কোরবানির আধুনিক হালচাল: ‘লাইভ ওয়েট’ থেকে অনলাইনে ভাগে কোরবানি
এককালে এই উৎসবকে মানুষ বলত 'বকরি ঈদ'। সময়ের ছোঁয়ায় সেই নাম বদলেছে। এখন গরু ছাড়া কোরবানির ঈদ ভাবাই যায় না। তাই ঈদের বেশ আগেই জমজমাট হয়ে ওঠে দেশের 'বিরাট' গরু-ছাগলের হাটগুলো! ঢাকার মতো শহর, যেখানে খোলা জায়গা মেলা ভার, সেখানে ঈদের আগে বসে নামকরা সব হাট। ফলে দেখেশুনেই কোরবানির পশু কেনার ফুরসত মেলে নগরবাসীর।
এসব হাটে শহুরে মানুষের কোরবানির অভিজ্ঞতা বেশ বিচিত্র। হাটে গিয়ে দেখেশুনে গরু কেনা, দামদর শেষে দড়ি টানাটানি করে বাসায় আনা, এরপর ঈদের দিন কোরবানি দিয়ে নিজ হাতে মাংস প্রস্তুত করা; অনেকের জন্য এটি দারুণ এক অনুভূতি।
তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শহুরে কোরবানির সেই চেনা ছবিটা এখন বদলে যেতে চলেছে। অনলাইনে অনেক আগেই শুরু হয়েছিল পশু বেচা-কেনা। হাটের ভোগান্তি যারা নিতে চান না, তাদের জন্য ইদানীং যুক্ত হয়েছে নতুন সব সার্ভিস। সামাজিক মাধ্যমে খামারগুলো এখন কেজি মেপে জ্যান্ত গরু বা 'লাইভ ওয়েট' এ পশু কেনার অফার দিচ্ছে। এর বাইরে শুরু হয়েছে অনলাইনে 'ভাগে কোরবানির' সুযোগ।
ঢাকার বিভিন্ন হাট আর ফেসবুক পশুর বাজার ঘুরে আমরা জেনেছি এবারের কোরবানির হালচাল।
ঢাকার হাটে ভোগান্তি যেন সবার
"হাটে গরু নিয়া আসলে নিজের আগে গরু হতে হয়", বললেন রমজান আলী (৬০)। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। এলাকার ৯ জন মিলে ১৭ টি গরু নিয়ে এসেছেন উত্তরার দিয়াবাড়ি গরুর হাটে।
এক বছর আগে গরুগুলো কিনেছেন তারা। এরপর সারা বছর বাকিতে কুঁড়ো-ভুষি খাইয়ে মোটাতাজা করেছেন। এখন হাটে গরু বিক্রি করে দোকানের সেই দেনা শোধ করতে হবে। এই পুঁজি থেকেই আবার কিনতে হবে নতুন গরু, তার ওপর তুলতে হবে সারা বছরের লাভ। এমন হরেক রকম আশা বুকে নিয়েই দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় হাটগুলোতে ভিড়েছেন এই বিক্রেতারা।
তবে তৃণমূল থেকে আসা এই খামারি ও ব্যবসায়ীদের জন্য পশুর হাটের অভিজ্ঞতা কখনোই সুখকর হয় না। হাটে নেই একটু শান্তিতে ঘুমানোর জায়গা, খাবার-দাবারের অবস্থাও যাচ্ছেতাই। সাধের গরুর পাশে কোনোমতে ক্ষণিক জায়গা করে নিয়েই শুয়ে পড়তে হয় তাদের। কেউ হাটের এক কোণে নিজেরাই ফুটিয়ে নেন ভাত, কেউবা আবার ভরসা করেন হাটের সস্তা ও অস্বাস্থ্যকর হোটেলের ওপর। গরু নিয়ে হাটে আসা এই দিনগুলো তাদের কাটাতে হয় চরম অমানুষিক পরিশ্রমে। এর ওপর হাটের তীব্র গরম আর মশা-মাছির উপদ্রব সেই কষ্টকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। আর ঝড়-বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই!
