অস্ত্রের মজুত কমার তথ্য ফাঁসকারীকে বের করতে ৫০ কর্মকর্তার ‘লাই ডিটেক্টর’ পরীক্ষা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
গণমাধ্যমে অননুমোদিত তথ্য ফাঁসের জেরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যৌথ প্রধানদের কার্যালয়ের প্রায় ৫০ জন সদস্যের পলিগ্রাফ (মিথ্যা শনাক্তকরণ) পরীক্ষা করেছেন মার্কিন তদন্তকারীরা। 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর অসামরিক ও সামরিক কর্মীরা বিশেষ করে মার্কিন গোলাবারুদের মজুদ ফুরিয়ে আসার মতো স্পর্শকাতর তথ্য সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস করেছেন কি না, তা খুঁজে বের করাই ছিল এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রসহ মূল অস্ত্রগুলোর সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাসের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর, গত মাসে এই পলিগ্রাফ পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এসব প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন যে, তাদের অস্ত্রের মজুদ চাহিদার চেয়েও যথেষ্ট বেশি রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা তদন্তমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'প্রতিরক্ষা বিভাগ জাতীয় নিরাপত্তার তথ্য ফাঁসের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত পরিচালনা করে।' পার্নেল আরও বলেন, 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে মোতায়েনরত আমাদের সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গোপনীয় তথ্যের সুরক্ষা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।' যৌথ প্রধানদের এই দলে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ সামরিক ও অসামরিক কর্মী কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে কর্মরত কমব্যাট কমান্ডগুলোর সাথে সামরিক কৌশল, নীতি এবং যুদ্ধের পরিকল্পনা সমন্বয় করতে দলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তদন্তের বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-কে জানায়, এই কঠোর ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপটি গ্রহণ করা হয়েছে কেবল তথ্য ফাঁসের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন কেউ তথ্য ফাঁস করার সাহস না পায়, তাদের নিবৃত্ত করতেও। আইনি ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তদন্তের মাত্রা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। কারণ আধুনিক ইতিহাসে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন গণ-পলিগ্রাফ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আগে কখনো যেতে হয়নি।
ইরানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত সক্রিয় সামরিক অভিযানগুলো যে মার্কিন অস্ত্রের মজুদকে কতটা মারাত্মকভাবে চাপে ফেলেছে—তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরই পেন্টাগন এই পদক্ষেপ নেয়। অস্ত্রের অভাবের দরুন এই সংঘাতের সার্বিক দিকনির্দেশনা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অননুমোদিত তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছেন। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি, গোলাবারুদের ঘাটতি এবং ইরান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমালোচনামূলক সংবাদগুলোকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে "দেশদ্রোহী" বলে অভিহিত করেছেন।
ক্রমাগত তথ্য ফাঁসের এই ঘটনা পেন্টাগনের অভ্যন্তরে গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করেছে, যাকে বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মকর্তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ব্যবস্থাপনা শৈলীকে দায়ী করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একটি ছোট দলকে সাথে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি হেগসেথ তার মেয়াদে অন্তত ৮০ জন জেনারেল, অ্যাডমিরাল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন কিংবা তাদের পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন।
হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়ে গণমাধ্যমের ব্যাপক সমালোচনার জবাবে পেন্টাগন একাধিক তথ্য ফাঁসের তদন্ত শুরু করেছে—এমনকি তিনি নিজেও যখন একটি এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল গ্রুপ চ্যাটে স্পর্শকাতর সামরিক কৌশলগত তথ্য শেয়ার করার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েন।
গত মাসে অভ্যন্তরীণ এই উত্তেজনা আরও চরম রূপ নেয়, যখন প্রতিরক্ষা বিভাগ সরকার-অর্থায়নে পরিচালিত স্বাধীন সামরিক সাময়িকী 'স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস'-এর শীর্ষ সম্পাদক ও প্রকাশককে বরখাস্ত করে। পত্রিকাটির কর্মীরা জানান, বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন'-এর ভেতরে সৈন্যদের পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে খবর প্রকাশ করায় তাদের ওপর এই সরাসরি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হেগসেথের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছেন এবং প্রকাশ্যে তার কাজের প্রশংসায় বলেছেন, 'তিনি চমৎকার পারফর্ম করছেন।'
