মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা-ভাঙচুর: লুটপাটে হারিয়েছে টিকা পাওয়া শিশুদের তালিকা
দুর্বৃত্তদের হামলা ও ভাঙচুরের পর চতুর্থ দিনের মতো আজ মঙ্গলবারও (২৯ সেপ্টেম্বর) টিকাদান কার্যক্রম চালু রেখেছে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। তবে লুটপাটে নষ্ট হয়ে গেছে শিশুদের টিকাদানের রেকর্ড রাখা খাতা। ফলে কোন শিশুকে আগে কোন টিকা দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না স্বাস্থ্যকর্মীরা।
নতুন ডোজ দিতে আসা মায়েদের কাছ থেকেই এখন আগের টিকার তথ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।
এ বিষয়ে কেন্দ্রটির নার্স বিউটি আক্তার বলেন, 'আমাদের তালিকা রাখার খাতা নষ্ট হয়ে গেছে। সেগুলো ফিরে পাওয়ার কোনো আশা নেই। নতুন ডোজ দিতে যেসব মা আসছেন, তাদের কাছ থেকেই তথ্য নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।'
এতে টিকাদানের তথ্য ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এই মুহুর্তে এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। চেষ্টা করা হচ্ছে সবার তথ্য নতুন করে রেকর্ড রাখার।'
এতে শিশুদের টিকাদানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব মা তাদের সন্তানের আগের টিকার তারিখ বা ডোজের তথ্য মনে করতে পারেননি,, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি।
তবে ভাঙচুরের পরও কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তাদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে কম খরচে চিকিৎসা ও টিকা নেওয়ার জন্য এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।
১৪ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছিলেন নুরুন্নাহার নামের এক নারী। তিনি জানান, অন্য জায়গায় চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি হওয়ায় তারা এই কেন্দ্রে আসতেন।
নুরুন্নাহার বলেন, 'অন্য জায়গায় চিকিৎসার অনেক খরচ, তাই আমরা এখানেই আসি। এই জায়গাটা ভাঙলে আমাদের মতো গরিবরা বিপদে পড়ব। সরকার দ্রুত এই কেন্দ্র ঠিক করে দিক, এটাই চাই।'
ভাঙচুরের পর কেন্দ্রটিতে স্বাস্থ্যসেবা চালু হলেও স্বাভাবিক পরিবেশ এখনও ফেরেনি। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলার পর শনিবার ও রোববার কেন্দ্রের বাইরে সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়। সোমবার একটি ভাঙা কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে টিকা দেওয়া শুরু করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। আজও ওই কক্ষেই চলছে টিকাদান।
কেন্দ্রটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা কক্ষটিতে চেয়ার-টেবিল পেতে স্বাস্থ্যকর্মীরা বসেছেন। কক্ষের ভেতরে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার রাখা হয়েছে। সেখানে টিকা নিতে আসা শিশু ও মায়েদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩দিন পর আজ এসেছে বিদ্যুৎ-সংযোগ। তবে নেই পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা। ফলে গরমে শিশু ও মায়েদের কষ্ট হচ্ছে।
কেন্দ্রের আশপাশে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও সেখানে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, ধ্বংসস্তূপ থেকে ভাঙা কংক্রিট, ইটের টুকরাসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরানোর কাজ চলছে। এতে টিকাদানের কার্যক্রম চলা কক্ষটির আশপাশে ধুলাবালি উড়ছে।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, 'এখনও স্বাভাবিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কোনোমতে একটি কক্ষে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।'
কেন্দ্রটির স্বাস্থ্যকর্মী ডালিয়া বলেন, 'আমরা এখানকার বাথরুম ব্যবহার করতে পারছি না। সামনের একটি মার্কেটের তিনতলার বাথরুম ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটা অনেক কষ্টকর।'
এদিকে, নার্স বিউটি আক্তার আশেপাশের ধ্বংসস্তূপ ও ধুলাবালি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, 'এখানকার ধুলা-ময়লায় বাচ্চাদের ক্ষতি হতে পারে। এখানে এমন সব শিশু আসে, যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম। সেবা নিতে এসে যদি তারা অসুস্থ হয়ে বাড়ি যায়, তাহলে সেটা দুঃখজনক।'
তিনি আরও বলেন, 'এ ছাড়া এ সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি। আমরা শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার বিষয়ে বেশি তৎপর ছিলাম। এর মধ্যেই এই ঘটনা ঘটল।'
নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার আরও বলেন, 'সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রটির অবশিষ্ট অংশ সংস্কার করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।'
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে হামলা চালায় একদল মানুষ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভাঙচুর করে। এ সময় দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে ভেকু দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এরপর সেখানে 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড'- নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় রাড্ডা কর্তৃপক্ষ শাহ আলী থানায় মামলা করেছে। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম রাজ্জাক বলেন, 'এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো সদস্যের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যেকোনো অন্যায় দেখলে আমাদের দলে বহিষ্কারের রীতি চালু আছে। যাদের নাম এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা জাতীয়তাবাদী দলের কেউ নন। দ্রুত তাদের বিচার হোক।'
