এশিয়ার ধনী গ্রাহকদের দিকে ঝুঁকছে বিমান নির্মাতারা, ব্যক্তিগত জেটের চাহিদা তুঙ্গে
এশিয়ার বৃহত্তম এভিয়েশন ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী 'সিঙ্গাপুর এয়ারশো'-তে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে গালফস্ট্রিমের জি-৭০০ জেট। মসৃণ গঠন, প্রশস্ত ডানা এবং বড় ওভাল জানালা নিয়ে এটি টারমাকের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে ঢুঁ মারার জন্য মানুষের লম্বা লাইন। যাত্রীবাহী জেট ও বিশাল সামরিক বিমানগুলোর ভিড় এড়িয়ে এই ব্যক্তিগত জেটটিই যেন আলাদা করে নজর কাড়ছে। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই লাইনই প্রমাণ করে যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিগত জেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আগ্রহ কতটা প্রবল।
লাইনগুলো খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। কারণ ভেতরে এখনো বিক্রির আলোচনা চলছে। গ্রাহকরা এমন সব বিমানের কথা বিবেচনা করছেন, যার দাম কোটি কোটি ডলার।
ভেতরে ঢুকলেই চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। প্যানোরামিক জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে ফ্যাকাশে চামড়ার সিট আর পালিশ করা কাঠের আসবাবের ওপর। কর্মীরা কেবিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন সেখানে 'লিভিং এরিয়া' বা বসার জায়গাও আছে—একটি অংশে সোফা ও টিভি কনসোল, আর পেছনের অংশে একটি বেডরুম, যাকে তারা বলছেন 'গ্র্যান্ড সুইট উইথ শাওয়ার'।
এটি শুধু বিলাসিতার ছোঁয়া নয়, বরং এভিয়েশন জগতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সগুলো যখন বিপুল সংখ্যক সাধারণ যাত্রীর পেছনে ছুটছে, তখন ব্যক্তিগত জেট নির্মাতারা নজর দিচ্ছে তুলনামূলক ছোট কিন্তু অনেক বেশি ধনী গ্রাহক গোষ্ঠীর দিকে।
পরিসংখ্যানও এই প্রবণতার সাক্ষ্য দেয়। এভিয়েশন ইন্টেলিজেন্স ফার্ম উইংএক্স-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত জেটের ফ্লাইট প্রায় ৩৭ লাখে পৌঁছেছে—যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ এবং মহামারির আগের সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে অতি-ধনী বা আল্ট্রা-হাই-নেট-ওয়ার্থ ব্যক্তিদের (যাদের সম্পদের পরিমাণ ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ২ কোটি ২২ লাখ পাউন্ডের বেশি) সংখ্যাও ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
গালফস্ট্রিমের ওয়ার্ল্ডওয়াইড সেলসের প্রধান স্কট নেল বলেন, 'আমরা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যবসায়িক বিমান ব্যবহারের বড় পরিবর্তন দেখছি। আরও বেশি কোম্পানি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করছে এবং তাদের বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হচ্ছে। এর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিজনেস এয়ারক্রাফট।'
গালফস্ট্রিম একা নয়; ড্যাসাল্ট, বম্বার্ডিয়ার, এমব্রায়ের এবং টেক্সট্রন এভিয়েশনের (যারা সেসনা জেট তৈরি করে) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই প্রতিযোগিতায় শামিল।
অবশ্য সবাই এই প্রবণতাকে স্বাগত জানাচ্ছে না। পরিবেশগত উদ্বেগসহ নানা সমালোচনাও এই শিল্পের দিকে ধেয়ে আসছে।
তবুও বিমান নির্মাতারা এখানে বড় ব্যবসায়িক সুযোগ দেখছে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)-এর তথ্যমতে, সাধারণ এয়ারলাইন্সগুলো তাদের ব্যয়ের চেয়ে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ বেশি আয় করে, অর্থাৎ তাদের লাভের পরিমাণ খুবই কম।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত জেট অল্প সংখ্যায় বিক্রি হলেও এর দাম আকাশছোঁয়া। এছাড়া সাপোর্ট, পার্টস এবং মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম থেকেও নির্মাতারা ভালো আয় করেন।
সামরিক বিমান নির্মাণের জন্য খ্যাত ফ্রান্সের ড্যাসাল্ট এভিয়েশন তাদের ফ্যালকন এয়ারক্রাফটকে সামনে আনছে। তারা বলছে, তাদের যুদ্ধবিমানের জন্য তৈরি প্রযুক্তি এখন বিজনেস জেটের পারফরম্যান্স ও আরাম বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্যাসাল্ট জানায়, তাদের বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং ধনী ব্যক্তিরা।
ড্যাসাল্ট এভিয়েশনের সিভিল এয়ারক্রাফট প্রধান কার্লোস ব্রানা বলেন, ব্যক্তিগত জেটের দাম কোটি কোটি ডলার হতে পারে, কিন্তু যারা ঘন ঘন ভ্রমণ করেন তাদের জন্য এটি যুক্তিযুক্ত। যারা নিয়মিত ওড়েন, তাদের জন্য একাধিক ফার্স্ট ক্লাস টিকিটের চেয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী হতে পারে।
ব্রানা বলেন, বেশির ভাগ ক্রেতা বিলাসিতার চেয়ে দক্ষতা ও সময় সাশ্রয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। কোম্পানির ফ্ল্যাগশিপ ফ্যালকন জেটে বসে বিবিসিকে তিনি বলেন, 'আমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দ্রুত যেতে চাই এবং স্টপওভার বা কানেক্টিং ফ্লাইটে সময় নষ্ট করতে চাই না। এটাই আসল কথা। তারা যে বিলাসিতার পেছনে ছুটছেন তা নয়। যেমনটা দেখছেন, এখানকার ইন্টেরিয়র মার্জিত ও ভালোভাবে তৈরি, কিন্তু অতি-বিলাসী নয়—ছাদে কোনো ঝাড়বাতি নেই। তাদের প্রয়োজন হলো যতটা সম্ভব কম ক্লান্তি নিয়ে ভ্রমণ করা।'
