ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সপেক্টর: ছদ্মবেশী, সন্ধানী অসীম মল্লিকের গল্প
ঢাকার পরীবাগ থেকে চাঁদপুরের শাহরাস্তি, সুন্দরবনের ধার ঘেঁষা ভাদালবাজার থেকে কুমিল্লার তৃপ্তি হোটেল—কখনো ক্রেতা সেজে পাচারকারীদের সঙ্গে দর কষাকষি করেন, কখনো শেষ রাতে ঢুকে পড়েন টিয়া পাখি ভর্তি গোপন গুদামে, আবার কখনো ছদ্মবেশে বনে-বাঁদাড়ে খুঁজে ফেরেন বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের। অসীম মল্লিক যেন গোয়েন্দা কাহিনীর নায়ক। তিনি বাংলাদেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক বা ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সপেক্টর।
ঘটনা: ১
সময়: ২০২০ সাল
স্থান: সাকুরা বার ভবন, পরীবাগ, ঢাকা
তথ্যদাতা নিশ্চিত করেছিলেন, ঘরটিতে তিনটি হরিণের চামড়া আছে। সোর্সকে নিয়ে অসীম মল্লিক অকুস্থলে পৌঁছে দেখেন ঘরটি তালাবদ্ধ। খালি হাতেই ফিরতে হলো।
তিনি ভাবলেন, সোর্সকে কিছু খাওয়ানো দরকার। নারায়ণগঞ্জে তাকে ফিরতে হবে, যাতায়াত খরচও দিতে হবে। এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে জানলেন, সাকুরা বারের নিচে একটি এটিএম বুথ আছে। গিয়ে দেখলেন কথাটি সত্যি নয়।
তাই সোর্সকে বললেন, "আজকে নিজের মতো ব্যবস্থা করে নাও, তোমাকে পরে টাকা মিটিয়ে দেব।" সোর্স চলে গেলে অসীম কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বসলেন।
ভবনের নিচতলায় দুটি হ্যান্ডিক্রাফটের দোকান দেখতে পেলেন। প্রায় পনের মিনিট ধরে খেয়াল করলেন, কোনো কাস্টমার আসছে না। তিনি ভাবলেন, এমন জায়গায় দোকান ভাড়া নিশ্চয়ই সস্তা নয়, খরচও কম হওয়ার কথা নয়। কাস্টমার না পেলে কীভাবে চলে?
তিনি কাছে গিয়ে দেখতে চাইলেন দোকানে কী কী আছে। প্রথম দোকানটিতে কিছু সাধারণ সৌখিন দ্রব্য দেখলেন। তারপর চোখ পড়ল কাঁচ ঢাকা লম্বা টানা বাক্সের ওপর। সেখানে দুটি মানিব্যাগ রাখা। তিনি বুঝতে চাইলেন, এগুলো কিসের চামড়ায় তৈরি। বুঝতে দেরি হলো না—অজগরের চামড়া দিয়ে তৈরি।
ক্রেতা সেজে তিনি দাম জানতে চাইলেন।
বিক্রেতা ছিলেন বয়স্ক। প্রথমে অসীমকে নিরীক্ষা করলেন। অসীম বললেন, বিদেশে তার ব্যবসা আছে এবং তিনি বেশ কিছু পণ্য কিনতে চান। এতে বিক্রেতা আশ্বস্ত হলেন। তিনি চুপিসারে বললেন, "ম্যানিব্যাগগুলো অজগরের চামড়ায় তৈরি। দুটি চৌদ্দ হাজার টাকায় নিতে পারবেন।"
এর মধ্যে অসীম হরিণের চামড়ায় তৈরি দুটি ভ্যানিটি ব্যাগও দেখতে পেলেন। আরও একটি ছিল বাঘের চামড়ার।
অসীম তখন জানতে চাইলেন, বিক্রেতা খেয়েছেন কি না। বিক্রেতা জানালেন, খাননি। অসীম বললেন, "খেয়ে নিন, তারপর চামড়ার তৈরি যা যা আছে সবই দেখতে চাই। পছন্দ হলে নেব।"
বিক্রেতা খেতে বসলে অসীম ঘুরে আসার ছল করে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলমকে ফোন করলেন। আগেও তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। ঘটনা শোনার পর সরওয়ার আলম বললেন, "আমাদের একটি টহল দল হোটেল শেরাটনের (এখন হোটেল কন্টিনেন্টাল) কাছেই আছে, অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারবে।"