এমনটাই শোনালেন রমজান আলী। "রাতে ঘুমাতে পারি না। মশার কয়েলেও কাজ দেয় না। তাও আশা করি আইছি, যদি দুইটা পয়সা হয়। বাড়ি যাইয়া ধার শোধ দিতে হবে।" হাটে গরুর খাবার জোগানোও আরেক মস্ত বড় সমস্যা। বাড়ি থেকে আনা অল্পস্বল্প খড়-কুঁড়ো ফুরিয়ে যাওয়ায় এখন চড়া দামে হাটের খাবার কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসার চড়া গাড়িভাড়া। "১ লাখ টাকা দিয়া এই গরু কিনছিলাম, সারা বছরের খৈল-ভুষির দোকানের বিলই আইছে ৬০ হাজার টাকা। নিজের খাটনির কথা বাদ দিলাম। এখন ২ লাখ টাকায় বিক্রি করতে না পারলে তো পুরাটাই লস।", বললেন রমজান।
এদিকে হাটে এসে ক্রেতারাও যে খুব খোশমেজাজে ঘুরতে পারেন, তা বলা যায় না। বিক্রেতারা দাম হাকেন চড়া। পাশাপাশি রোদ আর গরমে তাদেরও নাজেহাল অবস্থা। চারদিকে পশুর উৎকট গন্ধ, আর যত্রতত্র কাদা ও গোবরের মাখামাখি শহুরেদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। সাধ্যের মধ্যে গরু মেলালেও সেটাকে নিরাপদে বাসায় নিয়ে যাওয়া আরেক বড় ঝামেলার কাজ। এর ওপর রয়েছে হাটের হাসিল মেটানো আর 'দালালদের' উৎপাত। সব মিলিয়ে পশুর হাটে এসে ঠকে যাওয়ার একটা সংশয় আর দুশ্চিন্তা প্রতি মুহূর্তেই তাড়া করে বেড়ায় ক্রেতাদের।
উত্তরার এই হাটে এমনই এক অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন বায়েজিদ হোসেন। ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে পছন্দের পশুর খোঁজে এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে হাটের এমাথা-ওমাথা ঘুরেও বাজেটের মধ্যে মনের মতো গরু মেলাতে পারেননি। "দাম অনেক বাড়তি। গত বছর যে সাইজের গরু লাখ টাকার আশেপাশে ছিল, এবার সেটার দামই চাচ্ছে পৌনে দুই থেকে দুই লাখ। আমরা যারা ফিক্সড বেতনের চাকরিজীবী, আমাদের বাজেট তো আর এক বছরে ডাবল হয়ে যায়নি। দুই ঘণ্টা ধরে কাদা আর গোবর পাড়িয়ে ঘুরতেছি।", জুতায় গোবর দেখিয়ে বললেন বায়েজিদ।
বায়েজিদের মতো এমন দোটানা চিত্র পুরো হাট জুড়েই। ক্রেতাদের অভিযোগ, হাটে পর্যাপ্ত পশু থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করাই থাকে। পশুর বাহারি নাম দিয়ে দাম হাকা হয় চড়া। দরদাম করলেও ক্রেতার জেতার সম্ভাবনা কম! অন্যদিকে হাটের ইজারাদারদের অব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভের শেষ নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই কোনো পর্যাপ্ত শৌচাগার কিংবা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। ফলে একদিকে পশুর চড়া দাম, অন্যদিকে কাদা-গোবর ও উৎকট গন্ধের মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, সব মিলিয়ে পশুর হাটে এসে 'ঠকে যাওয়ার' আর 'ভোগান্তির' আশঙ্কা থেকেই গেছে।
রোদের তীব্রতা কমে এখন দেশব্যাপী শুরু হয়েছে বৃষ্টি। হাটের কাদামাটি আরো বেড়ে গিয়েছে। কিছু কিছু হাটে উঠেছে পানি। এতে করে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গরুর ব্যপারীরা। হাটে তোলা গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। হাটগুলোয় যথাযথ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন ক্রেতারাও।
