এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্দেশ্য বিলম্ব নয়, টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করা: বাণিজ্যমন্ত্রী
বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল উত্তরণ নিশ্চিত করা বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, "উত্তরণের এই অতিরিক্ত সময় আমরা কোনো বিলম্বের জন্য চাই না; বরং একটি টেকসই, স্থিতিশীল এবং কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য চাই।"
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)-এর কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়েছে। এই অনুরোধে ইউএনসিডিপি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)-এর কাছে দাখিল করেছে। আশা করা হচ্ছে, ইকোসক এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেরণ করবে। মূলত বিদেশি কূটনৈতিক মিশন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের এই প্রস্তুতির অগ্রগতি ও সময় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা অবহিত করতেই এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন জানায়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, প্রস্তুতিকালীন সময়ে বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ চেইনে বিঘ্নতা অন্যতম। এসব পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। তাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা।
জাতিসংঘের ওএইচআরএলএলএস-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উত্তরণের জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়। তিনি জানান, সরকার ইতিমধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কারের একটি রোডম্যাপ নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার, ডিরেগুলেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ।
বিনিয়োগ সহজ করা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "আমরা ব্যবসা শুরু করার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছি, যাতে ১৫তম দিনে কোনো প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারে।" ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করে খরচ ও সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনীতি ও দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত প্রধান ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন এবং প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির সময়টি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ অত্যন্ত গতিশীল। তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গতি যেন থেমে না যায় তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বাজার উন্মুক্ত করা এবং 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি (সদ্য পদত্যাগী)। এছাড়া প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিএপিআই সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির, জাতিসংঘের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়কারী গীতাঞ্জলি সিং, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এবং এলএফএমইএবি সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। বিজিএমইএ ও ডিসিসিআই-এর প্রতিনিধিরাও এতে বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরা অংশ নিয়ে টেকসই উত্তরণের জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
