এলডিসি উত্তরণ পেছাতে সমর্থন চেয়ে আজ রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিতে বিভিন্ন দেশের কাছে অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার দেশে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করবে সরকার।
শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার যৌক্তিকতা রাষ্ট্রদূতদের সামনে তুলে ধরা হবে।
একই সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বা টাইম-বাউন্ড অ্যাকশন প্ল্যান তুলে ধরা হবে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্রে জানা গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) ৫৪ সদস্য রাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন চাইবে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যাবে, যেখানে এটি ভোটাভুটিতে উঠতে পারে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার বাংলাদেশের প্রস্তাবে গত ২ জুন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি সমর্থন জানায়। তবে সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে কত বছর সময় বাড়ানো হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলেনি।
সিডিপি তাদের প্রতিবেদনে 'স্বল্পমেয়াদি সময় বৃদ্ধি'র কথা উল্লেখ করেছে। এই সময় এক বছর হতে পারে, আবার দুই বা তিন বছরও হতে পারে। বাংলাদেশ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আবেদনের পর এবং ৬ এপ্রিল জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ সুপারিশ আসে।
সময় বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি
সিডিপি জানিয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অনেক বড় ব্যবধানে ধরে রেখেছে। নিকট বা মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের এসব মানদণ্ড থেকে নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর পক্ষে বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়। উল্লিখিত বৈশ্বিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে এর প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কঠোর বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধীরগতি।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান—যার ফলে সরকার পরিবর্তন হয়েছে—এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অব্যাহত বোঝা সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এসব সমন্বিত ধাক্কা সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং কর-জিডিপি অনুপাত দুর্বল হওয়ার দিকে নিয়ে গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার সুশাসন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা দারিদ্র্য বিমোচনের ধারাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, "ফলস্বরূপ, নীতির মূল মনোযোগ বাধ্য হয়ে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে গেছে।"
এতে আরও বলা হয়েছে, স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বা এসটিএসের অধীনে বেশ কিছু অগ্রাধিকারমূলক কাজ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
চিঠিতে আরও বলা হয়, "উত্তরণের জন্য সুশৃঙ্খল প্রস্তুতির সুযোগ দিতে যে পাঁচ বছরের সময় দেওয়া হয়েছিল, তা মূলত সংকট ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টিকে থাকার লড়াইয়েই কেটে গেছে। ফলে প্রস্তুতিমূলক সময়টি যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি।"
সরকার এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেছে।
উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধার জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য অযোগ্যতা, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়মের অস্থিরতা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে "আগাম বাণিজ্য সুবিধা হারালে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও উন্নয়ন গতি ব্যাহত হতে পারে।"
জাতিসংঘের মূল্যায়ন
সিডিপি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শক্তিশালী পারফরম্যান্স সত্ত্বেও কমিটি মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মতো বাহ্যিক চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণের পথে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সিডিপি।
সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো জোর দিয়ে বলেন, কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করা যথাযথ হবে। তবে প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির এই সময়ে বাংলাদেশকে তার বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
কমিটির মতে, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ। এ ছাড়া এলডিসি-পরবর্তী পরিবেশের জন্য বেসরকারি খাতকে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই সুপারিশ অনুমোদন করলে বাংলাদেশ তার স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বা মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় পাবে। এর ফলে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে দেশটি নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