এরপর অসীম তাদের অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালককে ফোন দিলেন। তিনিও দ্রুত একটি টিম পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই সবগুলো টিম এসে গেল।
অসীম দোকানদার ও তার সহযোগীদের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুসারে ভ্রাম্যমাণ আদালতে মামলা দায়ের করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম প্রত্যেক আসামিকে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন এবং দোকানটি সিলগালা করে দেন।
ঘটনার বর্ণনা শেষে অসীমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কারা এসব পণ্যের ক্রেতা? তিনি বললেন, "হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং সোনারগাঁও এখান থেকে কাছে। বিদেশিরা মূলত এসব হোটেলে থাকেন। ধারণা করা যায়, তারাই পণ্যগুলোর প্রধান ক্রেতা। তাদের নিজ দেশের তুলনায় এখানে এসবের দাম কম হওয়ার কথা।"
বন্যপ্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত হলো পাখি। এগুলো পাওয়া যায় ঝাঁকে ঝাঁকে, রাখার জায়গা লাগে কম, আর পাচার করাও সহজ।
২০১৭ সালে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন পাখির বাজার থেকে ১,৪৪৫টি পাখি উদ্ধার করেছিল বন্যপ্রাণী দমন ইউনিট। সেবার অসীমদের সঙ্গে র্যাবের একটি দল ছিল বলে ঝুঁকি কম ছিল।
তবে নির্দিষ্ট ভবনটি খুঁজে পেতে তারা বিপাকে পড়েছিলেন। ইনফর্মারের তথ্যের ভিত্তিতে দু-তিনটি সম্ভাব্য ভবন খুঁজেও কিছু না পেয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে একটি দেড়তলা ভবনকে শেষ টার্গেট করেছিলেন। আর সেটিই ছিল একটি গোডাউন।
অভিযান চালিয়ে সেখানে ১,৪৪৫টি টিয়া পাখি উদ্ধার করা হয়।
এই পাখিগুলো নভেম্বর-ডিসেম্বরে মৌসুম চলাকালে ধরা হয়। গোডাউন মালিক এগুলো ৩০০-৪০০ টাকায় কিনে রাখেন। এপ্রিল-মে মাসে পাখির অভাব দেখা দিলে একেকটি ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি করেন।
ঘটনা: ২
সময়: ২০১৮ সাল
স্থান: ছাগলনাইয়া, ফেনী
সীমান্তবর্তী এক প্রত্যন্ত গ্রাম। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস, ধান কাটা শুরু হয়েছে। এই সময়ে শত সহস্র টিয়া পাখি ধানক্ষেতে এসে জড়ো হয়। আর সেই সুযোগে পাচারকারীরা সেগুলো ধরে চালান দেয়।
এমন একটি দলের সর্দার ছিলেন বারেক মেম্বার। অসীমের সোর্স খবর দিলেন—বারেকের বাড়িতে পাখি আছে, পাক্কা খবর। তবে অসীমদের আসতে হবে ভাড়া গাড়িতে।
রাত ৩টা নাগাদ অসীমরা পাকা রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছান। গাড়ি রেখে হেঁটে এগোলেন। প্রায় দেড় কিলোমিটার যাওয়ার পর তারা বারেকের বাড়ি দেখতে পান। আশপাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকলেন। পরিকল্পনা ছিল—বারেক মেম্বার যখন দলবল নিয়ে পাখি পাচারের জন্য বের হবেন, তখনই হাতে নাতে ধরবেন।
কিন্তু আজানের ধ্বনি ভেসে এল। মুসল্লিরা নামাজে যাচ্ছেন। অথচ বারেক এখনো বেরোয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ ফর্সা হয়ে আসতে লাগল। অসীম ভাবলেন, ধরা পড়লে গ্রামবাসী চোর ভেবে পিটুনি দিতে পারে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে বারেকের বাড়িতে ঢুকে পড়লেন।