ক্লান্তি কমানো এখন বিমান নির্মাতাদের অন্যতম বিক্রয় কৌশল বা সেলিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা কেবিনের বায়ুচাপ উন্নত করা, শব্দ কমানো এবং ইন্টেরিয়র রিফাইন করার ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে দীর্ঘ ফ্লাইটেও যাত্রীরা কম ক্লান্ত হন। কিছু জেটে কেবিনের বায়ুচাপ এমনভাবে রাখা হয় যা মাটিতে থাকার অনুভূতির কাছাকাছি, যাতে যাত্রীরা ফ্লাইটের পর পরিশ্রান্ত বোধ না করেন।
এশিয়ায় বাড়ছে চাহিদা
এশিয়ায় ব্যক্তিগত জেটের চাহিদা বাড়ার পেছনে এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি বড় ভূমিকা রাখছে। অলটন এভিয়েশন কনসালটেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আন্তর্জাতিক ট্র্যাফিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের (৬.৮%) চেয়ে বেশি।
২০১৫ সাল থেকে এয়ারলাইন্সগুলো ৬০০টির বেশি নতুন রুট চালু করেছে, যা কম সুবিধাপ্রাপ্ত গন্তব্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করেছে। ব্যক্তিগত জেটের ভ্রমণ কিছুটা কমলেও মহামারির আগের তুলনায় প্রিমিয়াম চাহিদার বড় অংশ এখনো এর দখলে।
স্কট নেল বলেন, 'এশিয়ায়, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমরা এখন খুব ব্যস্ত। আমাদের মার্কেট শেয়ার বাড়ছে। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে আমরা বেশি বেশি বিমান সরবরাহ করছি।'
ড্যাসাল্ট ভারত, থাইল্যান্ড এবং লাওসেও চাহিদা বাড়ার কথা উল্লেখ করেছে। ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের মতো দেশে অনেক বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোট হওয়ায় সেখানে বড় বিমানের চেয়ে ছোট বিজনেস জেট বেশি কার্যকর। তবে একসময় এশিয়ায় ব্যক্তিগত জেটের সবচেয়ে বড় বাজার চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে ড্যাসাল্ট।
তবে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলে এই চাহিদা আবারও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্রানা।
যদিও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বিজনেস জেটের জন্য একটি উদীয়মান বাজার, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এটি এখনো অনেক ছোট। বৈশ্বিক বিজনেস এভিয়েশন মার্কেটের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।
সমালোচনা ও পরিবেশগত উদ্বেগ
এই পরিবর্তনের সমালোচনাও হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট একটি ধনী গোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেওয়ায় মাস মার্কেট বা সাধারণ বাজার অবহেলিত হচ্ছে এবং সাপ্লাই চেইনের সমস্যা সমাধানে এটি খুব একটা কাজে আসছে না।
পরিবেশবাদীরাও সরব। বিশ্বজুড়ে সমালোচকরা বলছেন, ব্যক্তিগত জেট ভ্রমণের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী মাধ্যমগুলোর একটি।
গালফস্ট্রিম দাবি করছে, তাদের নতুন জেটগুলো ১০০% টেকসই এভিয়েশন জ্বালানিতে (এসএএফ) চলতে সক্ষম। ড্যাসাল্ট বর্তমানে ৫০-৫০ মিশ্রণ সমর্থন করে। তবে পর্যাপ্ত এসএএফ বা টেকসই জ্বালানি পাওয়া এখনো পুরো শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এর উৎপাদন সীমিত এবং দাম প্রচলিত জেট ফুয়েলের চেয়ে অনেক বেশি।
তবে নির্মাতারা জোর দিচ্ছেন যে, নতুন বিমানগুলো অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে, যা সামগ্রিক নিঃসরণ কমায়। স্কট নেল বলেন, 'মাত্র এক প্রজন্মের বিমানেই আমরা জ্বালানি খরচ ৩৫ শতাংশ কমিয়েছি। আমরা টেকসই জ্বালানির অন্যতম পথিকৃৎ এবং দক্ষতা ও পরিবেশগত উন্নয়নে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছি।'
উচ্চবিত্তের দিকে এই ঝোঁক শুধু ব্যক্তিগত জেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সগুলোও এখন ধনী যাত্রীদের টার্গেট করছে। তাইওয়ানের স্টারলাক্স এয়ারলাইন্স যেমন নিজেদের 'লাক্সারি ক্যারিয়ার' দাবি করে সস্তা টিকিট ও ঠাসা কেবিনের ধারণা থেকে সরে আসছে। তারা তাদের ফার্স্ট, বিজনেস ও প্রিমিয়াম ইকোনমি কেবিনগুলো বড় করেছে এবং সিঙ্গাপুর এয়ারশোতে তাদের ফ্ল্যাগশিপ এয়ারবাস এ৩৫০-১০০০ বিমানে এই আপগ্রেডগুলো প্রদর্শন করেছে। যাত্রীদের জন্য বড় ফোর-কে টিভি স্ক্রিন এবং সাধারণ বিমানের চেয়ে প্রশস্ত ও আরামদায়ক সিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জেট নির্মাতা এবং এয়ারলাইন্স—উভয়েই এখন আরাম, সুবিধা এবং বিলাসবহুল ভ্রমণ অভিজ্ঞতার দিকেই স্পষ্ট নজর দিচ্ছে। অতি ধনীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশপথে এই উচ্চমানের ভ্রমণের চাহিদা কমার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
