সস্তা ল্যাপটপের যুগ কি তবে শেষ হতে চলল?
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি পিসি তৈরির জন্য মাদারবোর্ড, প্রসেসর এবং ডিডিআর৫ মেমোরি কিনতে খরচ পড়েছিল প্রায় ৮০০ ডলার। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগে একই যন্ত্রাংশ কিনতে গিয়ে দেখা যায়, খরচ ঠেকেছে ১ হাজার ২০০ ডলারে!
এই আকাশছোঁয়া দামের পেছনে রয়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব। কেউ এআই ব্যবহার করুক বা না করুক, দৈনন্দিন জীবনে এর উত্তাপ এখন স্পষ্ট। এআই ডেটা সেন্টার তৈরির প্রবল প্রতিযোগিতার কারণে বাজারে কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাশ্রয়ী মূল্যের ডিভাইসগুলো।
কম্পিউটার আরও দামি হচ্ছে
পিসির যন্ত্রাংশ ও ল্যাপটপের বাজারে এই দাম বৃদ্ধির আঁচ এরই মধ্যে লেগেছে। ফোন ও অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইসের দাম বাড়াও প্রায় নিশ্চিত।
গত শরৎ থেকেই সাধারণ পিসির মেমোরি বা র্যামের দাম আকাশছোঁয়া। গত গ্রীষ্মের তুলনায় এই দাম এখনও প্রায় ৩০০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এসএসডির দামও তীব্রভাবে বেড়েছে; কিছু ক্ষেত্রে তা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
ফলে প্রচণ্ড চাপে পড়েছে ল্যাপটপের বাজার। শুল্ক এড়াতে কোম্পানিগুলোর আগে থেকে মজুত করা পণ্যের কারণে ২০২৫ সালের মডেলগুলোর দাম কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন মডেলগুলোর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ডেলের ২০২৫ সালের 'প্রিমিয়াম ১৪' মডেলের দাম ছিল ১ হাজার ৫৫০ ডলার। অথচ তাদের নতুন 'এক্সপিএস ১৪' বাজারে এসেছে ২ হাজার ডলারের বেশি দামে। একইভাবে আসুসের 'জেনবুক ডুয়ো'-এর দাম ১ হাজার ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের সংস্করণে ২ হাজার ৪০০ ডলারে ঠেকেছে। অন্যান্য নির্মাতারাও একই পথে হাঁটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যের ডিভাইসের সংকট প্রকট হতে পারে।
ডেস্কটপ কম্পিউটারের দাম বাড়ার পাশাপাশি এর কনফিগারেশনও আগের চেয়ে দুর্বল হতে পারে। গ্রাফিক্স কার্ডগুলো আবারও দামি ও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এই প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না ভিডিও গেম কনসোলও। সরবরাহ ঘাটতির কারণে ভালভ-এর 'স্টিম মেশিন' বাজারে আসা পিছিয়ে গেছে। সনির নতুন প্লেস্টেশন এবং নিনটেনডোর 'সুইচ ২'-এর দাম ও বাজারে আসার সময় নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত বছর শুল্ক এড়াতে মজুত বাড়ানো বা কারখানা স্থানান্তরের মতো নানা কৌশল নিয়েছিল কোম্পানিগুলো। কিন্তু ২০২৬ সালে এসব কৌশল আর কাজে আসছে না। কারণ, এখন উৎপাদনের মূল খরচই বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে।
কেন এমনটি ঘটছে
সহজ কথায়, এআই ডেটা সেন্টার ও হার্ডওয়্যারে বিপুল বিনিয়োগের কারণেই প্রযুক্তিপণ্যের এই বাজার ব্যবস্থা পাল্টে গেছে। আর এর পুরো দায়ভার চাপছে সাধারণ ভোক্তাদের ঘাড়ে।
সাধারণ ডিভাইসের যন্ত্রাংশ তৈরিতে যেসব কাঁচামাল লাগে, এআই কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থের বিনিময়ে ঠিক সেগুলোই কিনে নিচ্ছে। অভাবনীয় এই চাহিদার সুযোগে পিসির যন্ত্রাংশ বিক্রেতারাও দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে নির্মাতারা এখন সাধারণ ডিভাইসের বদলে এআই-নির্ভর যন্ত্রাংশ তৈরিতেই বেশি ঝুঁকছেন। এই বাড়তি খরচের পুরোটাই শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের পকেট থেকে যাচ্ছে এবং সামনে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে চলেছে।
মেমোরি এবং স্টোরেজের সরবরাহ শৃঙ্খল
আমাদের ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস মাত্র গুটিকয়েক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। পিসি ও স্মার্ট ডিভাইসের প্রায় সব মেমোরি এবং স্টোরেজ চিপ তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন।
একইভাবে, আধুনিক প্রসেসরগুলোর সিংহভাগই তৈরি হয় তাইওয়ানের টিএসএমসি এবং স্যামসাংয়ের মতো হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায়। সাধারণ ফোন বা ল্যাপটপের পাশাপাশি এআই সার্ভার তৈরিতেও এই একই যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সীমিত কারখানা ও কাঁচামালের কারণে এসব কোম্পানির উৎপাদন বাড়ানোর একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।
