মাছ ধরার নামে মিয়ানমারে ‘পণ্য পাচার’: ৯ মাস ধরে নিখোঁজ ১১ জেলে; আরাকান আর্মির হাতে বন্দির শঙ্কা
পাঁচ মেয়ের বাবা আলমগীর মাঝি (৫৪)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দীর্ঘ নয় মাস ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। বাবা ফিরে আসবেন—এই আশায় প্রতিদিন পথ চেয়ে বসে থাকে তার কন্যারা। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনাপাড়ের সুজন গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের প্রতিটি দিন কাটছে নিদারুণ উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায়।
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে 'এফবি শরিফা-২' নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে চড়ে সাগরে যান আলমগীর মাঝিসহ চার জেলার ১১ জন জেলে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনার পর নয় মাস পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ জেলেরা জীবিত না মৃত, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তাদের পরিবার।
পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, নিখোঁজ জেলেরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকতে পারেন। এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলেও নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।
নিখোঁজ ১১ জনের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের তিনজন, নোয়াখালীর চারজন, চট্টগ্রামের দুজন এবং কুমিল্লার দুজন বাসিন্দা রয়েছেন। তাদের সন্ধান ও উদ্ধারের দাবিতে পরিবারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে।
নিখোঁজ জেলেরা হলেন—লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার সুজন গ্রামের আলমগীর মাঝি (৫৪), চর গজারিয়া গ্রামের মামুন মিস্ত্রি (৩৪) ও সবুজ গ্রামের তছির আহমেদ (৪৩); নোয়াখালীর চর জব্বরের চর লক্ষ্মী গ্রামের আজাদ (৩০), চর নাঙ্গালিয়া গ্রামের আজাদ (২৭), পূর্ব চর মজিদ গ্রামের ইমাম উদ্দিন হোসেন (২৮) ও সুবর্ণচরের চর কাজি মোখলেছ গ্রামের সালাউদ্দিন; চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পূর্ব খইয়াছড়া গ্রামের রুবেল ও পাহাড়তলী এলাকার মিলন মিয়া; এবং কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের ফজলে এলাহী ও নাঙ্গলকোটের নিশ্চিতপুর গ্রামের ইসমাইল।
আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন বেগম জানান, তার বাবাসহ অন্য জেলেরা ঘটনার দিন বিকেলে চট্টগ্রামের পুরাতন ফিশারিঘাটের চান্দগাঁও ঘাট থেকে সাগরে রওনা হন। এরপর থেকেই সবার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং ট্রলারটিরও আর কোনো হদিস মেলেনি।
জেসমিনের অভিযোগ, ট্রলারের মালিকপক্ষের সঙ্গে তার বাবার আগে থেকেই বিরোধ ছিল এবং নিখোঁজ হওয়ার দিন ফোনে হুমকি দিয়ে তাকে ট্রলারে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ট্রলারের সন্ধানে যোগাযোগ করা হলে মালিকপক্ষ উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই ট্রলার চুরির মামলা দেওয়ার ভয় দেখায়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল জেসমিন বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন—ট্রলার মালিক মাইন উদ্দিন নাহিদ কোম্পানি, নুরুল ইসলাম রাসেল, মোহাম্মদ বেলাল ও কামাল মেম্বারসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন। আসামিদের আদি বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামেই বসবাস করছেন।
মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমাম হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, অপহরণ মামলার পর ডিবির অভিযানে ট্রলার মালিকসহ তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ট্রলার মালিকরা চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন বাজারের একজন ব্যবসায়ীর ২৫০ বস্তা সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে ওই জেলেদের মাধ্যমে মিয়ানমারের উদ্দেশে পাঠায়। কিন্ত এরপর ওই ট্রলারের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আর জানতে পারেনি কেউ।
ওই ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে থানায় আরও ৪-৫টি মামলা রয়েছে। তবে মূল সন্দেহভাজন ২ নম্বর আসামি মো. রাসেল এখনো পলাতক রয়েছে।
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিএমপি ডিবির এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজারের 'হানিফ এন্টারপ্রাইজ' নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে ট্রলারটি মিয়ানমারে গিয়েছিল। মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা অপর এক জেলের জবানবন্দিতে জানা গেছে, ট্রলারের মাঝি-মাল্লাদের মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেছিল। ওই জেলের জবানবন্দি আদালতে ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং রাসেল নামের আসামি পলাতক রয়েছে।
নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'স্বপ্ন নিয়ে'র সভাপতি আশরাফুল আলম হান্নান জানান, তালিকা দিয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ এবং ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হলেও তাদের সঠিক অবস্থান এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন বলেন, 'আমরা শুধু জানতে চাই, আমার বাবা ও অন্য জেলেরা কোথায় আছেন। তারা বেঁচে আছেন কি না, সেটাও আমরা জানি না। নয় মাস ধরে আমরা প্রতিদিন অপেক্ষা করছি।'
দীর্ঘ নয় মাসেও ১১ জেলের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের পরিবারগুলোতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্বজনদের দাবি, নিখোঁজ জেলেদের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা, তারা জীবিত না মৃত তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
