রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর: স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতৃত্বেই করা হয় হামলা-লুটপাট
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাসহ আরও অনেকের নাম। এ পর্যন্ত ১২জন ধরা পরলেও হামলার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া অনেকেই এখনও আইনের আওতায় আসেনি।
সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলার আগে শাহ আলী থানার পাশে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অফিসের সামনে লোকজন জড়ো হয়। পরে তাদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যায়।
হামলার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস এবং কয়েকটি মোটরসাইকেলের গতিবিধিও ওই এলাকার বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার জন্য ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরটি ভাড়া করা হয়েছিল আগেই।
ভেকুর (খননযন্ত্র) চালক ও মালিক জানিয়েছেন, 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি'র ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন এটির জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন সেই শাহাদাত।
মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের টিবিএসকে বলেন, 'তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সমীচিন হবে না। ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা কোনো চাপে নেই। এ ঘটনায় যারাই জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
হামলার আগে থানার সামনে জড়ো হয়েছিল লোকজন
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৪ মিনিটের দিকে শাহ আলী থানার কাছাকাছি থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের কার্যালয়ের সামনে একদল মানুষ জড়ো হয়।
প্রায় ৪৬ মিনিট পর, রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে ফুটেজে থাকা কয়েকজনের পরিচয়ও নিশ্চিত হয়েছে টিবিএস। ফুটেজে হলুদ টিশার্ট পরা যুবকের নাম আরিফ। তিনি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। লাল টিশার্ট পরা শামীম এবং টুপি পরা হাসানও স্থানীয় সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার ছোট ভাই শামীমকেও ঘটনাস্থলে দেখা গেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
হামলাকারীদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে লাঠি, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে। এরপর কেউ কেউ মাথায় কাপড় ও মুখোশ বেঁধে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে।
ভাঙচুরের নেতৃত্বে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াসের নাম এসেছে। এছাড়া আরাফাত নামের একজনের নাম আসলেও তার পরিচয় জানা যায়নি।
ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় বাইরের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বুলু ও কবির ওরফে টাক্কু কবিরকে মোটরসাইকেলে টহল দিতে দেখা যায়।
সাদা মাইক্রোবাসে কারা ছিলেন?
ঘটনার সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস ঘুরতে দেখা যায়।
টিবিএসের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই মাইক্রোবাসে ছিলেন হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরও কয়েকজন।
হামলা ও ভাঙচুরের সময় মাইক্রোবাসটি থেকে ঘটনাস্থলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাদের মধ্যে লেলিন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যানার ও পোস্টার লাগিয়েছেন।
একই ওয়ার্ডে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আত্মীয় হানিফও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে স্থানীয়রা জানান।
পুলিশি তদন্ত দলের ধারণা ওই গাড়িতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও অবস্থান করছিলেন। তবে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে দেখা যায়নি।
তবে মিষ্টি টিবিএসের কাছে হামলায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কীভাবে এ ঘটনায় তার নাম আসলো, তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
তার বক্তব্য, ২০০৬ সালে ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে সমিতির নামে জায়গা বরাদ্দের আবেদনপত্রে তার স্বাক্ষর ছিল; এরপর সমিতির সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই।
লেলিন ও পাপেলের বক্তব্য জানতে তাদের ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের পরদিন সমমনা সমিতির পক্ষে হওয়া মানববন্ধনেও হানিফ অংশ নেন।
হানিফ মিয়া টিবিএসকে বলেন, 'আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। মামলায় আমার নাম কেন দেওয়া হলো জানি না।'
যদিও মিরপুরের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার আবু হানিফকে পলাতক উল্লেখ করে টিবিএসকে বলেন, 'তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি মামলায় যাদের নাম নেই কিন্তু বিভিন্ন ফুটেজে ও অনুসন্ধানে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, সবাইকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।'
ভেকু এল কোথা থেকে?
রাড্ডা ভাঙচুরের সময় সিসি ক্যামেরায় দেখা যাওয়া ভেকুটি মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে ভাড়া করা হয়েছিল।
ভেকুর চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে একটি ফোনে তাকে বলা হয়, একটি জায়গা থেকে মালামাল সরাতে হবে।
পরে জানানো হয়, সেখানে ভবন ভেঙে জায়গা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে এবং সেখানে শপিংমল করা হবে। কিন্তু চালক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে সন্দেহ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই চালক বলেন, সেখানে লোকজন জড়ো হতে দেখে তিনি ভেকুটি আর সামনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখান থেকে চলে যান।
তিনি জানান, ভেকুটি ভাড়া করার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন।
প্রথম ভেকুটি ফিরে যাওয়ার পর শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মারুফ অন্য একটি ভেকু নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এ সময় তাকে সোলেমান নামে আরেকজন সহায়তা করেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখোশধারী লোকজন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর হ্যামার ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে প্রধান ফটক ভাঙা হয়। একপর্যায়ে পরে আনা ভেকুটি দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন ভাঙা শুরু হয়।
একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, আসবাব ও অফিসের মালামালও লুট করা হয়।
ভবন ভাঙার পর সেখানে 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড'-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
হামলার পর লুট করা মালামাল বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে কয়েকটি বাড়ির ঠিকানা শনাক্ত করে সেখানে খোঁজ নেওয়া হয়।
পুলিশ পরে দারুস সালাম থানার বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের লুট হওয়া আসবাব, টিকা, রেজিস্টার, ফ্রিজ, অফিসের কাগজপত্র, প্রিন্টার, জেনারেটরসহ ৪৬ ধরনের মালামাল উদ্ধার করেছে। মালামাল বহনে ব্যবহৃত দুটি কাভার্ডভ্যানও আটক করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ১২ জন হলেন- মো. সোহেল, (২২), মো. জুয়েল, (২৩), জিহাদ হাসান (২১), মো. রাব্বি, (২০), শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), শাহ আলম (৫৩), আতিকুর রহমান (৩৩), কামরুল ইসলাম (৫২), শাকিল (২০), মো. মিন্টু (৩৫) ও মো. মিলন (৪৫)।
ধ্বংসস্তূপে এখনও দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা
একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের সামনে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা ও টিকাদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মানুষ, মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা ও অন্যান্য সেবা দিয়ে আসছিল। ভবন ধ্বংসের ফলে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব সাইনবোর্ড আবার টাঙানো হয়েছে এবং সংস্কারের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার টিবিএসকে বলেন, 'এখনও আমাদের শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভবিষ্যতে আমরা এখানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারব। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির মতো অন্য কোন দুষ্কৃতিকারী যেন এই ধরনের হামলা ভবিষ্যতে আর কখনো না করতে পারে সে বিষয়ে আমরা স্থায়ী সমাধান কামনা করছি সরকারের কাছে।'
