চীনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর দেওয়া স্যাটেলাইট ছবি ও তথ্যের সহায়তার মার্কিন ঘাঁটিতে আরও নিখুঁত হচ্ছে ইরানের হামলা
চীনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর দেওয়া স্যাটেলাইট চিত্র ও গোয়েন্দা সহায়তার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোকে হুমকিতে ফেলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নির্ভুলভাবে হামলা চালানোর ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য পেয়েছে ইরান। গত কয়েক মাসে ইরানের আক্রমণের এই নিখুঁত সক্ষমতার পেছনে লক্ষণীয় উন্নয়ন ঘটেছে। সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে চারটি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, চীনের দেওয়া সেই স্যাটেলাইট ইমেজের সহায়তায় গত জুলাইয়ে জর্ডানের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান, এতে ৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের উচ্চমাত্রার নির্ভুল হামলা চালানোর ক্ষমতা এককভাবে ইরানের ছিল না।
একজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চীনা ভূ-স্থানিক ডেটা (জিওস্পেসিয়াল ডাটা) ব্যবহারের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করতে পেরেছে ইরান। এতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে আঘাত হানার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
অন্য দুই সূত্র জানায়, মধ্য আকাশে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না—এমন সাধারণ তাপ-সন্ধানী ড্রোনগুলো দিয়েও সঠিকভাবে সময় মেপে যেন জাহাজে হামলা চালানো যায়, সেই সুবিধাও এনে দিয়েছে চীনা তথ্য সহায়তা।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হামলা সত্ত্বেও ইরানের আক্রমণের নিশানায় কীভাবে ক্রমেই এই নির্ভুলতা এসেছে—চীনের এই সহায়তা তা অনুধাবন করতে সাহায্য করে। তবে সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, এটি ইরানের সামরিক কার্যকারিতা বাড়ার পেছনে থাকা একাধিক কারণের একটি।
রাশিয়াও তেহরানকে সহযোগিতা জুগিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, দীর্ঘ সংঘাতের মাঝে ইরানি বাহিনীর বেড়ে যাওয়া সরাসরি যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাও এক্ষেত্রে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চীনের দেওয়া এই সহায়তার পরিধি ঠিক কতটা, তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা কঠিন। চীনের সরকার সরাসরি এর নির্দেশ দিচ্ছে নাকি স্রেফ নীরব সম্মতি দিয়ে সুযোগ করে দিচ্ছে—তা এখনো অস্পষ্ট।
এমনকি বেইজিং ঠিক কতটা সাহায্য করছে, তা নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সম্পর্কিত আরেক সূত্র উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে—চীন আসলে হরমুজ প্রণালির এই অস্থিরতা বন্ধ হোক সেটাই চায়, কারণ এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে চীনের দেওয়া এই গোয়েন্দা তথ্য ইরানের কৌশলগত রূপ বদলে দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তা এবং স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালীকে নিজেদের কৌশলী অবস্থানের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি বলে মনে করে। সেখানে মার্কিন সামরিক পাহারাদার জাহাজ এবং বাণিজ্যিক নৌযানের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরান।
ওই পানিপথের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পয়েন্টে—যাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা "নাকল" (বাঁক) বলে অভিহিত করেছেন—জাহাজগুলো পৌঁছানো মাত্রই ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে তাপ-সন্ধানী ড্রোন ছুড়ে আক্রমণ চালাচ্ছে।
ইরানি ড্রোনগুলোর এই তাপ-সন্ধানী প্রযুক্তি খুব বেশি উন্নত কিছু নয়। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনা স্যাটেলাইট ছবির সহায়তায় মার্কিন পাহারাদার জাহাজের আনাগোনা সূক্ষ্মভাবে নজরদারি করার এবং সুযোগ বুঝে সবচেয়ে উপযুক্ত মুহূর্তে হামলা চালানোর এক কার্যকরী দক্ষতা প্রমাণ করেছে ইরানি বাহিনী।
দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এই কৌশলের মূল বিষয় হলো একসাথে প্রচুর সংখ্যায় ড্রোন ছুড়ে দেওয়া, যেন সেগুলোর কোনো না কোনোটি জাহাজের বডির উত্তাপ শনাক্ত করে সোজা আঘাত হানতে পারে।
আর এই সামরিক তৎপরতার গতি তীব্র হতে পারে। একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এমনই একটি পাহারাদার জাহাজ পার করার সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের এক ডজনেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে এবং প্রায় ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করে। একই সাথে হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে থাকা ইরানের প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়।
চীনের এই গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া উভয়ের কাছ থেকেই ইরান প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে, যা মূলত তাদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলোর নিশানায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানার প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করেছে।
তবে অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে—যেমন গত জুলাইয়ে জর্ডানের ঘাঁটিতে হওয়া হামলাটিতে—কর্মকর্তারা একমত যে চীন থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যই আসল ভূমিকা রেখেছে।
একটি সূত্রের মতে, 'তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দক্ষতা বাড়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে, এবং তা হলো এই প্রত্যক্ষ সহায়তা। যুদ্ধক্ষেত্রে বারবার চর্চা করা তো কাজে আসেই, তবে সাহায্য করার মতো হাত পাশে থাকাটাও বড় ভূমিকা রাখে।'
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ওয়াশিংটনে থাকা চীন ও ইরানের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসও কোনো জবাব দেয়নি।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম খবর প্রকাশ করে, জুলাই মাসে জর্ডানের ঘাঁটিতে চালানো হামলায় ইরান চীনা স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করেছিল।
