এক্সের লোকেশন ফিচার যেভাবে মার্কিন রাজনৈতিক অ্যাকাউন্টগুলোর আসল অবস্থান ফাঁস করল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) নতুন একটি 'ট্রান্সপারেন্সি টুল ফিচার' চালু করার পর বেশ কিছু জনপ্রিয় অ্যাকাউন্টকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। নতুন এই ট্রান্সপারেন্সি টুলের মাধ্যমে এখন অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারীর প্রকৃত অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
ফিচারটি চালুর পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া বহু 'হাই-এনগেজমেন্ট' অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ট্রাম্পপন্থী নানা অ্যাকাউন্ট যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাবি করলেও তাদের প্রকৃত অবস্থান দেশটির বাইরে। একইভাবে, ট্রাম্পবিরোধী বেশ কিছু অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও অবস্থান নিয়ে এমন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
এসব অ্যাকাউন্টের অনেক পোস্টের এনগেজমেন্ট লাখের ওপরে; লাইক, ভিউ, রিপোস্ট ও রিপ্লাই মিলিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে তারা। এক্সে এনগেজমেন্ট বেশি হলে প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করার সুযোগ থাকে।
এক্স প্রোফাইলে 'অ্যাবাউট দিস অ্যাকাউন্ট' নামের নতুন ট্যাবের মাধ্যমে এখন ব্যবহারকারীর অবস্থান–সংক্রান্ত তথ্য দেখা যাচ্ছে। তবে প্ল্যাটফর্মটি সতর্ক করে বলেছে—কেউ যদি সম্প্রতি ভ্রমণ করে থাকেন, সাময়িকভাবে অন্য কোথাও অবস্থান করেন বা ভিপিএন ব্যবহার করেন, তাহলে অবস্থানের তথ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে। তা সত্ত্বেও এক্সের পণ্য বিভাগের প্রধান নিকিতা বিয়ারের দাবি, তাদের অবস্থান-তথ্য '৯৯ শতাংশ নির্ভুল'।
গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক্সের 'ট্রাম্প_আর্মি_' (TRUMP_ARMY_) নামের একটি অ্যাকাউন্টের একটি পোস্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন। ওই পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, এই রায়ের ফলে প্রেসিডেন্ট এখন অপরাধীদের এল সালভাদরে ফেরত পাঠাতে পারবেন।
কিন্তু এক্সের তথ্য বলছে, কট্টর ট্রাম্পপন্থী হিসেবে পরিচিত ৫ লাখের বেশি ফলোয়ারবিশিষ্ট এই অ্যাকাউন্টটির প্রকৃত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে নয়—ভারতে।
এছাড়া দেখা গেছে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটির নাম বা ইউজারনেম চারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ পরিবর্তন আনা হয় ২০২২ সালের জুলাই মাসে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এখন ওই অ্যাকাউন্টের বায়োতে পরিবর্তন আনা হয়। 'একজন ভারতীয়, যিনি আমেরিকা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মাস্ককে ভালোবাসেন,' লেখা হয় সেখানে।
আরেকটি হাই-এনগেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট 'ইভানকা নিউজ_' নিজেকে ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকার 'ফ্যান অ্যাকাউন্ট' হিসেবে পরিচয় দেয়। এর অনুসারী সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়া নিয়েও অ্যাকাউন্টটি থেকে পোস্ট করা হয়েছিল।
কিন্তু এক্সের তথ্য অনুযায়ী, এই অ্যাকাউন্টের প্রকৃত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে নয়—নাইজেরিয়ায়। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটির ইউজারনেম মোট ১১ বার বদলানো হয়েছে।
অবস্থান ফাঁস হওয়ার পর অ্যাকাউন্টটির পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে বলা হয়, 'যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকেও আমাদের কেউ কেউ সত্যিকার অর্থেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আন্দোলনকে সমর্থন করেন।'
