বাংলাদেশের গোপন হেপাটাইটিস সংকট: ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত, বেশিরভাগই জানেন না
দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতি বছর ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে ২০-২১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ।
এ অবস্থায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে দেশে ব্যাপক হারে হেপাটাইটিস স্ক্রিনিং, টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিপার্টমেন্ট অভ হেপাটোলজির চেয়ারম্যান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শাহিনুল আলম টিবিএসকে বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ বা নির্মূলের সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা।
তিনি জানান, হেপাটাইটিস বি ও সিতে আক্রান্ত প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তারা এই ভাইরাস বহন করছেন।
অধ্যাপক শাহিনুল আরও বলেন, 'একজন মানুষ ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, অথচ তার লিভার ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর বা লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে যায়। তাই আমরা চাই, দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অন্তত একবার হলেও হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের পরীক্ষা করান।'
তিনি বলেন, ২০০৩ সাল থেকে জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে বর্তমানে ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সি অনেক মানুষ শৈশবে এই টিকা পাননি। তাদের হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা দেওয়া উচিত।
বিশেষ করে প্রজননক্ষম নারীদের টিকাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক শাহিনুল বলেন, দেশে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সি প্রায় ১৮ লাখ প্রজননক্ষম নারী রয়েছেন। মা থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমণ হেপাটাইটিস বি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান পথ। তাই সন্তান ধারণের আগে নারীদের হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা ও প্রয়োজন হলে টিকা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই সংক্রমণ থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
সোমবার (২৮ জুলাই) বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য: 'হেপাটাইটিস: লেটস ব্রেক ইট ডাউন'। এই প্রতিপাদ্যে হেপাটাইটিস সম্পর্কে ভয় ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে হেপাটাইটিস বি আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫৭ লাখ পুরুষ ও ২৮ লাখ নারী। এছাড়া প্রায় চার লাখ শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রায় ১৫ লাখ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য হেপাটাইটিস বি বহন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হেপাটাইটিসের পাঁচটি প্রধান ধরন রয়েছে—এ, বি, সি, ডি ও ই। এর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ এবং লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি এমন একটি সংক্রমণ, যা টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর এই টিকা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
তারা বলেন, তুলনামূলক কম খরচে হেপাটাইটিস বি টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বিপুল চিকিৎসা ব্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি হেপাটাইটিস এ প্রতিরোধে টিকাদান এবং হেপাটাইটিস ই প্রতিরোধে নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করাও জরুরি।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড প্যানক্রিয়াটিক ডিসঅর্ডার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আজম বলেন, বাংলাদেশে জন্মের সময় হেপাটাইটিস বি টিকার শতভাগ কাভারেজ, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নির্মূল করা সম্ভব।
'এর জন্য সরকার, চিকিৎসক, গবেষক, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর পথ,' বলেন তিনি।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি-তে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তবে সময়মতো টিকাদা, স্ক্রিনিং, নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূল করার যে লক্ষ্যমাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে বাংলাদেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
