‘বিদ্বেষ’ একটি ‘সেল্ফ রিইনফোর্সিং চক্র’: এ থেকে বের হতেই হবে
মনের মধ্যে বিদ্বেষ নিয়ে কি মানুষ সুস্থভাবে বাঁচতে পারে? সহজ ও সোজা উত্তর হলো, না, পারে না। বিদ্বেষ এমন একটি রিপু, যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি করে। এই নেতিবাচক আবেগ আমাদের চিন্তা জগতকে এত বেশি প্রভাবিত করে যাতে বাড়ে রাগ, উদ্বেগ, বিদ্বেষ এবং হতাশা। অন্যদের প্রতি ভালবাসা, বিশ্বাস কমে যায়, বেড়ে যায় ঘৃণা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যারা দীর্ঘদিন ক্ষোভ বা ঘৃণা ধরে রাখেন, তারা নিজেরাই সেই অনুভূতির জালে বন্দি হয়ে যায়। যেমনটা হয়েছে আমাদের সমাজে, আমরা অনেকেই এখন বিদ্বেষ দিয়ে চালিত হচ্ছি।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এত নেতিবাচকতার পরেও, বিদ্বেষকে লালন করে ও বিদ্বেষ প্রচার করে কিছু মানুষ কীভাবে ভালো আছে? এই গ্রুপটি বেশ ভালভাবেই সমাজে টিকে থাকে, শাসন ও শোষণ করে। তাহলে কি বিদ্বেষের ক্ষতি এদের স্পর্শ করে না?
অবশ্যই স্পর্শ করে, ঠিকই এদের মনোজগতের ক্ষতি করে। ভেতরের অশান্তি বাইরে প্রকাশ করে না, কিন্তু ভেতরে জিইয়ে রাখে। এই দূষিত মানুষগুলো নিজেদের মধ্যে থেকে যাওয়া এই বিদ্বেষকে 'ন্যায়বোধ' বা 'প্রতিশোধ' হিসেবে জাস্টিফাই করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্বেষ প্রসঙ্গটি খুব আলোচনায় আসছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্বেষ, সহিংসতা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সামাজিক বিভাজন বেড়েছে। সমাজে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীও বেড়েছে বহুগুণ। যে বিদ্বেষ ছিল মানুষের অন্তরে, বা হালকা মাত্রায় ছিল, তা অনেকটাই বেড়েছে এবং প্রকাশ্যে এসেছে।
গত ২ বছরে এরকম অসংখ্য ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। বিদ্বেষ, ঘৃণা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, এটি বোঝার জন্য দেশের রাজনীতি, সমাজ, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির পারস্পরিক প্রভাবকে একসাথে দেখতে হবে।
এই বিদ্বেষ সবসময় সরাসরি ঘৃণা হিসেবে প্রকাশ পায় না। এই বিদ্বেষ প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আঘাত-আক্রোশ, ধর্মীয় ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন, নারীর প্রতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব আগেও ছিল, ছিল নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাব, তবে এই মনোভাব ক্রমশ বাড়ছে। সহিংসতা ও দমন-পীড়ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।
মারপিট, কুপিয়ে হত্যা, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, হত্যার পর মৃতদেহ কেটে ১০/২০ টুকরা করা, পশুহত্যা, কবর থেকে মরদেহ তুলে পেটানো ও পুড়িয়ে দেওয়া, এসিড দিয়ে মরদেহ বিকৃত করা, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাসহ আরো অনেকধরণের ক্রুর অপরাধ ঘটছেই। এছাড়া মব সন্ত্রাস, মাজার বা আশ্রম ভাঙা, বাউল হত্যা, নাচ-গানের অনুষ্ঠান বন্ধ করা, জুতার মালা পরানো, ঘর পুড়িয়ে দেয়া, নারীকে কটুক্তি, চড়-থাপ্পর দেওয়া ও চুল কেটে দেওয়ার মতো গর্হিত অপরাধ বেড়েই যাচ্ছে।
এখন 'মানুষ' পরিচয়ের চাইতে বড় পরিচয় জাত, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি ও লৈঙ্গিক পরিচয়। ফলে ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস বা ভিন্ন চেহারা মানেই শত্রু, তাকে পিটিয়ে মারতে হবে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দিতে হবে। শুধু মানুষ না, পশুপাখি, গাছপালা কারোর ছাড় নাই এই বিদ্বেষ ও উগ্রপন্থার হাত থেকে।
