উয়েফা ছাড়তে ইনফান্তিনোর ‘প্রেমিকাকে’ দেড় লাখ পাউন্ড দেওয়া হয়েছিল, বেতন বেড়েছিল ২৫ হাজার পাউন্ড
ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার কাছ থেকে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কথিত প্রেমিকা ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ পেয়েছিলেন বলে দ্য টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে।
ফিফার সভাপতি ইনফান্তিনো উয়েফার মহাসচিব থাকার সময় এক সহকর্মীর সঙ্গে কথিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ২০১১ সালের শেষ দিকে ওই নারী ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে আকস্মিকভাবে চলে যাওয়ার সময় তাকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখন জানা গেছে, ওই অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি। এর মধ্যে একটি ব্যবসায়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের শিক্ষাব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই নারীর সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালে তাকে প্রশাসনিক পদ থেকে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদে উন্নীত করা হয় এবং তখন তার বেতনও প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড বাড়ানো হয়েছিল।
শুক্রবার দ্য টেলিগ্রাফ ওই অর্থ দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করার পর জানা যায়, উয়েফা সংস্থাটিতে ইনফান্তিনোর ১৬ বছরের পুরো কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করার কথা বিবেচনা করছে।
উয়েফা নিশ্চিত করেছে যে তাদের এক সাবেক কর্মীকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, এরপর তারা নিজেদের বিধিবিধান আরও কঠোর করেছে, যাতে সেগুলো 'আধুনিক, উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানের অনুরূপ' হয়। তবে ওই অর্থ কে অনুমোদন করেছিলেন, তা উয়েফা প্রকাশ করেনি।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, কথিত সম্পর্কের সময় উয়েফার মহাসচিব ছিলেন ইনফান্তিনো এবং সেই সময়ই সংস্থাটির অর্থ ব্যবহার করে ওই অর্থ দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
তৎকালীন উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনি কথিত ওই সম্পর্কের বিষয়ে ইনফান্তিনোকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ওই নারীকে অর্থের বিনিময়ে উয়েফা থেকে বিদায় দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল।
এটাও জানা গেছে যে, ওই নারীর ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পড়াশোনার শিক্ষাব্যয় উয়েফা বহন করেছিল। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থায় চাকরি নেন।
চার সন্তানের বাবা ও বিবাহিত ইনফান্তিনো ওই সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রোববার ফিফার এক মুখপাত্র আবারও অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, 'ইনফান্তিনোর অধীনে সবকিছু সবসময় সঠিকভাবেই করা হয়েছে।'
শনিবার দক্ষিণ আমেরিকায় ফিফার ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি কনমেবল এবং আফ্রিকায় নিজের সমর্থন জোরদার করেন ফিফা সভাপতি। সপ্তাহান্তে কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি দেশটির কালি শহরে উপস্থিত ছিলেন। ইনফান্তিনোর ইনস্টাগ্রাম পাতাতেও ওই অনুষ্ঠানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ফিফা এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে বলেছে, 'কিছু ব্যক্তি ফিফা ও এর সভাপতিকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সমন্বিত ও চলমান একটি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'
ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, 'যারা ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর সমর্থন পায় না, তাদের উচিত নয় ফিফার প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যা অর্জন করতে পারে না, তা অভিযোগ, ইঙ্গিত বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে অর্জনের চেষ্টা করা।'
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনগুলোর সরাসরি উল্লেখ না করে বিবৃতিতে 'ভিত্তিহীন দাবি এবং স্পষ্টতই মিথ্যা অভিযোগের' কথা বলা হয়।
তবে রোববার ফিফার সাবেক নৈতিকতা বিভাগের প্রধান, যিনি ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ড সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে যেতে পারে।
ফিফার ২০১৫ সালের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি তদারকি করা এবং সেপ ব্ল্যাটার ও মিশেল প্লাতিনিকে পদচ্যুত করা ফিফা এথিকস কমিটির জাজিং চেম্বারের চেয়ারম্যান ছিলেন জার্মান বিচারক হান্স-ইয়োয়াখিম একার্ট। তিনি বলেন, ইনফান্তিনো যদি ফিফার বিধিবিধান মেনে না চলেন, তাহলে তিনি 'সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে প্রবেশের' ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ইনফান্তিনো নিজের তৈরি করা প্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে চলমান নৈতিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগের মুখে রয়েছেন। এ ছাড়া এবারের গ্রীষ্মকালীন বিশ্বকাপে বহিষ্কৃত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনের ওপর আরোপিত বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা নিয়ে ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি তদন্তের মুখে রয়েছেন।
একার্ট সুইজারল্যান্ডের সংবাদপত্র নয়েৎস আম জোনটাগকে বলেন, 'ফিফার একজন সভাপতি কী করতে পারেন, সে বিষয়ে আসলে কঠোর বিধিবিধান রয়েছে। তিনি ফিফা কাউন্সিল, অর্থ কমিটি এবং নীতিপালন কমিটির সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এমনকি আরও বেশি অর্থের বিষয় হলেও সেটি অনুমোদিত নয়।'
তিনি বলেন, 'ফিফার বিধিতে কোনো সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন শাসকের ব্যবস্থা নেই। ফিফায় সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যে নির্বাহী সংস্থা হলো ফিফার সাধারণ সচিবালয়, সভাপতি নন। সভাপতি ফুটবলের প্রতিনিধিত্ব করেন, সম্পর্ক তৈরি করেন এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে এগিয়ে নেন। কিন্তু তিনি এককভাবে অর্থসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।'
একার্ট আরও বলেন, 'কোনো প্রমাণ নষ্ট করা যাবে না—এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে উয়েফা আইনি উপায়ে দাবি জানাচ্ছে। এটাও মনে রাখা উচিত, ফিফার প্রমাণসংক্রান্ত নথি হারিয়ে গেলেও এর সঙ্গে অন্য পক্ষগুলোও জড়িত। ফলে বিষয়টির সমাধান না হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি নয়। এমনও হতে পারে যে প্রাথমিক চুক্তির সময়ও অর্থের লেনদেন হয়েছিল। সেক্ষেত্রে পরবর্তী প্রশ্ন হবে—অর্থ কে দিয়েছিল? আর সেই অর্থ কোথায় গিয়েছিল?'