বাড়িতে বারেকের স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। পাখিও নেই একটিও। পাশের খড়ের ঘরে ঢুকে কাউকে পাওয়া গেল না। তবে চালের ওপর এক লোককে দেখা গেল, সে বোবা। কিছুক্ষণ পর বারেক মেম্বারকেও পাওয়া গেল। ততক্ষণে তিনি প্রতিবেশীদের ডেকে এনেছেন।
প্রতিবেশীরা এসে অসীমদের হুমকি দিতে শুরু করল। সত্যিই তারা বিপদে পড়ে গেলেন। পুলিশ বা র্যাবকে খবর দিলেও পৌঁছতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা লেগে যাবে।
এদিকে, সোর্স বাড়ির চারপাশে হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, কোথাও না কোথাও পাখি আছে। হঠাৎ তিনি খড় দিয়ে ঢাকা একটি গর্তে পড়ে যান। পড়ে যেতেই শত শত পাখি হৈচৈ শুরু করে দিল।
সবাই দৌড়ে গিয়ে গর্তের কাছে হাজির হলো। শত শত পাখি দেখে গ্রামবাসী মুষড়ে পড়ল। তাদের মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলেন। তিনি সবার পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, "বারেক মেম্বার আর যদি এই কাজ করে, তবে আমরা সালিশ ডেকে তাকে শাস্তি দেব।"
বারেকের বাড়ি থেকে ৮০০-৯০০ পাখি উদ্ধার করা হলো। পরে সেগুলো ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে অবমুক্ত করা হয়।
এর আগে ২০১৬ সালের জুন মাসে বাগেরহাটের ভাদালবাজার থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ২,২০০ মুনিয়া পাখি। রাত এগারোটায় অপরাধ দমন ইউনিটের গাড়িটি বাজারের গোলচত্বর ঘুরতে থাকলে পাখির কারবারিরা টের পেয়ে যায়।
সামনের ঘরে কোনো পাখি পাওয়া গেল না। সেটি পার হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে অসীমরা হতবাক হলেন। হাজার হাজার মুনিয়া পাখি সেখানে আটকা! শব্দ খুব একটা করছিল না, না করলে কান পাতা যেত না। মশারির ভেতর পাখিগুলো আটকে রাখা হয়েছিল। অসীমরা সেগুলো জব্দ করলেন।
অসীম জানালেন, "মুনিয়া পাখি উপকূলীয় এলাকা থেকে ধরা হয় বেশি। নলখাগড়া ও হোগলাপাতার বনে জাল বিছিয়ে রাখলে প্রতি রাতে এক থেকে দেড় হাজার পাখি ধরা পড়ে।"
এরপর যে ঘটনা অসীম শোনালেন সেটিও ভাদালবাজারের, আর তা ছিল আরও বেশি রোমাঞ্চকর।
ঘটনা: ৩
সময়: এপ্রিল ২০১৫
স্থান: ভাদালবাজার, বাগেরহাট
অসীম মল্লিকের ইনফরমার খবর দিলেন—বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার ভিতরে, সুন্দরবনের ধার ঘেঁষা এক বাড়িতে হরিণ, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া মজুত আছে। শিকারিরা নিয়মিত এ ধরনের ব্যবসা করে। জায়গাটির চারদিকে মাছের ঘের, কোনো বসতি নেই, ভয়ংকর নির্জন।
অসীম একজন ব্যবসায়ী সেজে শিকারিদলের প্রধানকে ফোন করলেন। বললেন, চীনে চামড়া পাঠানোর কাজ তিনি করতেন, এখন বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছেন। তবে পূর্বপরিচিত এক কাস্টমারের অনুরোধে কিছু চামড়া প্রয়োজন। হরিণের চামড়া লাগবে ১০-১২টি।
জিজ্ঞেস করলেন, "কত করে দাম পড়বে?"