কোনো কোনো মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির আশায় গুজব ছড়ায়। কারণ অপতথ্য ও উসকানির মাধ্যমে বিদ্বেষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কুষ্টিয়ার পীরকে যে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো, সেতো ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে। বিদ্বেষ থেকেই এই গুজব ছড়িয়ে হত্যা করা। এর আগেও এ ধরনের ভয়ংকর ঘটনা ঘটানোর জন্য অসংখ্য গুজব ছড়ানো হয়েছিল এবং ভবিষ্যতেও হবে বলে আশঙ্কা করা যায়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক মাধ্যম এখন বিদ্বেষ ছড়ানোর সবচেয়ে দ্রুত মাধ্যম। মানুষের মনে যতো ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে, সেগুলোকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে। দেশে বসে তো বটেই, বিদেশ থেকেও হিংসা ছড়ানো হয়, অপকর্মে ইন্ধন দেওয়া হয়।
এমনকি কেউ কেউ ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও 'হেট স্পিচ' দেন। বিভিন্ন নিউজের নিচে দেওয়া মন্তব্যে ধর্ম, লিঙ্গ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার হচ্ছে। তৃণমূলের মানুষ যেন এ ধরনের 'হেট স্পিচ' বুঝতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাতেও ঘৃণামূলক কনটেন্ট ছড়ানো হয়। এই হেট স্পিচগুলো মানুষ যেন গ্রহণ করে, সেজন্য সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বিভিন্নজনের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়।
ফেসবুক/ইউটিউব এর নিয়ম অনুযায়ী উত্তেজনাপূর্ণ ও পাবলিক ইনভলভড হচ্ছে, এ ধরনের কনটেন্ট বেশি ছড়ায়। কী এক অদ্ভুদ কারণে যেন বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য মানুষ বেশি গ্রহণ করে, দেখে ও কমেন্ট করে। আর সে কারণেই এ ধরনের বক্তব্য বেশি বেশি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ নিজের মতের বিপরীত কিছু দেখলেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
দেশে বিদ্বেষ, ঘৃণা ও হিংসা বাড়ছে। এখন দেখছি মানুষের মধ্যে জাতি ও ধর্মগত বিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ, নারীর পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে বিদ্বেষ, ট্রান্সজেন্ডার বিদ্বেষ, বর্ণ বিদ্বেষ, পশুপাখি ও প্রকৃতি বিদ্বেষ, ভারত বিদ্বেষ, পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, ও শাহবাগী বিদ্বেষ, আদিবাসী বিদ্বেষ, বাউল-ফকির ও পীর বিদ্বেষসহ আরো হরেকরকম বিদ্বেষ।
এই বিদ্বেষগুলোর মধ্যে থেকে একটি বিদ্বেষও যদি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে সেখান থেকে তৈরি হয় একজন অমানুষ।
দেশের অর্ধেক জনগণ নারী। অথচ নারীর প্রতি বিদ্বেষ সবচেয়ে বেশি। শুধু পুরুষ নয়, নারীর প্রতি নারীর বিদ্বেষও অনেক। নারীর প্রতি নারীর বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাজ করে ভেতরে জমে থাকা হিংসা। এটি শুধু ব্যক্তিগত মনোভাব নয়, বরং সংস্কৃতি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও পিতৃতান্ত্রিক চিন্তার প্রভাব। এই বিদ্বেষের কারণেই নারীর পোশাক, চলাফেরা, স্বাধীনতা এবং নারীর প্রাপ্ত অধিকার নিয়েও হেনস্তার ঘটনা বাড়ছে।
সামাজিক মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে অপমানজনক মন্তব্য বাড়ছে, বাড়ছে জনসমক্ষে পোশাক নিয়ে হেনস্থা এবং ভিকটিম ব্লেইমিং। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে যে ধরনের ফোন আসে, সেই তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর প্রতি হয়রানি, নিপীড়ন, আর সহিংসতার অভিযোগ জানাতে বা সাহায্য চেয়ে ফোন কলের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। নারীর প্রতি সামাজিক বিদ্বেষ রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর সমস্যার প্রতিফলন।
অস্বীকার করার কোন উপায় নাই যে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ কিছু এলাকায় জাতিগত বিদ্বেষ বিদ্যমান। এই বিদ্বেষের কারণে আদিবাসীদের ভূমি দখল, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া, চাষের ফসল নষ্ট করে দেয়ার ঘটনা ঘটছে।
