এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী রপ্তানি রক্ষায় ১৫ দেশ ও জোটের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সরকারের
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দেশের রপ্তানি খাতের সুরক্ষায় সরকার বড় ধরনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়েছে। রপ্তানি বাজার ধরে রাখা ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বর্তমানে অন্তত ১৫টি দেশ ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা, অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে সরকার বাণিজ্য কূটনীতি, বাজার বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
আলোচনায় থাকা দেশ ও জোটসমূহ
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, মরিশাস, নাইজেরিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের বাণিজ্য আলোচনা বা সহযোগিতা কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে সরকার বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ সদস্যপদ লাভের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অগ্রগতি
সংসদে জানানো হয়, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে একটি ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে চুক্তিটি অনুমোদনের (রেটিফিকেশন) কাজ চলছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো দেশের সঙ্গে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। এর ফলে রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ আরও জোরদার হবে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে ১৪টি খাত নিয়ে একটি ট্রেড নেগোসিয়েশন কমিটি এবং ১১টি ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করছে। সরকার ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এই আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও সিইপিএ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। ২০২৬ সালের ১১ থেকে ১৩ মে দুবাইয়ে এ বিষয়ে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দুই দফা আলোচনা শেষ হয়েছে এবং তৃতীয় দফার বৈঠক ২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে চুক্তি
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নেপালের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের অগ্রগতি হয়েছে। চুক্তির খসড়া ও শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশ ৪৭টি পণ্যের একটি তালিকা প্রস্তাব করেছে। ভুটানের সঙ্গেও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কাজ চলছে। ২০২৬ সালের ৯ ও ১০ মার্চ ঢাকায় বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে এবং শিগগিরই যৌথ বাণিজ্য কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ভারতের সঙ্গে সিইপিএ, মালয়েশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে এফটিএ এবং শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া মরিশাস ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ স্বাক্ষরের উদ্যোগও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সরকার সক্রিয় রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণকে শুধু চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্য কূটনীতি সম্প্রসারণের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