শিকারি উত্তর দিলেন, "৮০ হাজার টাকা।"
৭০ হাজার থেকে দামাদামি শুরু হলো শেষে ৭৫ হয়ে ৮০ হাজারেই রাজি হলেন অসীম। চামড়া ডেলিভারির তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট হলো সকালে। শিকারি নৌপথ ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন। অসীম বললেন, "সড়কপথেই ভালো। পুলিশের সঙ্গে আমার কথা বলা আছে, কোনো অসুবিধা হবে না।"
ভাদালবাজার থেকে পরের ৩ কিলোমিটার পুরোটাই কাঁচা পথ। চামড়া ডেলিভারি দেওয়ার স্থান নির্ধারিত হলো—বাড়ি থেকে বাজারের দিকে কিছুটা এগিয়ে একটি ব্রিজে।
এই অভিযানে যুক্ত হলো ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি)। নির্দিষ্ট তারিখের আগে প্ল্যান এ এবং প্ল্যান বি—দুটি পরিকল্পনা করা হলো। প্ল্যান এ: অগ্রবর্তী দল হবে অসীমরা, অনুগামী দল ডিবি। প্ল্যান বি: প্রথমটিতে অসুবিধা দেখা দিলে কার্যকর হবে। এতে অগ্রবর্তী দল হবে ডিবি, অনুগামী দল অসীমরা।
রাতে খুলনায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল অসীমদের। ভেবেছিলেন সকাল আটটায় শিকারিদের সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু শিকারিরা জানাল, ভোর ছয়টায় চামড়া সরবরাহ করবে। খুলনা থেকে তখন পৌঁছানো সম্ভব নয়।
অসীম ডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তারা বাগেরহাটে ছিল, তাই প্ল্যান বি কার্যকর হলো। পরদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ডিবির একজন দুজন করে এগোতে থাকলেন। দলটি সংঘবদ্ধভাবে পৌঁছালে শিকারিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনজন ধরা পড়ে। বাকিরা বনের দিকে পালাল।
বাড়িতে রেইড চালিয়ে উদ্ধার হলো—১০টি হরিণ, ১টি গন্ধগোকুল ও ১টি মেছোবাঘের চামড়া। অসীম আসামিদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করলেন। উদ্ধার করা চামড়াগুলো ঢাকার বন ভবন কার্যালয়ে এনে সংরক্ষণ করা হয়।
প্রদর্শনের নামে চোরাচালানী
অসীম মল্লিক জানালেন, শুধু সংঘবদ্ধ চক্র নয়—প্রতিষ্ঠানও যুক্ত থাকে এই চোরাচালানীতে। বিশেষ করে প্রাইভেট পার্কগুলো।
দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী, মেহেরপুরের মনোরমা মিনি চিড়িয়াখানা, ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন পার্ক, বগুড়ার রাবেয়া পার্ক—এসব আসলে বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের নামে চোরাচালানীতে যুক্ত।
মনোরমা পার্কটি মেহেরপুরের মুজিবনগরে। এখানকার সীমান্ত দিয়ে বন্যপ্রাণী পাচার দিনে দিনে বাড়ছে। সংবাদ পেয়ে অপরাধ দমন ইউনিট গত ২৫ মে মনোরমা পার্ক থেকে ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে। এর মধ্যে ছিল দুইটি হনুমান, দুইটি বানর, আটটি কালেম, একটি সজারু এবং একটি অজগর।
রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব পার্কের মালিক হওয়ায় তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না।
জয়নুল আবেদিন পার্কটি ছিল ময়মনসিংহ পৌর মেয়রের মালিকানায়। খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেখানকার দুটি ভাল্লুক নিজেদের মধ্যে মারামারি করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। গত এপ্রিলে সেগুলো উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বপ্নপুরী থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ৭৪টি দেশীয় বন্যপ্রাণী। অভিযানে অপরাধ দমন ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত ছিল চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।
বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা হয়—হুলক গিবন, এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার, ক্যাপড লাঙ্গুর, গ্রেটার হর্নবিল, লজ্জাবতি বানর, ভোঁদর, মায়া হরিণ, রাজধনেশসহ আরও অনেক প্রাণী।
এসব প্রাণী দীর্ঘদিন ধরে আইন বহির্ভূতভাবে প্রদর্শিত হচ্ছিল। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় প্রাথমিক তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পাখির মাংসের ক্রেতা
অসীম মল্লিক আরেকটি দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন—হোটেলে রান্না করা পাখির মাংস বিক্রি।
একবার এক নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পেয়ে অপরাধ দমন ইউনিট হাজির হয়েছিল কুমিল্লার তৃপ্তি হোটেলে। চৌদ্দগ্রাম থানার চট্টগ্রাম হাইওয়ে রোডের পাশে হোটেলটির অবস্থান।
প্রথমে সাধারণ ক্রেতা সেজে টেবিলে বসেন অসীম ও তার সহকর্মীরা। তারা জানতে চান, পাখির মাংস আছে কি না। বেয়ারা উত্তর দেয়, "বালিহাঁসের মাংস আছে, খেয়ে স্বাদ পাবেন।"
অসীম জিজ্ঞেস করেন, "সত্যি সত্যি বালিহাঁসের মাংস?"