অনেকে আছেন যারা নাগরিক হিসেবে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ন্যায্য হিস্যা দেওয়ার বিপক্ষে। আদিবাসী নারীর অবস্থান প্রান্তিক। তাদের চেহারা, শরীর, পোশাক, স্বাধীন চলাফেরার কারণে তারা অনেক বেশি বিদ্বেষের শিকার হন।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়—যা বিদ্বেষকে আরও তীব্র করে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রক্রিয়াটি একটি চক্রের মতো। যেমন—রাজনৈতিক বিভাজন বেড়েছে, উগ্রবাদিতা বেড়েছে, সোস্যাল মিডিয়ায় উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, গুজব ছড়ানো হচ্ছে, বাড়ছে অবিশ্বাস ও সহিংসতা। এ সবকিছুর ফল আরো বিদ্বেষপূর্ণ।
মনোবিজ্ঞান বলে বিদ্বেষ আসলে শুধু আবেগ নয়, বা ব্যক্তির মনের ভাব নয়, এটি একটি সামাজিক রোগ। এই রোগে আমরা অনেকেই আজ আক্রান্ত। সহনশীল, বহুমাত্রিক ও সহাবস্থানের সমাজ হিসেবে আমাদের এই পরিচয়, আজ বিদ্বেষ, সহিংসতা এবং সামাজিক বিভাজন দ্বারা পর্যুদস্ত হতে চলেছে।
বিদ্বেষ শুধু মনের মধ্যে থাকে না, শরীরেও প্রভাব ফেলে। রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, ঘুমের সমস্যা হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিদ্বেষ যারা ছড়ায় এবং যারা বিদ্বেষের ভিক্টিম দুই পক্ষেরই মন ও শরীর তখন সবসময় এক ধরনের দুশ্চিন্তা ও হুমকির মধ্যে থাকে।
বিদ্বেষ মানুষকে ধীরে ধীরে একা করে দেয়। কারণ যে বা যারা বিদ্বেষ পোষণ করে, মানুষ তাদের পছন্দ করে না বা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি কমে যায়, বেড়ে যায় আক্রমণাত্মক আচরণ। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই একটি নেতিবাচক চক্রে আটকে যায়।
যতদিন পর্যন্ত বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের আইনের আওতায় আনা না হবে, ততদিন মব সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। কারণ বিদ্বেষ থেকেই মব হামলা হয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে মানুষের মনে হতাশা, আক্রোশ ও প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরি হয়।
মানুষ যখন নিজেকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে বিভিন্ন পরিচয়ে যেমন—ধর্ম, দল, লিঙ্গ, গোত্র ও জাতি—সংজ্ঞায়িত করে, তখনই বিপত্তি ঘটে। কারণ তখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র পরিচয়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আর এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে নিচু কাজকর্ম করে, বিদ্বেষ ছড়ায়।
এমনভাবে প্রচারণা চালায়, যাতে ভিন্ন মতকে শত্রু মনে হয়। আর এই শত্রুকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে মারা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নারীকে ধর্ষণ করা কোনো অপরাধ বলে মনে করে না। রাষ্ট্র যখন বিদ্বেষ থামানোর চেষ্টা করে না, তখন তা মব সন্ত্রাস বা হানাহানিতে পরিণত হয়।
যদি আমরা বিদ্বেষ কমাতে চাই, তাহলে অবশ্যই প্রতিশোধের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা, সামাজিক পর্যায়ে সহনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই প্রতিশোধের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। তা না হলে বিদ্বেষ 'সেল্ফ রিইনফোর্সিং চক্র' হিসেবে সমাজকে ক্রমশ আরও বিভক্ত ও সহিংস করে তুলবে।
'সেল্ফ রিইনফোর্সিং চক্র' এর মানে হলো 'নিজেই শক্তি বৃদ্ধিকারী' বা এমন কিছু যা নিজে থেকেই ক্রমাগত আরও শক্তিশালী বা প্রবল হতে থাকে। এটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রক্রিয়া হতে পারে, যেখানে কোনো কাজের ফলাফল সেই কাজটিকে আরও বেশি ঘটতে উৎসাহিত করে।
এই ব্যবস্থা নিজে থেকেই মজবুত হয় এবং নিজেকেই চালিত করে। সময়ের সাথে সাথে একটি ভালো বা খারাপ পরিস্থিতি নিজে থেকেই আরও ভালো বা আরও খারাপের দিকে যায়। নিজেকে ও পরিবারকে শান্তিতে ও নিরাপদে রাখতে চাইলে এবং দেশকে সুন্দর করে তুলতে চাইলে, অবশ্যই আমাদের এই বিদ্বেষ চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