ঐতিহ্যবাহী কোরবানির হাটের এই ধরণের সমস্যা সমাধানেই ইদানীং হাজির হয়েছে অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন আধুনিক সেবা। ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর ছোঁয়ায় পশুর হাটের চিরচেনা সেই কাদা-গোবরের ছবিটা এখন অনেকটাই বদলে যেতে চলেছে।
লাইভ ওয়েটে জ্যান্ত গরু
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি কোরবানির পশুর বাজার। প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজারে প্রতিবছর প্রায় এক কোটিরও বেশি পশু বেচাকেনা হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই বিশাল বাজারে এক নীরব বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। গাবতলী বা নয়াবাজারের সেই চিরচেনা কাদা-ময়লা, দালালদের দৌরাত্ম্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দর কষাকষির চিরাচরিত দৃশ্য ছাপিয়ে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে 'লাইভ ওয়েট' বা জীবন্ত ওজনে পশু কেনা শহুরে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে প্রবাসী- সবার কাছেই এখন স্বস্তির নাম ডিজিটাল অ্যাগ্রো ফার্ম।
আগে কোরবানির পশু কেনা হতো সম্পূর্ণ 'চোখের আন্দাজে'। ব্যাপারী বলতেন পাঁচ মণ, ক্রেতা দেখতেন তিন মণ- এই টানাপোড়েনে ঠকে যাওয়ার ভয় থাকতো সবসময়। এই অনিশ্চয়তা দূর করেছে লাইভ ওয়েট পদ্ধতি। এটি মূলত পশুকে ডিজিটাল স্কেলে দাঁড় করিয়ে জীবন্ত অবস্থায় তার ওজন মেপে কেজি দরে দাম নির্ধারণের পদ্ধতি।
রাজধানীর রূপপুর ক্যাটেল ফার্মের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, "দেশের ক্রেতারা এখন সচেতন হয়েছে। তারা হাটের ঝামেলা আর দালালের হাতে ঠকতে চান না। ডিজিটাল স্কেলে ওজন দেখে তারা নিশ্চিত হতে পারেন যে তারা কতটুকু কী কিনেছেন।"
লাইভ ওয়েট জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো স্বচ্ছতা। খামারে পশুর লাইভ ভিডিও, দাঁত দেখে বয়স নিশ্চিত করা এবং রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের স্বাস্থ্যসনদ ক্রেতাদের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
লাইভ ওয়েটে গরু কেনার সময় ক্রেতাদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে- আস্ত গরুর ওজনের কতটুকু মাংস হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, একটি সুস্থ ও উন্নত জাতের ষাঁড় গরুর 'ড্রেসিং পারসেন্টেজ' বা হাড়সহ ভোজ্য মাংসের পরিমাণ সাধারণত ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হয়। বাকি ৪০ শতাংশ হলো চামড়া, ভুঁড়ি, হাড়ের কিছু অংশ, রক্ত ও মাথার অবশিষ্টাংশ।
ধানমন্ডির বাসিন্দা তানভীর আহমেদ গত দুই বছর ধরে এভাবেই কোরবানি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, "হাটে গিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা নষ্ট করার সময় বা শক্তি কোনোটাই আমার নেই। লাইভ ওয়েটে গরু কিনলে অন্তত ঠকে যাওয়ার ভয় থাকে না। খামারে গিয়ে ডিজিটাল মিটারে ওজন দেখে দাম দিয়ে আসি। ঈদের আগের দিন ওরাই সুস্থ-সবল গরু বাসায় পৌঁছে দেয়।"