বেয়ারা তাদের বিশ্বাস করাতে ফ্রিজের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে সাজানো ছিল পানকৌড়ি, ঘুচি বক, নিশি বক, সরালি ও ঘুঘুর মাংস।
এরপর আর প্রমাণের বাকি থাকে না। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে সব মাংস জব্দ করে অপরাধ দমন ইউনিট। খবর পেয়ে হোটেল মালিক সমিতির সদস্যরা এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদরা উপস্থিত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা উদ্বেগও জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করবেন।
ঘটনা: ৪
সময়: ডিসেম্বর ২০২৪
স্থান: শাহরাস্তি, চাঁদপুর
৮০০ কেজি কচ্ছপের সবচেয়ে বড় চালানটি আটক করেছিল অপরাধ দমন ইউনিট গত বছরের ১০ ডিসেম্বর।
কচ্ছপ চোরাচালানীরা কুচিয়া ধরার আড়ালে মূলত কচ্ছপ ধরে থাকে। এরপর সেগুলো ভারতে পাচার করে। পাচারকারীরা চাঁদপুরের স্থানীয় নয়, ভাড়া বাড়িতে থাকেন। মহাজন কুষ্টিয়া বা ময়মনসিংহ থেকে ১০-১২ জন লোক ভাড়া করে আনেন। কয়েকজন সারাবছর থাকেন, মৌসুম এলে আরও কয়েকজন যোগ দেন।
চাঁদপুরে নিত্য জোয়ার-ভাটা হয়। পানি নেমে গেলে কিছু কচ্ছপ কাঁদামাটিতে আটকা পড়ে। পাচারকারীরা সেই সুযোগ নেয়।
ইনফরমার অসীমদের বলেছিলেন রাত ১১টায় আসতে। গন্তব্য ছিল মেইন রোড থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে। ইউনিটের সদস্যরা হেঁটে রওনা হন।
নির্দিষ্ট বাড়িতে গিয়ে দেখলেন সামনের অংশে একটি ওয়ার্কশপ। সেখানে লেদ মেশিনে লোহা-লক্করের কাজ চলছে। অসীম প্রমাদ গুনলেন—যদি কোনোভাবে পাচারকারীরা মব তৈরি করে ফেলে, তাহলে বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তিনি সাহস করে পরিচয় দিলেন এবং ভিতরের ঘরে ঢুকে কচ্ছপগুলো খুঁজে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। না পাওয়া গেলে কী পরিস্থিতি হতো, বলা মুশকিল।
ওয়ার্কশপ মালিক স্থানীয় হওয়ায় অসীম তাকে বোঝালেন, "একদিকে বন্যপ্রাণী ধরা অবৈধ, অন্যদিকে এর কারণে আপনাদের এলাকারও বদনাম হচ্ছে।"
সেদিন তিন প্রজাতির প্রায় ১,০০০ কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়েছিল, যার ওজন ছিল মোট ৮০০ কেজি। এর মধ্যে— সুন্ধি কাছিম ৫০০ কেজি; কড়ি কাইট্টা ২৮০ কেজি; হলুদ কচ্ছপ ছিল ২০ কেজি।
নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর কচ্ছপগুলো প্রাকৃতিক জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়।
অসীম মল্লিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বন্যপ্রাণী চোরাচালানের হটস্পট কোনগুলো। তিনি বললেন, "স্থলবন্দর প্রায় সবগুলোই হটস্পট। তার মধ্যে বেশি বেনাপোল এবং হিলি বন্দর। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও একটি হটস্পট।"
বিমানবন্দর যখন হটস্পট
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বিমানবন্দর দিয়ে পাখির নখ পাচারের সময় ভারতীয় এক নাগরিককে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে ৪ কেজি পাখির নখ জব্দ করা হয়।
বলবৎ আইন ও সরকারি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব নখ বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করায় পাচারকারীর বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় এজাহার দাখিল করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি স্বীকার করেন, ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে করে জব্দকৃত নখগুলো তিনি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। আলামতগুলোর সঠিক প্রজাতি নির্ণয়ের জন্য বন অধিদপ্তরের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়।
