
