কেন সুশীল সমাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা আছে?
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে রাজনীতি করতে এসে হোঁচট খেয়েছেন। অবশ্য সরাসরি রাজনীতি না বলে বলা যায় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ বা সংস্কৃতিকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যতবার ওনারা উদ্যোগ নিয়েছেন, ততবারই মোটামুটি ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু কেন?
এখানে 'সুশীল সমাজ' বলতে সাধারণত বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই গোষ্ঠীগুলোকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশে সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা বা অনীহা কাজ করে। এর পেছনে কি শুধু রাজনৈতিক কারণই দায়ী, নাকি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু বিষয়ও আছে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজ একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত ধারণা। গণতান্ত্রিক উত্তরণ, মানবাধিকার রক্ষা, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, সাংবিধানিক শাসন এসব প্রশ্নে সুশীল সমাজ প্রায়ই আলোচনায় এসেছে, তা-ও বারবার প্রশ্ন উঠেছে কেন তারা দেশে বা সমাজে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হন?
এর কিছু কারণ আছে। যেমন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তাদের জীবনধারা, ভাষা এবং চালচলন সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে, তারা ড্রয়িং রুমে বসে বা সেমিনারে যে সমস্যার কথা বলছেন, তার সাথে মাটির কোনো সম্পর্ক নেই। এদের অধিকাংশই বিদেশ-ঘেঁষা মানুষ।
ফান্ডিং বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক এরা বিদেশি ডোনার বা কূটনীতিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা অবসেসড বলা যায়। এদের কাছে বাংলার চাইতে ইংরেজির কদর বেশি, কাজের চাইতে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মূল্য বেশি।
তাই বলে কি মাটি আর মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক নাই? সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেটা পেরিফিরির সম্পর্ক, প্রয়োজনের সম্পর্ক। বাংলাদেশের যে ইস্যু পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সুশীল নেতৃবৃন্দও ঠিক সেই ইস্যুটা নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন। কারণ দাতারা যে খাতে টাকা দেয়, যে কাজ দেখতে চায়, সুশীলদের একটা বড় অংশ সেদিকেই ছাতা ধরেন, বক্তব্য প্রদান করেন, অনুষ্ঠান করেন।
নিজেদের পকেটের পয়সা ব্যয় করে সমাজ উন্নয়নে কাজ করেছেন বা করছেন বড় মাপের এরকম সুশীল পাওয়া কঠিন। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, লাইব্রেরি, নারীর কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার মতো কোনো উদ্যোগ নিতে সাধারণত দেখা যায় না।
কেন সাধারণ সুশীল প্রতিনিধিদের ঠিক কাছের মানুষ মনে করেন না বা মনে করেন না যে এরা রাজনীতিতে ভালো করবেন? কয়েকজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষের সাথে কথা বললাম এই প্রসঙ্গে। তারা স্পষ্টভাবেই বললেন, বিপদকালে আমরা একজন রাজনৈতিক নেতার কাছে যত দ্রুত পৌঁছাতে পারি বা সাহায্য পেতে পারি, একজন সুশীল, বুদ্ধিজীবীর কাছে তত সহজে যেতে পারি না, পারব না। আর সাহায্য কতটা পাব তা-ও সন্দেহ আছে।
আরো বললেন, রাজনৈতিক নেতারা চুরি করে, মানুষের জিনিস মেরে খায়, কিন্তু বিপদে স্থানীয় মানুষের পাশে থাকে। যুক্তিটা অদ্ভুত কিন্তু সত্য। সুশীল বা বুদ্ধিজীবী বলে আমরা যাদের মনে করি তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ধর্তব্যের মধ্যেই নেন না। এদের এলিটিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। মানুষ তাদের বন্ধু বা প্রতিনিধি মনে করার চেয়ে 'উপদেশদাতা' বলে বেশি মনে করে।
তাত্ত্বিকভাবে সুশীল সমাজের নিরপেক্ষ হওয়ার কথা থাকলেও, প্রকৃত অর্থে কি তারা তা-ই? তাদের কি নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নাই? সাধারণ মানুষদের মধ্যে একটা অংশ মনে করেন সুশীল প্রতিনিধিরা যখন কথা বলেন, তখন নিজেদের এজেন্ডা বা কোনো নির্দিষ্ট দলের সুবিধার্থে বলেন। ক্ষমতার পালাবদল হলে তাদের অবস্থানও বদলে যায়। বারবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে। জনমানুষের আবেগের চেয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিশেষ করে পাশ্চাত্য কী চাইছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকার কারণে দেশের ভেতরে সুশীল সমাজ বারবার সমালোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
২০২৪-এ যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, প্রধান উপদেষ্টাসহ অধিকাংশ উপদেষ্টাই ছিলেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বা এনজিও ব্যক্তিত্ব। তাঁরা কি পেরেছেন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে, ব্যক্তিগত ও কাঠামোগত সততা ধরে রাখতে? তাঁদের মাত্র ১৭ মাসের শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে। কোনো কোনো অভিযোগের তদন্তও শুরু হয়েছে বা হবে।
অথচ এর আগেও বাংলাদেশে সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক মিলিয়ে মোট তিনবার তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর, ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই সরকারগুলো দায়িত্ব পালন করে। কই, সেইসব সরকার নিয়ে তো এত সমালোচনা হয়নি, যা ২০২৪ এর অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে হয়েছে। যদিও এই সরকার মোটামুটিভাবে পুরোটাই ছিল সুশীল সমাজের সরকার।
অনেক সময় দেখা যায়, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সংকটের সময় সরাসরি মাঠে না নেমে কেবল বিবৃতি বা টকশোতে সীমাবদ্ধ থাকেন। সুশীল সমাজের কাজ অবজারভেশন, ভাল কাজ আদায়ের জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ, সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত হাইলাইট করা, সরাসরি সরকার পরিচালনা করা নয়।
