নিরাপত্তা উদ্বেগ সত্ত্বেও মিয়ানমারের শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো শুরু করেছে মালয়েশিয়া
জাতিসংঘ এবং বহু মানবাধিকার সংগঠনের প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে শরণার্থী প্রত্যাবর্তন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া।
মিয়ানমারের সাথে চুক্তি হওয়া এক বিস্তৃত পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার অধীনে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
মালয়েশিয়া দাবি করেছে, এই প্রত্যাবর্তন কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক, তবে মিয়ানমারে এখনো গৃহযুদ্ধ চলায় ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুত নৌঘাঁটির কাছের একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা বহরসহ বহু বাস এসে পৌঁছায়।
পরে বাসগুলোকে বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ নোঙর করা ছিল। তবে বাসগুলোতে ঠিক কারা ছিল, তা স্পষ্ট জানা যায়নি।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে অস্বীকার করেন এবং গণমাধ্যমকে গত ২৭ আগস্টের বিবৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
ওই বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে, এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমার সরকার কর্তৃক সনাক্ত করা ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমার নাগরিক অন্তর্ভুক্ত। অনুরোধ সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকারের কোনো মুখপাত্র এবং কুয়ালালামপুরে অবস্থিত দেশটির দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় যে, তারা যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে মিলে কাজ করে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ নয়: ইউএনএইচসিআর
২০২১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার, যেখানে দেশটির সেনাবাহিনী একাধিক ফ্রন্টে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, 'বর্তমান পরিস্থিতি মিয়ানমার থেকে শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে সমর্থন করে না।' তারা আরও জানায়, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় এই সংস্থা জড়িত ছিল না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের বিরোধিতা ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া তাদের অভিবাসন সংক্রান্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে; বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ক্ষেত্রে তারা আরও কঠোর নীতি অবলম্বন করছে।
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী বসবাস করছেন, যাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রোহিঙ্গা।
চলতি বছরে অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য ও ভুল তথ্যের কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি হয়রানি ও কঠোর নজরদারির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাপকভাবে তাদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম চলতি মাসে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নেওয়ার বিনিময়ে তিনি মিয়ানমারের সেনা প্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংকে সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানাবেন।
আনোয়ার গত জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে, যা মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
তবে মঙ্গলবার যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিলেন কি না তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের 'চিন' সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী জেমস বাউই থাং বিক কমিউনিটি নেতাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানান, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন—যার মধ্যে একজন ইউএনএইচসিআর কার্ডধারীও অন্তর্ভুক্ত।
