রাতের আঁধারে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভাঙার প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকের হাত ভাঙার অভিযোগ
শরীয়তপুরে রাতের আঁধারে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীরের তিনটি অংশ ভেঙে ফেলার প্রতিবাদ করায় সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিলের ওপর হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। হামলায় তার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বর্তমানে তিনি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে শরীয়তপুর শহরের আমিনবাগ এলাকায় প্রেসক্লাব চত্বরে এ ঘটনা ঘটে।
সাংবাদিক ইসরাফিলের অভিযোগ, শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি আবুল হোসেন সরদারের ছেলে পলাশ সরদারের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালান।
তবে হামলার অভিযোগের বিষয়ে পলাশ সরদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, শনিবার রাতে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীরের তিনটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কয়েকজন সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমিনবাগ এলাকায় প্রেসক্লাবটি অবস্থিত। ১৯৯৮ সালে জেলা প্রশাসন প্রেসক্লাবের নামে ১৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেয়। পরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ওই জমিতে প্রেসক্লাবের একটি একতলা নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে।
প্রেসক্লাবের পাশের জমিতে ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে 'শরীয়তপুর পার্ক' নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রেসক্লাবের জমিটি নেওয়ার উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন, এমন দাবি সাংবাদিকদের।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রেসক্লাবের সদস্য ও সাংবাদিকদের না জানিয়ে শনিবার রাতে সীমানা প্রাচীরের তিন দিকের অংশ ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হয়।
শনিবার রাতে বিএম ইসরাফিল তার ফেসবুক পোস্টে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের ছবি ব্যবহার করে সীমানা প্রাচীর ভাঙার বিষয়ে অভিযোগ ও প্রতিবাদ জানান।
রোববার সকালে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি প্রেসক্লাব চত্বরে গেলে সেখানে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার উপস্থিত ছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর তার ছেলে পলাশ সরদার ৮ থেকে ১০ জনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে আসেন বলে অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকেরা।
তাদের ভাষ্য, একপর্যায়ে পলাশ সরদার ও তার সহযোগীরা ইসরাফিলকে মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে অন্য সাংবাদিকেরা তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আকরাম এলাহী বলেন, 'সাংবাদিক বিএম ইসরাফিলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার ডান হাতের কবজি ভেঙে গেছে। এছাড়া কপাল, বুকের পাঁজর ও হাঁটুতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে।'
হামলার বিষয়ে বিএম ইসরাফিল বলেন, 'শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে। এমন খবর পেয়ে আমি তার সঙ্গে ফোনে কথা বলি। তিনি জানান, প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেনকে জানিয়ে সীমানা প্রাচীর ভাঙা হয়েছে। এর প্রতিবাদে আমি ফেসবুকে পোস্ট করি। পরে ওই ঘটনার জেরে আবুল হোসেনের ছেলে ও তার লোকজন আমার ওপর হামলা করেন।'
তিনি আরও বলেন, 'অন্য সাংবাদিকেরা কাছে না থাকলে তারা আমাকে মেরে ফেলত। আমি এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেব।'
এদিকে সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলা এবং প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা।
কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, 'সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরে প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারসহ হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।'
হামলার অভিযোগের বিষয়ে পলাশ সরদারের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও তার বাবা প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন সরদার বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে সমালোচনা করায় পলাশ ও তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। আমি জানতাম না সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলা করা হবে। ঘটনায় আমি নিজেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। আমি উদ্যোগ নিয়ে এ ঘটনার জন্য আমার সন্তানকে বিচারের মুখোমুখি করব।'
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, 'শরীয়তপুরের সাংবাদিকদের বরাদ্দ দেওয়া জমিটি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি। সেখানে স্থায়ী কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। এ কারণে সাংবাদিকদের অন্যত্র জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।'
তিনি আরও বলেন, 'জেলা প্রশাসনের পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রেসক্লাবের ওই জমিটি নিতে চেয়েছিলাম। সীমানা প্রাচীর ভাঙার বিষয়টি প্রেসক্লাবের সভাপতিকে জানানো হয়েছিল। যেহেতু সাংবাদিকেরা ওই জমি ছাড়তে চাচ্ছেন না, তাই সেখানে আগের মতো সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে দেওয়া হবে।'
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, 'সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনার শুনে পুলিশ পাঠিয়েছি। এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে মামলা নিয়ে মামলা নেওয়া হবে।'