একটা ৫০০ টাকা লাইভ ওয়েটে ১০০ কেজি ওজনের একটি গরু কিনলে (মোট দাম ৫০,০০০ টাকা), তবে সেখান থেকে হাড়সহ মাংস পাওয়া যাবে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কেজি। সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি মাংসের প্রকৃত খরচ পড়বে প্রায় ৮৩৩ থেকে ৯০৯ টাকা। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন খামারে লাইভ ওয়েটের দাম কেজিপ্রতি ৫২৫ টাকা থেকে শুরু করে ৬২০ টাকা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। যেমন—পদ্মা এগ্রো ফার্মে ৫২৫ টাকা, ক্যাটল ক্যাম্পে ৫৩০ টাকা এবং আল-মদিনা বা পূর্বাচল ক্যাটল ফার্মে ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকা।
ডিজিটাল স্কেল না থাকলেও ক্রেতারা এখন ঘরে বসে ফিতা দিয়ে গরুর ওজন বের করছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের স্বীকৃত সূত্রটি হলো: পশুর ওজন (কেজি) = (বুকের বেড় × বুকের বেড় × দৈর্ঘ্য) ÷ ৬৬০ (এখানে দৈর্ঘ্য ও বেড় ইঞ্চিতে মেপে ৬৬০ দিয়ে ভাগ করলে পশুর আনুমানিক লাইভ ওয়েট পাওয়া যায়)
পূর্বাচল ক্যাটেল ফার্মে যেয়ে কথা হয় মোফাজ্জল আহমেদের সাথে। তিনি এখান থেকে লাইভ ওয়েট দিয়ে আড়াই লাখ টাকার একটি গরু কিনেছেন। তিনি বলেন, "লাইভ ওয়েট দিয়ে গরু কিনার লাভ হলো এখানে আমি নিশ্চিত থাকতে পারবো। টাকা দিয়ে ন্যায্য মাপের পশু কেনার ফলে কোরবানি পূর্ণতা পায়।"
তবে লাইভ ওয়েটে গরু কেনা-বেচা পছন্দ করেন না কোরবানির হাটের ব্যপারিরা। উত্তরার দিয়াবাড়ি গরুর হাটে নাটোর থেকে এক ডজন গরু নিয়ে এসেছেন মন্তু শেখ। এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে সাতটি গরু। বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায় আছে বাকিগুলো। লাইভ ওয়েটে গরু বেচার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "মামা, এত মাপ-জোক কইরা কোরবানি দিলে লাভ কী? আল্লাহকে খুশি করার জন্য কোরবানি, কয় কেজি মাংস পামু গরু থেকে- এটা হিসাব করার জন্য কোরবানি না!"
অনলাইনে 'ভাগা বা শেয়ারে কোরবানি'
সময়ের সাথে সাথে পশুর হাটের সেই চেনা কোলাহল, দড়ি টানাটানির আনন্দ আর ঐতিহ্যবাহী আমেজ হয়তো যান্ত্রিক শহরের এই আধুনিকতার ভিড়ে কিছুটা ফিকে হয়ে আসছে। কিন্তু ব্যস্ততা, স্থানাভাব আর স্বাস্থ্য সচেতনতার এই যুগে নগরবাসীর কাছে 'অনলাইন ভাগা কোরবানি' এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং এক পরম স্বস্তির নাম। হাটের কাদা-ধুলোমাখা চিরাচরিত রূপ আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত খামারের ডিজিটাল ব্যবস্থা—এই দুই বৈপরীত্য নিয়েই বদলে যাচ্ছে আমাদের চেনা কোরবানির আধুনিক হালচাল।
দাম বেড়ে যাওয়ায় কোরবানির জন্য একটি আস্ত গরু কেনা এখন অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। আবার শহরে কসাইয়ের খোঁজ করা, বর্জ্য পরিষ্কার আর মাংস ভাগ করার ঝামেলা তো আছেই। তাকওয়া শেয়ার, ছায়াবিথী অ্যাগ্রো, আনোয়ার এগ্রো বা ঈশান ক্যাটল ফার্মের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই সেবা দিচ্ছে।
ভাগা কোরবানির প্রক্রিয়াটি বেশ গোছানো। প্রতিষ্ঠানগুলো একেকটি গরুর জন্য সর্বোচ্চ ৭ জন অংশীদার নেয়। প্যাকেজগুলো সাধারণত ১৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। যেম- ছায়াবিথী অ্যাগ্রোতে ১৯,৯০০, ২৫,৯০০ ও ৩০,৯০০ টাকার তিনটি প্যাকেজ রয়েছে। মুন্না ক্যাটল ফার্মে ১৫,৫০০ থেকে ২৫,৫০০ টাকার প্যাকেজ রয়েছে। ছাগলের জন্যও বিভিন্ন দামের প্যাকেজ আছে।
