২০২৫ সালে রেকর্ড ৫০ হাজার নাগরিক ইসরায়েল ছেড়েছেন
টানা তৃতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালেও রেকর্ডসংখ্যক ইসরায়েলি দেশ ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে গেছেন বলে জানিয়েছে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা।
সোমবার প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালেও প্রায় ৫০ হাজার ইসরায়েলি অন্তত এক বছরের জন্য দেশ ছেড়েছেন।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক এবং তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইতাই আতের দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (সিবিএস) ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দেশত্যাগের হার বেড়েছে। এটি ভবিষ্যতে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা এই গবেষণাকে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলার স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এবং ইকোনমিস্টস ফোরাম ফর ডেমোক্রেসির প্রধান ইতাই আতের, অর্থনীতি বিভাগের প্রধান নিতাই বার্গম্যান এবং পিএইচডি গবেষক ডোরন জামির।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য ২০২৭ সালের শুরুতে প্রকাশিত হবে। কারণ, কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো কাউকে অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে তখনই, যখন তিনি বছরের বেশির ভাগ সময় দেশের বাইরে কাটান। ফলে ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে এমন অনেকেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যারা আসলে ২০২৪ সালেই দেশ ছেড়েছিলেন।
সরকারি তথ্য প্রকাশের আগেই ২০২৫ সালের প্রবণতা জানতে গবেষকরা তিন মাস মেয়াদি বিদেশযাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তত তিন মাস বিদেশে থাকা এবং পরে অন্তত এক বছর দেশের বাইরে থাকা ইসরায়েলিদের সংখ্যার মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২৫ সালের দেশত্যাগের হার সম্পর্কে তারা এই অনুমান করেছেন।
২০২৫ সালে অন্তত টানা তিন মাসের জন্য ৯০ হাজার ৯২২ জন ইসরায়েলি দেশের বাইরে ছিলেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯১ হাজার ৪৯৯ এবং ২০২৩ সালে ৮৬ হাজার ৫০৯। অর্থাৎ, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত তিন মাসের জন্য ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৯ জন ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি অন্তত তিন মাসের জন্য বিদেশে যেতেন। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদে বিদেশগামী ইসরায়েলির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ২১৯ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'যদি ২০২৫ সালেও একই প্রবণতা বজায় থাকে, তাহলে ধারণা করা যায়, ওই বছর ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ইসরায়েলি অন্তত ১২ মাসের জন্য দেশ ছেড়েছেন।'
গবেষণার অন্যতম লেখক ইতাই আতের বলেন, এই সংখ্যা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (সিবিএস) আগে প্রকাশ করা ৬৯ হাজার জনের হিসাবের চেয়ে কম। কারণ, তাদের বিশ্লেষণে গত তিন বছরে ইসরায়েলে আসা নতুন অভিবাসীদের (বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসা ব্যক্তিদের) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আতের বলেন, 'সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, দেশত্যাগের পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। তাদের দাবি ছিল, দেশ ছাড়াদের বেশির ভাগই ইউক্রেন থেকে আসা নতুন অভিবাসী, দীর্ঘদিনের ইসরায়েলি নাগরিক নন। তাই আমরা দেখাতে চেয়েছি, প্রকৃত ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে কতজন দেশ ছাড়ছেন।'
গত কয়েক বছরে ইসরায়েল একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। দেশটিতে এখন আগমনের তুলনায় দেশত্যাগের সংখ্যা বেশি। ইহুদি জনসংখ্যা নিয়ে ইসরায়েলের অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ সার্জিও ডেলা পেরগোলার মতে, ১৯৫০ ও ১৯৮০-এর দশকের কয়েকটি সময় ছাড়া ইসরায়েলের ইতিহাসে সাধারণত দেশ ছাড়ার চেয়ে দেশটিতে আসা ইহুদির সংখ্যাই বেশি ছিল।
সিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিলিয়ে ইসরায়েলে আসার তুলনায় প্রায় ৫০ হাজার বেশি মানুষ দেশ ছেড়েছেন।
ঐতিহাসিকভাবে উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে অনেক ইসরায়েলি দেশ ছাড়লেও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশত্যাগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারের প্রতি অসন্তোষ, সমালোচকদের মতে গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে পারে এমন নীতিগত পরিবর্তন এবং দেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
গবেষণা প্রতিবেদনে ইতাই আতের বলেন, '২০২৫ সালেও উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য দেশ ছাড়ছেন এমন ইসরায়েলিদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি রয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত আছে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতি একাই ইসরায়েলের স্থিতিশীলতার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি নয়। তবে এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশত্যাগের হার এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।'
প্রতিবেদনেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান সংখ্যা এখনই দেশের জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত সংকট তৈরি না করলেও ইসরায়েলকে একটি সম্ভাব্য সংকটপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, 'রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত নতুন কোনো বড় ধাক্কা এলে দেশত্যাগের হার আরও দ্রুত বাড়তে পারে। একবার দেশত্যাগ নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে সেই প্রবণতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হবে এবং এর গুরুতর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে।'
প্রতিবেদন প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাটস পার্টির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ বলেন, রেকর্ডসংখ্যক ইসরায়েলির দেশত্যাগ মোকাবিলায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য তিনি ও তার সহকর্মীরা বারবার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সরকার এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, 'এটি ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত হুমকি, আর এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের আচরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।'
অন্যদিকে বিরোধী দল ইয়েশ আতিদ-এর সংসদ সদস্য মেইরাভ কোহেন কটাক্ষ করে বলেন, 'সরকার বলেছিল গাজার মানুষ স্বেচ্ছায় এলাকা ছেড়ে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর গঠিত এই সরকারই ইসরায়েলিদের স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করেছে।'
একই দলের আরেক আইনপ্রণেতা কারিন এলহারার বলেন, 'প্রতিদিন আরও বেশি ইসরায়েলি এই সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা ও বিপজ্জনক দুর্নীতি দেখছেন এবং হতাশ হয়ে পড়ছেন।'
