বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহের মেরুদণ্ড হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজার একটি মোটামুটি স্থিতিশীল ধারণার ওপর ভিত্তি করে চলছিল। ধারণা করা হতো, কাতার একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে থাকবে, মধ্যপ্রাচ্য হবে বিশ্ব এলএনজি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাবে।
কিন্তু সেই ধারণা এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে ঝুঁকির নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে: ইউরোপ রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প খুঁজছে, এশিয়া কয়লা থেকে সরে আসার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারে বিদ্যুতের চাহিদা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কয়েক বছর আগেও কেউ কল্পনা করেনি।
এর ফলে এলএনজি বাজারে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যেখানে সরবরাহের পরিমাণের চেয়ে 'নির্ভরযোগ্যতা' এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্র বাজারের প্রধান বা 'অ্যাঙ্কর' সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
মার্কিন এলএনজি খাতের অগ্রণী উদ্যোক্তাদের একজন চারিফ সৌকি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "বিশ্ব এখন নির্ভরযোগ্য এলএনজির সংকটে ভুগছে। আর যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র উৎপাদনকারী দেশ যার দ্রুত উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে।"
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগেই যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারীতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন (এমটিপিএ), যেখানে কাতারের সক্ষমতা প্রায় ৭৭ এমটিপিএ।
বর্তমানে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ২২০ এমটিপিএ-র কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
তবে অনেক দেশই এখনও তাদের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী হিসেবে কাতারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যখন কোনো অস্থিরতা সেই সরবরাহ শৃঙ্খলকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন পুরো বিশ্ববাজারেই ঝুঁকির নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। ঠিক এখন সেটিই ঘটছে।
চাহিদার নতুন জোয়ার
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর আগেই বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদা বাড়তে শুরু করেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাস থেকে সরে আসায় বিশ্ববাণিজ্য প্রবাহের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো কয়লা থেকে সরে এসে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
তবে এলএনজির চাহিদার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নতুন চালিকাশক্তি হলো এআই। সৌকি বলেন, "এআই প্রযুক্তিতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হবে, তা কারও ধারণার বাইরে। আর এর অর্থ হলো—প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হবে।"
হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলোর উত্থান বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পূর্বাভাসের চিত্র বদলে দিচ্ছে। এই সেন্টারগুলো ২৪ ঘণ্টা প্রচুর পরিমাণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিস্তার ঘটলেও, বড় ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেবল নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসই সবচেয়ে দ্রুত কার্যকর সমাধান। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার উন্নয়নের সাথে সাথে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামোও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্যতা এখন প্রিমিয়াম পণ্য
জ্বালানি বাজারে এখন শুধু পণ্যের দাম নয়, বরং নির্ভরযোগ্যতাও বড় ভূমিকা রাখছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন ইউরোপের জ্বালানি নির্ভরতার দুর্বলতাকে উন্মোচিত করার পর ক্রেতারা এখন সরবরাহের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সেই শিক্ষাকেই আরও জোরালো করেছে। চারিফ সৌকি বলেন, "যখন কোনো প্রধান সরবরাহকারী কম নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন পুরো বাজারকে ঝুঁকির নতুন দাম নির্ধারণ করতে হয়।"
এর মানে এই নয় যে এলএনজি পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে; বরং ক্রেতারা এখন বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করছেন, অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষর করছেন এবং স্থিতিশীলতার জন্য বেশি অর্থ (প্রিমিয়াম) দিতেও প্রস্তুত আছেন। এই পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে:
- বিশাল শেল গ্যাসের মজুত।
- সম্প্রসারণশীল রপ্তানি অবকাঠামো।
- গভীর ও শক্তিশালী মূলধনী বাজার।
- তুলনামূলক স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
- অন্যান্য অনেক রপ্তানিকারকের চেয়ে কম ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি।
সবচেয়ে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে, যা বিশ্বের খুব কম সরবরাহকারীরই আছে।
এলএনজির পরবর্তী ধাপ
যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি অগ্রযাত্রা কেবল শুরু হয়েছে। নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো আগামী কয়েক বছরে রপ্তানি সক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলবে। দেশটির গালফ কোস্টের অবকাঠামো বাড়ছে, পাইপলাইন সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং রপ্তানি টার্মিনালগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিশ্ববাজারে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
পোর্ট অব কর্পাস ক্রিস্টি-র সিইও কেন্ট ব্রিটন বলেন, "আগামী পাঁচ বছরের প্রকৃত উন্নয়নের গল্প হলো এলএনজি। এআই এবং ডেটা সেন্টারের বিশ্বব্যাপী প্রসারের সাথে সাথে (এলএনজি) চাহিদা কেবলই বাড়ছে।"
জলবায়ু বিতর্ক ও বাস্তবতা
এলএনজি নিয়ে বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক সমালোচক এলএনজি রপ্তানিকে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার পরিপন্থী বলে দাবি করেন। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একে একটি আদর্শ নবায়নযোগ্য ভবিষ্যতের সঙ্গে তুলনা না করে বরং বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি ব্যবহারের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করা উচিত।
ব্রিটন বলেন, "আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন উৎপাদন। বিশ্বের ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ যারা এখনও জ্বালানি নিরাপত্তার স্তরে পৌঁছায়নি, তাদের বলাটা চরম ঔদ্ধত্য যে—আমরা তাদের জন্য বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করব না।" চারিফ সৌকির মতে, অর্ধেক বিশ্ব এখনও কয়লা বা ডিজেল পুড়িয়ে চলছে। এলএনজি তাদের জন্য ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পরিচ্ছন্ন এবং এটিই একমাত্র বাস্তবসম্মত 'সেতু' বা ট্রানজিশন ফুয়েল।