কেরানীগঞ্জের ছায়াবিথী অ্যাগ্রোর সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা শরিয়াহসম্মত উপায়ে পশু জবাই থেকে শুরু করে কোল্ড চেইন মেইনটেইন করে মাংস বাসায় পৌঁছে দেয়। একজন ক্রেতা জানতে চেয়েছিলেন ভিন্ন ভিন্ন গরুর মাংস মিশিয়ে ফেলা হয় কি না। যার উত্তরে খামারি নিশ্চিত করেন, "আমরা টোকেন সিস্টেম ব্যবহার করি। আপনার ভাগের গরুর মাংস অন্য গরুর সাথে মেশার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়াও সম্মানিত ক্রেতারা চাইলে কোরবানির সময় থেকে মাংস প্যাকেট করা পর্যন্ত সরেজমিনে থাকতে পারবেন আমাদের ফার্মে।"
অনলাইনে এই সুবিধাগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জ নেয়। গরুর দাম এবং ডেলিভারির দিনের ওপর ভিত্তি করে ১৩,০০০ থেকে ২৭,০০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ হয়। ছায়াবিথী বা ঈশান ক্যাটল প্যাকেজের বাইরে সাধারণত ১,০০০ টাকা থেকে শুরু করে পশুর দামের ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ নেয়। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতি হাজারে ১০০ থেকে ২০০ টাকা চার্জ ধরে মাংস প্রসেস করে দেয়। মাংস সাধারণত ফুড গ্রেড পলিতে প্যাক করে নিজস্ব ফ্রিজার ভ্যানে ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ভুঁড়ি পরিষ্কার করে আলাদা প্যাকেটে দেওয়ার সুবিধাও অনেক খামার দিচ্ছে।
ছায়াবিথী এগ্রোতে দুই ভাগা গরু কোরবানির বুকিং করেছেন নাজমুল আলম। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, "কাজের ব্যস্ততার জন্য হাটে গিয়ে গরু কেনা, কসাই খোঁজা, নিয়ম মেনে কোরবানি দেয়া- এসব দেখভাল করার সময় আমার নেই। যার কারণে অনলাইনে গরুর ভাগা নিয়েছি। তারা কথা দিয়েছেন ঈদের দিন দুপুর ২ টার মধ্যে আমার বাড়িতে মাংস পৌঁছে দিবেন।"
'আধুনিক' কোরবানি নিয়ে কী ভাবছে মানুষ
"হাঁটের কাদামাটি আর কসাইয়ের ঝামেলা ছাড়াই এবার কোরবানি হোক সম্পুর্ণ নিশ্চিতে"- এই ট্যাগলাইন ব্যবহার করে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছে 'মেঘডুবি এগ্রো'। একাধিক প্যাকেজ নিয়ে এসেছে তারা। বাইশ হাজার নয়শো টাকায় ২২-২৬ কেজি মাংস, প্যাকেজ দুইয়ে ৩০ হাজার টাকায় ৩০-৩৫ কেজি মাংসের অফার দিচ্ছেন তারা। অনেক ইতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধের কথা বলেছেন অনেকে। ফেসবুকে মজনু সিকদার নামের একজন মন্তব্য করেছেন, "এটাকে কুরবানির মাংস বলে না, নিত্য দিনে যেমন মাংস খাই, সেই মাংস এটা। কোরবানিতে কয় কেজি মাংস পাবো, এই আশায় কেউ কোরবানি দেয় না।" অন্য একজন লিখেছেন, "হাটের কাদামাটিতে চুবানি না খাওয়া পর্যন্ত কোরবানি কোরবানি ফিল আসেনা।"
তবে ইতিবাচক মনোভাবও অনেকের। বিশেষ করে প্রবাসী, কর্মজীবী দম্পতি এবং বয়োবৃদ্ধদের জন্য এটি এক পরম স্বস্তি এনে দিয়েছে। এই অফারের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আশফাক আহমেদ নামের একজন লিখেছেন, "যাঁরা একান্নবর্তী পরিবারে থাকেন না বা ফ্ল্যাট বাড়িতে একা থাকেন, তাঁদের জন্য ঈদের দিন মাংস প্রসেস করা এক বিরাট ধকল। হাটে গিয়ে গরু কেনা, কসাই যোগাড় কঠিন কাজ। ধর্মীয় নিয়ম কানুন অনুসরণ করে করা হলে এ ব্যবস্থা খারাপ না।"