স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার সুপ্রিম কোর্টের, অভিবাসীদের ফের তৃতীয় দেশে পাঠানো শুরু করতে পারবেন ট্রাম্প
অভিবাসীদের নিজ দেশ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্ট) ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর থাকা স্থগিতাদেশ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার দেওয়া এই আদেশের ফলে অভিবাসীরা সেখানে গিয়ে কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, তা প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই তাদের ফেরত পাঠাতে পারবে প্রশাসন। এর মাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দ্রুত বহিষ্কারের যে প্রক্রিয়া ট্রাম্প প্রশাসন ব্যবহার করে আসছিল, তা আরও জোরদার হলো।
অভিবাসীদের তথাকথিত 'তৃতীয় দেশে' ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন বোস্টনের মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক ব্রায়ান মারফি। বিচার বিভাগের জরুরি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বিচারক মারফির সেই রায় স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে এই বিরোধের বিষয়ে আগামী ডিসেম্বরে শুনানি করতে সম্মত হয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। এর পরই নীতিটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক রায় দেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬ জন রক্ষণশীল এবং ৩ জন উদারপন্থি। আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাসন কার্যক্রম পুনরায় চালুর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন তিন উদারপন্থি বিচারক।
কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া ছাড়া অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে পাঠানো বন্ধে অভিবাসী অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর দায়ের করা একটি যৌথ (ক্লাস-অ্যাকশন) মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক মারফি ওই রায় দিয়েছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চালু হওয়া এই নীতির আওতায় ২৯টি দেশে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসীকে পাঠানো হয়েছে। তাদের বেশিরভাগকেই পাঠানো হয়েছে মেক্সিকোতে।
ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রশাসনের গৃহীত একাধিক পদক্ষেপের অন্যতম এটি। গত বছর পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট অভিবাসনবিরোধী ব্যাপক দমনপীড়ন চালাচ্ছেন, যা তাঁর অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার।
প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দক্ষিণ সুদানেও অভিবাসীদের পাঠিয়েছে। অপরাধ, অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেখানে মার্কিন নাগরিকদের যেতে নিষেধ করে থাকে। এছাড়া উগান্ডা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, লাইবেরিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং অন্যান্য দেশেও অভিবাসীদের পাঠানো হয়েছে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জেনারেল কাউন্সেল জেমস পারসিভাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, 'অপরাধী অবৈধ অভিবাসী এবং উন্মুক্ত সীমান্তের সমর্থকদের জন্য একটি খারাপ দিন।'
ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন লিটিগেশন অ্যালায়েন্সে বাদীদের আইনজীবী ট্রিনা রিয়ালমুতো বলেন, আদালত প্রশাসনকে 'মানুষকে এমন তৃতীয় দেশে পাঠানো পুনরায় শুরু করার অনুমতি দিয়েছে যেখানে তারা নিপীড়ন বা নির্যাতনের মুখোমুখি হবে। এটি সেই মানুষদের জন্য একটি বিপর্যয়কর পরিণতি, যাদের কোনো নোটিশ বা আশঙ্কার কথা জানানোর সুযোগ দেওয়ার আগেই হয়তো বিমানে তুলে দেওয়া হতে পারে।'
গত ফেব্রুয়ারিতে বিচারক মারফি রায় দিয়েছিলেন যে, এই নীতিটি অভিবাসন আইনের প্রক্রিয়া এবং মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে যথাযথ আইনি সুরক্ষাকে লঙ্ঘন করে। সাধারণত কোনো প্রতিকূল পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া এবং শুনানির সুযোগ প্রদান করা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।
ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি কট্টর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া সুপ্রিম কোর্ট এর আগেও এই আইনি চ্যালেঞ্জে প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। সে সময় অভিবাসী বহিষ্কার বন্ধে মারফির দেওয়া একটি প্রাথমিক আদেশ স্থগিত করেছিল আদালত। প্রশাসনের আরেকটি বিজয়ে সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীতে একদল অভিবাসীকে দক্ষিণ সুদানে পাঠানো থেকে রক্ষা করার জন্য বিচারকের দেওয়া নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয়।
যেসব অভিবাসীকে তাদের বহিষ্কারের আদেশে উল্লিখিত কোনো দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, তাদের নির্বাসন প্রক্রিয়া জোরদারে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উদ্যোগ নেওয়ার পর ২০২৫ সালে এ মামলার সূত্রপাত হয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছিল, যেসব তৃতীয় দেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিপীড়ন বা নির্যাতন না করার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক নিশ্চয়তা দেবে, তাদের সেখানে কোনো নোটিশ ছাড়াই দ্রুত পাঠানো যাবে। আর যেসব দেশ এমন নিশ্চয়তা দেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে নির্বাসিতদের গন্তব্য সম্পর্কে জানানো হবে এবং ব্যক্তি নিজে থেকে আশঙ্কার কথা জানালেই কেবল মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিপীড়ন বা নির্যাতনের সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করবে।
সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া জরুরি আবেদনে বিচার বিভাগ বলেছে, তৃতীয় দেশে নির্বাসন হলো 'সবচেয়ে খারাপ অপরাধী অভিবাসীসহ নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি নাগরিককে অপসারণের একটি অপরিহার্য হাতিয়ার।'
তবে বিচারক মারফি এবং প্রশাসনের সমালোচকেরা বলেছেন, যেসব অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর হাত থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল, এই নীতিতে তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বাদীরা বলেছেন, এই নীতির কারণে নির্বাসিতদের তৃতীয় দেশগুলো থেকে বেআইনিভাবে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র আগেই তাদের সুরক্ষা দিয়েছিল। এছাড়া অন্য অভিবাসীরা মারধর, যৌন নির্যাতন, আটক কিংবা নিখোঁজ হওয়ার শিকার হয়েছেন।
বাদীরা বলেন, প্রশাসন 'যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসরত হাজার হাজার নাগরিক—যাদের অনেকের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই—তাদের সেখানে নিপীড়ন বা নির্যাতনের মুখে পড়ার বিষয়টি বিবেচনা না করে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার মারাত্মক ক্ষতিকর দিকটি উপেক্ষা করছে।'
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর বোস্টনভিত্তিক প্রথম ইউএস সার্কিট কোর্ট অব আপিল বিচারকের বেশিরভাগ রায় বহাল রেখেছিল।
শুরু থেকেই মামলাটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলে আসছিল। মামলার পর্যবেক্ষণে বিচারক মারফি উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রশাসন 'বারবার তার আদেশ লঙ্ঘন করেছে বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছে।' একদল অভিবাসীকে দক্ষিণ সুদানে পাঠানোর আগে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার যে আদেশ মারফি দিয়েছিলেন, প্রশাসন তা লঙ্ঘন করেছে বলেও ২০২৫ সালে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