সাধারণ মানুষের ধারণা, সুশীল সমাজ শুধু ভুল ধরতে জানে কিন্তু কোনো টেকসই সমাধান দেয় না। তাদের সমালোচনা অনেক সময় গঠনমূলকও হয় না, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত হয়। তাই সরাসরি সরকার পরিচালনা করতে এসে এরা নিজেদের এখতিয়ারের বাইরে যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রায় সবগুলোই সমালোচিত হয়েছে।
এদের অনেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কাজ করেন। এতে মানুষের মনে ধারণা জন্মে যে, তারা দেশের চাইতে নিজেদের ফান্ডিং বা পদ-পদবির দিকে বেশি মনোযোগী। খুব রূঢ়ভাবে বলা যায়, এদের অধিকাংশই সুবিধাবাদী এবং রং বদলানো গিরগিটি। এদের কথা জটিল, ভাষা সহজ বাংলা নয়, এরা তাত্ত্বিক, যা বলেন তা সাধারণের বোধগম্য নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর আছে মাঠপর্যায়ের সংগঠন, কর্মী, অর্থবল। সুশীল সমাজের অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম শহরকেন্দ্রিক বা বলা যায় শহরকেন্দ্রিক ড্রইংরুমে। জেলা শহর, গ্রামেগঞ্জে এদের কোন নেটওয়ার্ক নাই বা দুর্বল। কারণ অপ্রিয় হলেও একথা সত্য সুশীলদের বেশি মাখামাখি বিদেশিদের সাথে, তৃণমূলের সাথে নয়। এছাড়া বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যেই আছে মতপার্থক্য, নেতৃত্ব-সংকট ও সমন্বয়হীনতা এবং দুর্নীতি।
২০২৪ এ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তাদেরই সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সুশীল সমাজ সংস্থা—ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের প্রধান সমালোচনাগুলো হচ্ছে, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে না পারা, আমলাতন্ত্রের কাছে নতিস্বীকার। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও আমলাদের প্রভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
টিআইবি অভিযোগ করেছে যে, সরকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যাদেশ (দুর্নীতি দমন কমিশন বা পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত) অংশীজনদের সাথে আলোচনা না করেই একতরফাভাবে জারি করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার সেই পর্যায়ে কঠোর হতে পারেনি। বিশেষ করে এনবিআর এবং এসিসিকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এছাড়া সরকার টেকসই জ্বালানি নীতি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের কোনো শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।
অন্যদিকে সিপিডি মূলত সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারা এবং দুর্বল বাজার শাসনের কারণে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিপিডি বলেছে যে, এটি 'জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ' হয়েছে। তারা সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে বলে তারা মনে করে।
সিপিডির সমালোচনায় বারবার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথে তুলনা উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখায় সিপিডি এবং টিআইবি দুই সংস্থাই এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। সিপিডি প্রধান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুশীল সমাজের সরকার যে আদতে সরকার পরিচালনায় দুর্বল বা ব্যর্থ হয়েছে, এর আরো অনেক প্রমাণ আছে। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা রোডম্যাপ দিতে না পারায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। দেশে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং মব জাস্টিস বা গণপিটুনির মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ছিল উদাসীন। অসংখ্য মানুষকে পিটিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এমনটা ঘটলে সুশীল সমাজই সবচেয়ে আগে সমালোচনা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আর নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েছে শতভাগ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ বা নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, এমনকি ভারতেও। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখকরা বলেন সুশীল সমাজ হলো সেই ক্ষেত্র যেখানে সাংস্কৃতিক ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে বা প্রাধান্য সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা বলে নাগরিক সংগঠন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। কারণ যুক্তিনির্ভর আলোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ। এইসব ধারণা অনুযায়ী ধরে নেয়া যায় সুশীল সমাজ রাষ্ট্র ও নাগরিকের মাঝে একটি মধ্যবর্তী ক্ষেত্র, যেখানে সংগঠন, মতপ্রকাশ ও সামাজিক নৈতিকতা রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে সুশীল সমাজ কখনো রাজনৈতিক আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখেনি, কিন্তু তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছে। এখানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো শক্তিশালী গণআন্দোলনের রূপকার নয় বা দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গড়তে পারে না।
তবে সুশীল সমাজ পারে নীতিগত বিতর্ক তৈরি করতে, মানবাধিকার ও নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কথা বলতে, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে। কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে ও রাজনৈতিক সংস্কার আনতে হলে দরকার তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, বিদেশি ফর্মুলা ও ভাড়া করা বিদেশি বুদ্ধিজীবী নয়।
- শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