সে সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াখুন-এর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'চীন সবসময় কঠোরভাবে তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করে। এই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে চীনের গায়ে কাদা ছেটানোর যেকোনো চেষ্টার বিরোধিতা করি আমরা।'
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নিতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন ওয়াশিংটনে রয়েছেন।
সম্ভাব্য গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তার খবর প্রকাশ্যে আসা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তার জন্য চীন সরকারের প্রকাশ্যে কোনো সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে।
তবে ট্রাম্প জিনপিংয়ের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও, একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই রাষ্ট্রীয় সফরকালে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
জর্ডান হামলার পর চীনের পক্ষ থেকে ইরানকে নিশানা নির্ধারণে সহায়তা করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে রাজি হননি।
রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, 'চীন যা করেছে তার কোনোটিই ইরানের সাথে আমাদের চলমান সংঘাতের গতিপথ কোনোভাবেই পরিবর্তন করেনি।' তিনি আরও বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে, কিছু ক্ষেত্রে তারা বেশ সহযোগিতাপূর্ণ ছিল'। এর উদাহরণ হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের শুল্ক আদায়ের প্রচেষ্টার বিষয়ে চীনের প্রকাশ্যে বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেন।
চলমান সংঘাতের সময় এই অঞ্চলের চীনা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবির ওপর কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কারণ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এসব ছবি মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। মে মাসে, প্রশাসন তিনটি চীনা স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা জানায়, এসব প্রতিষ্ঠান এমন সব ছবি সরবরাহ করেছিল যা "মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক হামলা পরিচালনায় সহায়তা করেছে।"
ইরানের সঙ্গে আমেরিকার এই যুদ্ধ সপ্তম মাসে গড়ালে কর্মকর্তারা জানান, ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখতে এবং তেহরানের দাবি মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বজায় রাখতে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগুলোতে নানা পরিবর্তন এনেছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে সম্পর্কিত একটি সূত্র জানায়, ইরান এখন অকাতরে একের পর এক 'এমকিউ-৯ রিপার' ড্রোন ভূপাতিত করছে এবং এখনও নিয়মিতই এলাকায় ড্রোনের উপস্থিতির খবরের বিষয়ে সতর্ক বার্তা জারি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মূল্যায়নের সাথে সম্পর্কিত অপর এক সূত্র জানায়, 'মূলত আমরা তাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আরও সময় বাড়িয়ে দিয়েছি বলেই তারা দিন দিন আরও দক্ষ হয়ে উঠছে। চীন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আকারেও ইরানকে সহযোগিতা পাঠিয়েছে।'
একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নিম্ন ও মাঝারি উচ্চতায় চরাচল করা ড্রোনের সামনে আমেরিকার এই স্পষ্ট ভঙ্গুরতা অনেক কর্মকর্তাকেই গভীরভাবে হতাশ করেছে—বিশেষ করে যখন মার্কিন বাহিনী তুলনামূলক বেশি উচ্চতার প্রক্ষেপক বা মিসাইল প্রতিহত করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত এক সূত্র জানান, এই পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক ঘাঁটিতে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার নির্দেশে ইরানের শীর্ষ সামরিক জেনারেল নিহত হওয়ার পর, ২০২০ সালেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছিল ইরান।
তবে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ইরানের এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা সেই সময়ের তুলনায় এখন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোতে ইরানি হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে।'
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, 'এই ইরানি হামলাগুলোর কারণে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর চিরাচরিত পরিচালন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ইরান ও তাদের মিত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলার মুখে সেন্টকম বাধ্য হয়ে তাদের কর্মী, সামরিক সম্পদ এবং গুদামজাতকরণ সুবিধাদি ভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেয়।'
সামরিক ও বেসামরিক—উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য (ডুয়েল-ইউজ) যন্ত্রাংশ ইরান যেভাবে আমদানি করে যাচ্ছে, তা মার্কিন কর্মকর্তাদের চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এসব যন্ত্রাংশ কাজে লাগিয়ে ইরান অতি দ্রুত তার সামরিক সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি পুনর্গঠন করে নিতে পারছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'বাস্তবতা অত্যন্ত সোজা—চীনা খুচরা যন্ত্রাংশ না পেলে তাদের পক্ষে এভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না।'
তবে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ইরানের এভাবে সামরিক অস্ত্রাগার পুনর্গঠন করার প্রবণতা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্ববর্তী পূর্বাভাসের সাথেই মিলে যায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্যবস্তুর তালিকা ধ্বংস সম্পন্ন করার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ অভিযান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এটি তারই ফলাফল।
