ইনসুলিন বন্ধ ও কিটো ডায়েটের পরামর্শে রোগীর মৃত্যু, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি
ডায়াবেটিস রোগীকে ইনসুলিন বন্ধ করে কিটোজেনিক (কিটো) ডায়েট অনুসরণের পরামর্শ দেওয়ার পর তার মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৩ সেপ্টেম্বর জারি করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক আদেশে কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত ও সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ তদন্ত শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়, গত ৫ মে ঢামেকের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ অপচিকিৎসা এবং অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করে অভিযোগ দাখিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঢামেকের এন্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৬ বছর বয়সী সুমি বেগম দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহার করতেন।
অভিযোগে বলা হয়, অনলাইনে হেলথ রেভোল্যুশন লিমিটেড সম্পর্কে জেনে তিনি প্রতিষ্ঠানটির শরণাপন্ন হন। সেখানে তাকে ইনসুলিনসহ সব ধরনের ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করতে, কিটো ডায়েট অনুসরণ করতে এবং কয়েকটি উচ্চমূল্যের সাপ্লিমেন্ট কিনতে পরামর্শ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সাপ্লিমেন্ট ছিল অপ্রয়োজনীয় ও অননুমোদিত।
ওই পরামর্শ অনুসরণের পর সুমির ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গত ২ ফেব্রুয়ারি গুরুতর ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (ডিকেএ) নিয়ে তিনি ঢামেকের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
ঢামেকের চিকিৎসকদের অভিযোগ, এ অপচিকিৎসার কারণে রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণঘাতী স্বাস্থ্য জটিলতার শিকার হয়েছেন।
উল্লেখ্য, হেলথ রেভোল্যুশন লিমিডেট ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠান। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশে হেলথ রেভোল্যুশন লিমিটেডের নাম সরাসরি উল্লেখ নেই। এমনকি ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তবে ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমঅ্যান্ডডিসি) পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ার হোসেন ঢামেকের অভিযোগের উল্লেখ করে বলেন, 'হেলথ রেভোল্যুশন লিমিটেডের চিকিৎসক ডা. জাহাঙ্গীর কবির রোগীকে ইনসুলিন বন্ধ, কিটো ডায়েট অনুসরণ এবং অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।'
চিঠিতে স্বাস্থ্যবিষয়ক অপতথ্য প্রচার ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়।
তদন্ত কমিটি গঠন
ছয় সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামানকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল-১ শাখার সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহমুদুর রহমান সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এ হালিম খান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুরজাহান বানু ও বারডেম হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আজিমুন্নেছা শিউলী।
এদিকে জেকে লাইফস্টাইল লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের তদন্ত কমিটি গঠনের নোটিশে কোথাও সরাসরি ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নাম উল্লেখ নেই এবং ওই নথিতে তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।
তিনি জানান, ৭ মে ঢামেক হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ ও অন্যান্য চিকিৎসক বিএমডিসিতে যে অভিযোগ করেন, সেখানেও ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নাম ছিল না।