এর কয়েকদিন আগে, ৩ ডিসেম্বর বিমানবন্দর দিয়ে কচ্ছপ পাচারের সময় আরেকজন আসামি আটক হন। ওই চালানে মোট ৩০৫টি বিদেশি কচ্ছপ ছিল। আলামত জব্দ করার সঙ্গে সঙ্গেই আটক করা হয় আসামি আবুল হোসেনকে, তার বাড়ি ঢাকার আশুলিয়ায়।
তিনি স্বীকার করেন, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সে চীন থেকে কচ্ছপগুলো তিনি বাংলাদেশে এনেছেন। আটককৃত কচ্ছপগুলোর মোট ওজন ছিল ৬ কেজি। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং কচ্ছপগুলো বনভবনে নিয়ে গিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
চলতি বছরের ২৯ মে অসীম ও তার সহকর্মীরা বিমানবন্দর থেকে জব্দ করেন ২৩টি বিদেশি প্রাণী। সংখ্যায় কম হলেও প্রাণীগুলো ছিল বিরল এবং এগুলো শত সহস্র টাকায় বিক্রি হয়। এর মধ্যে ছিল ৮টি বিয়ারডেড ড্রাগন, ২টি কর্নস্নেক, ২টি প্যাকম্যান ফ্রগ, ৬টি এলিগেটর স্ন্যাপিং টার্টলসহ অন্যান্য প্রাণী।
অসীম জানালেন, বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় তাদের ইনফরমাররা কাজ করেন। একবার ইনফরমারের খবর পেয়ে দক্ষিণ খানের চারতলা একটি বাড়ি থেকে—যেটি পুরোপুরি গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হতো—৮,০০০ কালো চিত্রা কাছিম উদ্ধার করা হয়েছিল।
বন অধিদপ্তর ইনফরমারদের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখে, যা নথিতে 'অ্যাওয়ার্ড' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা ইনফরমার হিসেবে কাজ করেন। আবার কখনো পাচারকারী দলের বহিষ্কৃত সদস্যও ইনফরমার হয়ে ওঠেন।
অসীম ও তার জীবন
গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় অসীম মল্লিকের বাড়ি। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। মাদারিপুরের শহীদ স্মৃতি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকায় এসে খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা তার সবসময়ই ছিল। শিক্ষা সফরে গিয়ে সেই মমতা আরও গভীর হয়। প্রাণী নিধন বা খাবার হিসেবে পাখির মাংস বিক্রি হতে দেখলে তিনি দুঃখ পেতেন এবং প্রাণী হত্যাকারীদের প্রতি ক্ষোভ অনুভব করতেন।
২০১২ সালে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর ভারতের দেরাদুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ওয়াইল্ডলাইফে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গাজীপুরের ভাওয়াল বনে ফরেস্ট সার্ভিস ট্রেনিংয়ে অংশ নেন। সেখানে তিনি স্মার্ট পেট্রলিং, ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ও আত্মরক্ষার কৌশল শিখেছেন।
শেষে অসীম বললেন, "আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এর একটি হলো ইনভেস্টিগেশনের ক্ষমতা নেই। তাই পাচারকারী দলের চক্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি না এবং ধারাবাহিকভাবে অনুসরণও করতে পারি না। আমাদের নিজস্ব অস্ত্র নেই, অস্ত্র পরিবহনের অনুমতিও নেই। নির্ভর করতে হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর।"
"দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পাচারকারীদের ধরতে গেলে যে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সেখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারলে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারব," যোগ করেন অসীম।
ছবি: অসীম মল্লিকের সৌজন্যেপ্রাপ্ত।