বিশ্বজুড়ে কমে আসছে উড়োজাহাজ সচল রাখার কারিগর; সংকটে এভিয়েশন খাত
বিশ্বজুড়ে বিমানের মেকানিক বা কারিগরের তীব্র সংকট চলছে। কারিগরের অভাবে ফ্লাইট দেরি হচ্ছে, বাতিলও হচ্ছে। তাই এখন বেশি মানুষকে বিমান মেরামতের কাজ শেখানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও'র সিনসিনাটি স্টেট টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমিউনিটি কলেজে এখন শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। এয়ারলাইন ও কার্গো কোম্পানিগুলো হন্যে হয়ে প্রশিক্ষিত মেকানিক খুঁজছে। ওই কলেজে বর্তমানে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী আছে। কর্তৃপক্ষ সংখ্যাটি বাড়িয়ে ৩৫০ করার পরিকল্পনা করছে।
প্রশিক্ষক কেন রোলিং জানালেন, নিয়োগদাতারা রীতিমতো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ১৯৮৭ সালে এখান থেকেই পাস করেছিলেন এবং তখন থেকেই এই পেশায় আছেন। তিনি বললেন, 'ওরা এসে বলে, লাইসেন্স পাওয়ার পর তোমাদের সবাইকেই আমরা চাকরি দেব।'
এই নিয়োগের তোড়জোড়ই বলে দিচ্ছে সংকট কতটা গভীর। এতে আকাশভ্রমণের চিত্রটাই বদলে যাচ্ছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অলিভার ওয়াইম্যানের গত শুক্রবারের তথ্যমতে, উত্তর আমেরিকায় এখনই ১৭ হাজার টেকনিশিয়ানের ঘাটতি আছে। আগামী এক দশকে আরও ৪৫ হাজার টেকনিশিয়ান অবসরে যাবেন। ২০২৮ সাল নাগাদ এই সংকট চরমে পৌঁছাবে। তখন ঘাটতি হতে পারে ৩০ হাজারে।
ব্রায়ান প্রেনটিস ওই প্রতিষ্ঠানের একজন অংশীদার। তিনি বললেন, 'এটা আসলে এক মহাবিপদ। বিমানগুলো এখন বেশিক্ষণ উড়ছে, ভ্রমণের চাহিদাও আকাশচুম্বী। ঠিক এই সময়েই আমরা অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের হারাচ্ছি।'
এর ফলে ওড়ার জন্য পর্যাপ্ত বিমান পাওয়া যাবে না। শেষমেশ এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে।
সিনসিনাটি স্টেটের শিক্ষার্থীদের কাছে এই সংকটই সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমাজনের চাকরি ছেড়ে আসা টেলর হিল বললেন, 'আমার কাছে এটা চাকরির নিশ্চয়তা।' ক্যারিয়ার মেলায় এই কোর্সের খোঁজ পেয়ে তিনি এখানে ভর্তি হন।
তিনি জানান, ওহাইও অঞ্চলে নতুন মেকানিকদের শুরুতে ঘণ্টায় ২৮ থেকে ৩০ ডলার বেতন দেওয়া হচ্ছে। চার বছরের ডিগ্রি ছাড়া অন্য যেকোনো চাকরির চেয়ে এটা অনেক বেশি। হিল বলেন, 'মেকানিকদের সবসময়ই দরকার হবে। এটা দারুণ এক ক্যারিয়ার।'
অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি এখনই কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ম্যাথিউ ব্রাউন ক্লাসের ফাঁকে বিমানে যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ করেন। তিনি বলেন, চাহিদাটা স্পষ্ট।
ব্রাউন বলেন, 'সবকিছুরই এখন রমরমা অবস্থা।' তিনি যে গ্যারেজে কাজ করতেন, সেখানকার ৭০ শতাংশ মেকানিকের বয়সই ৫০-এর বেশি।
এই ঘাটতি কিন্তু হুট করে তৈরি হয়নি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর এয়ারলাইনগুলো নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছিল। বিশ্লেষকরা একে বলেন 'হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম'। এরপর এল করোনা মহামারি। তখন হাজার হাজার কর্মী কাজ ছাড়লেন। আবার সেনাবাহিনী থেকেও এখন আগের মতো বেসামরিক বিমান মেকানিক আসছে না।
কর্মী সংকটের কারণে রক্ষণাবেক্ষণে বেশি সময় লাগছে। বিমানগুলো মাটিতেই পড়ে থাকছে বেশি সময়। এয়ারলাইনগুলো পুরনো বিমান বেশিদিন চালাচ্ছে, ফলে কাজের চাপ বাড়ছে।
প্রেনটিস বলেন, 'এতে এয়ারলাইনগুলোর খরচ বাড়বে। আর সেই খরচের বোঝা গিয়ে পড়বে যাত্রীদের কাঁধেই।'
তবে প্রশিক্ষণ শুধু কলেজেই শেষ হচ্ছে না। জিই অ্যারোস্পেসের কারখানায় প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার মেকানিক আসেন। নির্দিষ্ট কিছু ইঞ্জিনে কাজ করার আগে তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। জিই বলছে, এর লক্ষ্য হলো দ্রুত বাড়তে থাকা বৈশ্বিক বহরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সিনসিনাটি স্টেটের হ্যাঙ্গারে ফিরে আসা যাক। নতুন শিক্ষার্থীরা বলছেন, এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না।
ব্রাউন বলেন, 'ওভারটাইমের প্রচুর সুযোগ আছে, উন্নতির সুযোগও ঢের। কোম্পানিগুলো অন্য শহরে গিয়ে কাজ করার জন্য টাকা দেয়, বেতনও বেশ ভালো।'
প্রশিক্ষক রোলিং বললেন, নতুন প্রজন্ম এই শিল্পকে বদলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'ওরা শিখতে চায়। ওরা বিমানের কাজ করতে চায়।'