তিনি বলেন, 'ফিফার বিখ্যাত শান্তি পুরস্কারের কথাই ধরা যাক, বিশেষ করে ট্রাম্পকে দেওয়া সোনালি ট্রফিটির কথা। কোন শিল্পীকে দিয়ে এটি তৈরি করানো হয়েছিল? কী কী শর্ত ছিল? কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল? এর খরচ কত হয়েছিল? আর এর অর্থ কে দিয়েছিল এবং কোন অর্থ থেকে দেওয়া হয়েছিল? সবকিছু নিয়মমাফিক হয়েছিল কি না, তা ফিফা এথিকস কমিটিকে তদন্ত করতে হবে। যদি দেখা যায়, ইনফান্তিনো নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন, কোনো কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করেননি এবং একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে আমরা সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে প্রবেশ করছি।'
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ কেনার চেষ্টা করা একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেপথ্যের মূল ব্যক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের নাম আসার পর ট্রাম্পের সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্কও ইতোমধ্যে তীব্র নজরদারির মুখে রয়েছে।
একার্ট বলেন, 'ইনফান্তিনো ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ করতেন—এটা সবারই জানা। তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে চুক্তি করার কৌশল শিখেছেন। বিনিয়োগকারীরা যখন ফিফার সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তারা তাদের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা চান। এ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। আর এর অর্থ কী হবে? আরও বেশি ম্যাচ? দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ?'
তিনি আরও বলেন, 'ইনফান্তিনোর কাছে ট্রাম্প একজন আদর্শ। ট্রাম্পও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ করতেই বেশি পছন্দ করেন। একটি বিশ্ব ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তার উচিত মাঝে মাঝে সামনে বসে সব বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। তিনি যদি তা না করেন, তাহলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফিফার জন্যও। কারণ ফিফার সভাপতি কী ভাবছেন, তা আমরা আর জানতে পারছি না।'
বিশ্ব ফুটবলে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের সঙ্গে একার্টের সমালোচনাও যুক্ত হলো।
রোববার স্পেনের শীর্ষ ফুটবল বিভাগের সভাপতি হাভিয়ের তেবাস ঘোষণা করেন, 'ইনফান্তিনো যুগ শেষ' এবং ফিফায় 'প্রকৃত সংস্কার' প্রয়োজন।
তেবাস ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মন্দকে বলেন, 'আমার কাছে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে এ কথা বলছি না; অনেক দিন ধরেই আমি তার এই ধরনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি লক্ষ্য করছি। যদিও এখন সবাই যেন বিষয়টি আবিষ্কার করছে।'
তিনি বলেন, 'জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ফুটবলের বিকাশে অবদান রাখছেন না। বরং তার প্রকল্পগুলো ফুটবলের মূল ভিত্তি—জাতীয় লিগগুলো—ধ্বংস করছে। ফুটবল শুধু অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার কাছে ইনফান্তিনো যুগ শেষ।'
তেবাস আরও বলেন, 'যা ঘটছে, তাতে আমি অবাক নই। বরং যে বিষয়টি আমাকে অবাক করে, তা হলো—বহু বছর ধরে যারা নীরব ছিলেন, তাদের প্রতিক্রিয়া।'
রোববার ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, '২০২৬ সালের ৭ আগস্ট দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া আগের বক্তব্যের প্রতি ফিফা দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ইনফান্তিনো এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন।'
তিনি বলেন, 'কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, যার মধ্যে কোনো কর্মীর চাকরি ছাড়ার বিষয় এবং চাকরি শেষ হওয়ার সময় দেওয়া অর্থও অন্তর্ভুক্ত, সবসময়ই প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অনুমোদন করা হয়েছে।'
ফিফার ওই মুখপাত্র আবারও বলেন, 'মি. ইনফান্তিনোর অধীনে সবকিছু সবসময় সঠিকভাবেই করা হয়েছে।'
মন্তব্যের জন্য উয়েফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
