প্রিজন ভ্যানের তালা খুলে ‘পিচ্চি রাজা’কে বোনের প্রাইভেটকারে তুলে দেন এসআই প্রবীর: জিএমপি
ঢাকার আদালত থেকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরত আনার পথে রাজধানীর শীর্ষ মাদক কারবারি রাজা ওরফে 'পিচ্চি রাজা'র পলায়ন ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজনভ্যানের তালা খুলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস নিজেই পিচ্চি রাজাকে একটি অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারে তুলে দেন।
ঐ প্রাইভেটকারে 'পিচ্চি রাজা'র বোন তাসলিমাসহ অন্য সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন। পরে সেই প্রাইভেটকারে চড়ে নিরাপদে পালিয়ে যান ৩০ মামলার আসামী পিচ্চি রাজা।
এর আগে, গাজীপুরের নাওজোড় বা বাইমাইল এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার ছলে পালিয়ে যাওয়ার দাবি করেছিল পুলিশ, যা মিথ্যা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার। এ ঘটনায় আসামি পলায়নে সরাসরি সহায়তার অভিযোগে প্রিজনভ্যানের এসকোর্ট ইনচার্জ সশস্ত্র উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাস, গাড়িচালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'অপরাধী যেই হোক, সে পুলিশ সদস্য হলেও কাউকে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সঠিক তদন্ত হবে এবং দায়ী সকলের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের বরাতে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২৯ জন আসামিকে প্রিজনভ্যানে করে ঢাকার আদালতে হাজিরার জন্য নেওয়া হয়। আদালতের বিচারিক কার্যক্রম শেষে আসামিদের কাশিমপুরে ফিরিয়ে আনার পথে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজনভ্যানটি থামানো হয়।
ভ্যানে থাকা এসকোর্ট ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে চাবি নিয়ে ভ্যানের তালা খোলেন এবং পিচ্চি রাজা ও খাইরুল বাশার নামের দুই হাজতিকে বাইরে বের করেন। এরপর খাইরুল বাশারকে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের কথা বলে ভ্যানের সামনের অংশে চালকের পাশে বসানো হয়। এরপর পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর আর ভ্যানে ওঠেননি।
তিনি আরো জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষমাণ ছিল। সেখানে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা সহ কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। এসময় সাদা পোশাকে থাকা এসআই প্রবীর নিজে পিচ্চি রাজাকে ওই প্রাইভেটকারে তুলে দিয়ে পলায়নে সহায়তা করেন। এরপর বাকি ২৮ জন আসামিকে নিয়ে প্রিজনভ্যানটি কাশিমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
কমিশনার জানান, আসামিকে প্রাইভেটকারে তুলে দেওয়ার পর এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস কৌশল বদলে পরবর্তীতে গাজীপুর মহানগরীর বাইমাইল এলাকায় নাওজোড় হাইওয়ে থানার সামনে এসে আবার প্রিজনভ্যানে যুক্ত হন। এরপর কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা মূল ঘটনা গোপন করে দাবি করেন, বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকায় পৌঁছালে আসামি পিচ্চি রাজা প্রস্রাব করার কথা বলে গাড়ি থেকে নামেন এবং সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান।
মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও নাটক সাজানোর বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর কোনাবাড়ী থানায় দণ্ডবিধির ২২২৪ ধারায় মামলা করা হয়, যার তদন্তভার পরবর্তীতে জিএমপি ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে প্রিজনভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, নায়েক কামাল হোসেন, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, কনস্টেবল মো. সাকিব এবং কনস্টেবল শাকিল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ২ পুলিশ সদস্য ছাড়া বাকি ৩ কনস্টেবলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে, ঘটনার আট দিন পার হয়ে গেলেও পলাতক শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাকে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে ডিবি পুলিশের একাধিক টিম অভিযান পরিচালনা করছে।
পলাতক রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা ওরফে বাদশা (৩৪) ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের (ব্লক-এ, বাসা-১১৭) এলাকার মোতালেবের ছেলে। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত ৩০টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাকে, তার স্ত্রী ও শ্যালককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) তাহেরুল হক চৌহান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মো: বেলায়েত হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
