‘ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে মাথাব্যথা নেই’: যুদ্ধের 'মূল' কারণ নিয়ে ট্রাম্পের নাটকীয় অবস্থান বদল
ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ নিয়ে নাটকীয়ভাবে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে তিনি এখন আর 'পরোয়া করেন না'।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
গত বুধবার পর্যন্তও ট্রাম্প দাবি করে আসছিলেন, এই সংঘাতের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। তিনি আগে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন, ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, ইরানের কাছে মাটির নিচে লুকানো প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। তবে গোয়েন্দা সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের মতে, তেহরান এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।
হোয়াইট হাউসের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সকল টেলিভিশন নেটওয়ার্কে প্রচারিত জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্পকে তার আগের অবস্থান থেকে অনেকটা সরে আসতে দেখা গেছে।
বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে ইউরেনিয়াম মজুত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, 'সেগুলো মাটির অনেক গভীরে রয়েছে, আমি ওটা নিয়ে পরোয়া করি না।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা সব সময় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেটির ওপর নজর রাখব।'
গত বুধবার ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয় তবে তিনি দেশটিকে বোমা মেরে 'প্রস্তর যুগে' পাঠিয়ে দেবেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশটির অভ্যন্তরে মাটির নীচে থাকা ইউরেনিয়াম জব্দ করার লক্ষে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করছেন ট্রাম্প।
গত রবিবার রাতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরানকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মানতে হবে, অন্যথায় 'তাদের কোনো দেশ থাকবে না'। ইরানের ইউরেনিয়াম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, 'তারা আমাদের কাছে পারমাণবিক ধূলিকণা সোপর্দ করতে যাচ্ছে।'
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন নাবিক ও নৌসেনা (মেরিন) মোতায়েন করা হয়েছে, যা একটি স্থল অভিযানের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন পোস্ট-কে জানিয়েছেন, পেন্টাগন স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যা এখন কেবল প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, 'কমান্ডার-ইন-চিফকে সব ধরণের বিকল্প ও সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া পেন্টাগনের কাজ। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'
ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা খুব সহজেই ৯০ শতাংশ বা অস্ত্র তৈরির উপযোগী মানে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে এত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণের দরকার হয় না এবং এটি সম্ভবত অস্ত্র তৈরির জন্যই রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো 'পুরোপুরি ধ্বংস' করে দিয়েছে। তবে হামলার আগে তেহরান সেই সরঞ্জামগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়েছিল কি না বা সেগুলো এখনো মাটির নিচেই রয়ে গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আইএইএ-র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি এর আগে বলেছিলেন, তার বিশ্বাস ইউরেনিয়ামগুলো গত বছর আক্রান্ত হওয়া তিনটি স্থানের মধ্যে দুটিতে রয়েছে—যার মধ্যে ইসফাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সের একটি ভূগর্ভস্থ টানেল এবং নাতাঞ্জের একটি গোপন মজুত ভাণ্ডার অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে না। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া পারমাণবিক আলোচনায় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ত্যাগ করতে রাজি হয়েছিল।