গত শরতে যন্ত্রাংশ সরবরাহের এই চেনা হিসাব পুরোপুরি পাল্টে যায়। ওপেনএআই ঘোষণা দেয় যে, তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের উৎপাদিত মেমোরির একটি বিশাল অংশ কিনে নিয়েছে। এই চুক্তি বিশ্বজুড়ে র্যাম সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করে নিতে পারে। এই একটি ঘোষণাই যন্ত্রাংশের বাজারে রীতিমতো যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না থাকতে অন্যান্য এআই কোম্পানিগুলোও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে মেমোরি ও স্টোরেজ কিনে নিতে শুরু করে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের পণ্যের বাজারে তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং পিসির যন্ত্রাংশের দাম রকেটের গতিতে বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কিছু যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ২০২৬ সালের জন্য তাদের পুরো মজুত এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দিয়েছে।
পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে আরও খারাপ হবে
নিকট ভবিষ্যতে এই সংকট কমার কোনো লক্ষণ নেই। শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেল ও এইচপি আগেই সতর্ক করেছে যে, উৎপাদন খরচ সব ক্ষেত্রেই বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব মোকাবিলায় তারা পণ্যের ডিজাইনে পরিবর্তন আনা এবং দাম বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অ্যাপল তাদের ৬০০ ডলারের নতুন 'ম্যাকবুক নিও' দিয়ে এই স্রোতের বিপরীতে হাঁটার চেষ্টা করছে। আইফোন ১৬-এর প্রসেসর ব্যবহার করে এর খরচ কমানো হয়েছে। আইডিসি-র বিশ্লেষক জিতেশ উবরানি মনে করেন, অ্যাপলের এই আক্রমণাত্মক দাম নির্ধারণ অন্য ব্র্যান্ডগুলোকে কঠিন প্রতিযোগিতায় ফেলবে। তবে এই ল্যাপটপের স্টোরেজ ও মেমোরি সীমিত হওয়ায় এর পারফরম্যান্স ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, অ্যাপলের নতুন ম্যাকবুক প্রো এবং এয়ার মডেলগুলোর দাম এরই মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
লেনোভো, এইচপি এবং ডেলের মতো কোম্পানিগুলোর পুরোনো মজুত শেষ হয়ে আসছে। আইডিসির বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেমোরির এই চড়া দাম বজায় থাকতে পারে। এর প্রভাব স্মার্টফোন ও গেমিং কনসোলের বাজারেও পড়বে।
যন্ত্রাংশ নির্মাতাদের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো তাড়াও নেই। কারণ, ভবিষ্যতে এআই-এর চাহিদা কমে গেলে তারা উদ্বৃত্ত পণ্য নিয়ে লোকসানে পড়তে চান না। সব মিলিয়ে দাম কমার আগে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ারই আশঙ্কা বেশি।
এখন কেনা উচিত নাকি অপেক্ষা করা ভালো?
আগামী দুই বছর নতুন কম্পিউটার কেনা যে বেশ খরুচে ব্যাপার হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত। এআই-এর এই উন্মাদনা যদি সাময়িকও হয়, তবু সহসাই দাম আগের জায়গায় ফিরবে না। বিশ্লেষকদের মতে, দাম একবার বাড়লে প্রতিযোগিতা না হওয়া পর্যন্ত তা কমানো কঠিন।
ক্রেতাদের পকেটের জোর অনুযায়ী বাজারে এখন মাঝারি ও প্রিমিয়াম পণ্যেরই আধিপত্য থাকবে। সাশ্রয়ী বা এন্ট্রি-লেভেলের পণ্যের দেখা মেলা ভার হবে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সত্যিই নতুন কম্পিউটার প্রয়োজন কি না, তা আগে ভেবে দেখুন। যদি পিসি তৈরি করতে চান, তবে অপেক্ষা না করে এখনই যন্ত্রাংশ কিনে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ২০২৭ সালের আগে এই সংকট কাটছে না।
ল্যাপটপ কিনতে চাইলে ২০২৫ সালের মডেলগুলো পুরোনো দামে থাকতেই কিনে ফেলা ভালো। তা না হলে বছরের শেষে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি টাকা গুনতে হবে। ওয়্যারকাটার ডিলস-এর সম্পাদক নাথান বারো জানিয়েছেন, 'কম দামি ল্যাপটপের মজুত ফুরিয়ে এলেই সেগুলোতে ছাড় দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে এবং দাম বাড়বে।'
নতুন ল্যাপটপ কেনা বাজেটের বাইরে গেলে ব্যবহৃত ল্যাপটপ কেনার কথা ভাবা যেতে পারে। অথবা বর্তমান ডিভাইসটিকে মেমোরি ক্লিন আপ বা হালনাগাদ করে আরও কিছুদিন ব্যবহার উপযোগী রাখার চেষ্টা করাই হবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত।
