২০২৫ সালে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ০.৮৯%, এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সর্বনিম্ন: ডব্লিউটিও
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখলেও ২০২৫ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে বাংলাদেশে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন। প্রতিযোগীরা যেখানে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে, সেখানে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে গতি হারাচ্ছে।
ডব্লিউটিও-এর প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৪ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অথচ একই সময়ে বিশ্ববাজারে পোশাকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বৈশ্বিক চাহিদার এই ইতিবাচক ধারার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে থাকা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে।
শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কেবল চীন, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে কম্বোডিয়া রেকর্ড ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এছাড়া পাকিস্তান ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ভারত ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে।
রপ্তানি ধীরগতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও কমেছে। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে। ভিয়েতনাম এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
শীর্ষে থাকা চীনের রপ্তানি ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ১৫৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ২০২১ সালে বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারিত্ব ছিল ৩১ দশমিক৭১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া এই বাজারের বড় অংশই দখল করে নিয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যখন তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এবং দক্ষতা বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশ নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের পোশাক খাত বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ।
এই সমস্যাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গ্রাফ বেশ ওঠানামা করছে। ২০২২ সালে দেশটিতে ২৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২৩ সালে তা সংকুচিত হয়ে ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়। ২০২৪ সালে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিলেও ২০২৫ সালে তা আবার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসায় পুনরুদ্ধারের ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, যদি দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো না যায়, তবে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যেভাবে ব্যবধান কমিয়ে আনছে, তাতে বিশ্ব পোশাক বাজারে দ্বিতীয় স্থানের লড়াই এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
