তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে পর্যায়ক্রমে ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি উপজেলায় পাঁচ থেকে আটজন নতুন চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে। আরও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয় সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৯০০ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। কিন্তু ২০ কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজন প্রায় দেড় লাখ।'
এ কারণে পর্যায়ক্রমে আরও ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান মুহিত।
তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা দেশের মোট জিডিপির ১.০১ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে।
মুহিত বলেন, 'নতুন বাজেটকে সরকার শুধু অর্থের পরিমাণ হিসেবে দেখছে না; বরং এটি পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য সংস্কার কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপ।' তিনি রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসরঞ্জাম সরবরাহ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পেছনে। এছাড়া সম্প্রসারিত এসব চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগেও উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন বিদ্যমান শূন্যপদ, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং নতুন হাসপাতালের প্রয়োজন বিবেচনায় একটি সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা তৈরি করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের আধুনিক কারিকুলামে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বিশেষ স্বাস্থ্য কিট সরবরাহ করা হবে, যার মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও অন্যান্য সাধারণ পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।'
মুহিত জানান, দেশের প্রায় ৫০৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩০ বা ৫০ শয্যা থেকে ১৫০–১৫১ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। এর আওতায় নতুন ভবন, অতিরিক্ত ওয়ার্ড ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলার জমি, বিদ্যমান ভবন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করে ইতিমধ্যে 'নিড অ্যাসেসমেন্ট' সম্পন্ন হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে চার ধরনের হাসপাতাল নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
'বরাদ্দ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয় করার মতো প্রশাসনিক দক্ষতা ও সক্ষমতা গড়ে তোলাই এখন সরকারের মূল পরীক্ষা। আমরা সেই চেষ্টাই করছি। এরইমধ্যে অনেকগুলো কাজ শুরু হয়েছে,' বলেন তিনি।
প্যাথলজি ল্যাব ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার সম্প্রসারণ
চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রোগ নির্ণয় (ডায়াগনস্টিক) সুবিধাও বাজেটের অন্যতম বড় খাত।
মুহিত জানান, সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি করে বেসিক প্যাথোলজি ল্যাব স্থাপন করা, যাতে সাধারণ রোগ নির্ণয়ের অধিকাংশ পরীক্ষা স্থানীয় হাসপাতালেই বিনামূল্যে করা যায়।
'হাসপাতাল মানে শুধু ভবন নয়। কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ল্যাব ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান অপরিহার্য। তাই সরঞ্জাম ক্রয়ে বড় বিনিয়োগ করা হবে,' বলেন তিনি।
মুহিত জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ভেঙে পড়া অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুনর্গঠনে আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল গড়ে তোলা, যাতে দেশের যেকোনো স্থান থেকে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
বিশেষায়িত হাসপাতালে বিনিয়োগ
মুহিত জানান, বাজেটের একটি অংশ বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞানইনস্টিটিউটে নতুন ভবন ও শয্যা বৃদ্ধি, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে (এনআইসিভিডি) নতুন একাডেমিক ও গবেষণা বিভাগ চালু এবং বিদ্যমান ভবনগুলোতে রোগীসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাভারে প্রতিষ্ঠিত নতুন হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'অধিকাংশ স্বাস্থ্য প্রশাসক চিকিৎসক হলেও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে; নতুন প্রতিষ্ঠান সেই শূন্যতা পূরণ করবে।'
পাঁচ জেলায় ই-হেলথ পাইলট প্রকল্প
মুহিত জানান, নতুন বাজেটের আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হলো ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা।
সরকারের ই-হেলথ সিস্টেমের আওতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি করে ইউনিক স্বাস্থ্য আইডি তৈরি হবে, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো হাসপাতালে রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও প্রেসক্রিপশনের তথ্য দেখা যাবে।
প্রাথমিকভাবে খুলনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী ও নোয়াখালী—এই পাঁচ জেলায় পাইলট প্রকল্প চালু হবে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রোটোটাইপ প্রস্তুত হবে এবং এক থেকে দেড় বছর পাইলট পরিচালনার পর এটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হবে।
এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপস্থিতি ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বহির্বিভাগের টিকিট অনলাইনে বুকিংয়ের ব্যবস্থাও চালু করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে না হয়।
বিদ্যমান সংকট নিরসন ও জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিলের তাগিদ বিশেষজ্ঞের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ টিবিএসকে বলেন, চলতি অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যবহার হতে পারে নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, বরং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার দৃশ্যমান ঘাটতিগুলো দ্রুত পূরণ করা।
তিনি বলেন, '৫০ থেকে ১৫০ শয্যার হাসপাতাল বা নতুন অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে। তাই এই বাজেটের অর্থ দিয়ে মানুষের তাৎক্ষণিক উপকার নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।'
হামিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনো নষ্ট ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি, রিএজেন্টের সংকট, জনবল ঘাটতি, ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের হাতে নমনীয় অর্থায়নের অভাব সেবার বড় বাধা।
'বাজেটের অর্থ এসব ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে ব্যয় করা গেলে রোগীদের বেসরকারি খাতে যেতে হবে কম এবং দ্রুত সেবার মান উন্নত হবে,' বলেন তিনি।
হামিদ আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি বড় অংশ দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
'এই তহবিল থাকলে ডেঙ্গুর মতো জরুরি পরিস্থিতি, স্যালাইনের সংকট বা কোনো হাসপাতালে সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট হলে পরবর্তী বাজেটের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করবে।