তবে পাশাপাশি এমন আরও কিছু অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো থেকে নিয়মিত ট্রাম্পবিরোধী পোস্ট দেওয়া হতো। এক্সের নতুন লোকেশন–ফিচারে দেখা যাচ্ছে, এসব অ্যাকাউন্টের অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে।
এর মধ্যে এক অ্যাকাউন্টের অনুসারী ছিল ৫২ হাজার। প্রোফাইলে নিজেকে 'গর্বিত ডেমোক্র্যাট' এবং 'পেশাদার মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) শিকারি' হিসেবে পরিচয় দেওয়া অ্যাকাউন্টটি আসলে কেনিয়া থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যবহারকারী তার প্রোফাইলটি মুছে ফেলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও কিছু অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যেগুলো নিজেদের স্কটল্যান্ডের বলে পরিচয় দিত। এগুলো থেকে মূলত স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে পোস্ট করা হতো।
কিন্তু এক্সের তথ্য বলছে অন্য কথা। দেখা যাচ্ছে—এই অ্যাকাউন্টগুলো ইরানের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ব্যবহার করে এক্সে প্রবেশ করছে। যদিও লোকেশন ট্যাবে এদের অবস্থান নেদারল্যান্ডস হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তবে এক্স সেখানে একটি সতর্কবার্তা জুড়ে দিয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এসব অ্যাকাউন্টে ভিপিএন ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
অবস্থান গোপন করা বেশির ভাগ অ্যাকাউন্টেরই রয়েছে 'ব্লু টিক'। অর্থাৎ তারা টাকার বিনিময়ে এক্সের প্রিমিয়াম সেবা গ্রহণ করছে। এক্সের মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পরিচয় যাচাই, তিন মাসে অন্তত ৫০ লাখ ইমপ্রেশনসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।
কর্নেল টেকের অ্যালেক্সি মান্তজারলিসের মতে, ব্লু টিক অ্যাকাউন্টগুলোই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'ব্লু টিক কেবল এটি প্রমাণ করে যে এক্স টাকার বিনিময়ে ব্যাজ দিচ্ছে, যা তাদের আয়ের উৎস। এটি মোটেই সিরিয়াস কোনো ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা নয়।'
তবে তিনি মনে করেন, এক্সের 'কমিউনিটি নোটস'–এর মতো ফিচারগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। ভাইরাল পোস্টের প্রেক্ষাপট বা যাচাই–সংক্রান্ত তথ্য অন্য ব্যবহারকারীরা যুক্ত করতে পারছেন।
গবেষকেরা বলছেন, নিজের অবস্থান গোপন করার পেছনে উদ্দেশ্য একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটির মিডিয়া ফরেনসিকস হাবের মিসইনফরমেশন বিশেষজ্ঞ ড্যারেন লিনভিল বলেন, 'কিছু অ্যাকাউন্ট ট্রল ফার্ম বা কোনো রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত হয়। আবার কিছু অ্যাকাউন্ট কেবল আমেরিকান সেজে টাকা আয়ের চেষ্টা করে।'
অ্যালেক্সি মান্তজারলিসও মনে করেন, অর্থ উপার্জন এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। তার ভাষায়, 'আমেরিকার সংস্কৃতি বা রাজনীতি নিয়ে উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমেই সব সময় কিছু অর্থ আয়ের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোও বারবার ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সুবিধা নেয়। অর্থ ও রাজনীতি—উভয় উদ্দেশ্যই এখানে কাজ করছে।'
লিনভিলের মতে, এক্স নতুন ফিচার চালু করলেও প্রতারকেরা দ্রুতই এর ফাঁকফোকর খুঁজে নেবে। তার আশঙ্কা, 'যাদের উদ্দেশ্য খারাপ, তারা খুব দ্রুত এর সঙ্গে মানিয়ে নেবে। ভিপিএন ব্যবহার করে বা অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি বদলে এমন ভাব দেখাবে, যেন তারা যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশ থেকেই অ্যাকাউন্টটি খুলেছে।'
