পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর খ্রিষ্টানদের ওপর চলছে হামলা, বন্ধ প্রার্থনাসভা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কয়েকটি জেলায় প্রার্থনা সভায় ধারাবাহিক হামলার পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায় তাদের ঘরোয়া প্রার্থনা ও পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এর মধ্যে এক সপ্তাহ আগে হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় এমনই একটি হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে পুলিশকে গিয়ে যাজক ও উপস্থিত পুণ্যার্থীদের উদ্ধার করতে হয়।
পূর্ব বর্ধমানে একটি শেষকৃত্যে বাধা দেওয়া এবং গত ৫ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে নির্মাণাধীন একটি গির্জায় ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, ২৩ আগস্ট উলুবেড়িয়ার একটি বাড়িতে রোববারের প্রার্থনা চলাকালে একদল উত্তেজিত লোক জোর করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। 'জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ'-এর অভিযোগ তুলে তারা উপস্থিত লোকজনকে মারধর করে, বাড়িটিতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। প্যাস্টর মিঠুন হাজরা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, প্রতি রোববারের মতো সেদিনও তারা 'প্রার্থনা সভার জন্য একটি বাড়ি ভাড়া' নিয়েছিলেন। নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ৬০ জন মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। 'সকাল ১১টার দিকে প্রার্থনা শুরু হয়। বিকেল ৩টার দিকে স্লোগান দিতে দিতে একদল লোক জোর করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা আমাকে ও উপস্থিত অন্যদের ওপর হামলা চালায়…বাড়িটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এছাড়া সাউন্ড সিস্টেম, পোডিয়াম, টেবিল, চেয়ার ও ফ্যান ভেঙে ফেলে। নারী-পুরুষ সবাইকে মেরেছে তারা।'
এই যাজক জানান, পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। 'প্রাথমিক চিকিৎসার পর আমরা থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। সেদিন থেকে আমরা এই এলাকায় আর কোনো ঘরোয়া প্রার্থনার আয়োজন করিনি।'
হাওড়া রুরাল-এর পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট অমিত ভার্মা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে; ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষেবা-র প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক বলেন, উলুবেড়িয়ার ঘটনা 'কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়'। তিনি বলেন, 'সম্প্রতি ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে…আমরা আতঙ্কিত ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছি।' তিনি আরও জানান, ৩০ আগস্ট রোববার হাওড়ার জগৎবল্লভপুর ও উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জেও ঘরোয়া প্রার্থনায় একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
১৪ আগস্ট পূর্ব বর্ধমান জেলার সাহানগরের সেন্ট ক্ল্যারেট গির্জায় একটি জমায়েতের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেওয়া এবং শোকাহতদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
প্যারিশ প্রিস্ট-ইন-চার্জ ফাদার স্যামুয়েল হেমব্রম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, উত্তেজিত 'দঙ্গল' সে সময় 'সমাধিস্থলের বৈধ কাগজপত্র দেখতে' চায়। তিনি বলেন, 'আমরা তাদের কাছে গির্জা থেকে কাগজপত্র নিয়ে আসার জন্য কিছুটা সময় চেয়েছিলাম…আমরা এর প্রতিবাদও করি। কিন্তু তারা শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে দেয়নি। মৃতদেহটি আগেই কবরে নামানো হয়েছিল, কিন্তু উত্তেজিত জনতা জোর করে তা তুলে ফেলে।'
হেমব্রম বলেন, 'মরদেহটি বর্ধমান শহরের অন্য একটি গোরস্তানে নিয়ে যেতে হয়েছিল।'
এই যাজক জানান, তিনি পুলিশ সুপার ও ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারের কাছে ইমেইলে অভিযোগ পাঠিয়েছিলেন। 'কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।'
পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার পুষ্পা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'যিনি মারা গেছেন, তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তাই স্থানীয় লোকেরা আপত্তি জানিয়ে শেষকৃত্যে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। স্থানীয়দের আরও দাবি, যেখানে শেষকৃত্য হচ্ছিল সেটি কোনো গোরস্তান নয়, বরং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। আমরা জমির নথিপত্র খতিয়ে দেখছি।'
শোকাহতদের মারধরের বিষয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'আমার মনে হয় না হামলার ঘটনা ঘটেছে। তারপরও স্থানীয় থানায় খোঁজ নিয়ে দেখব।'
২৫ আগস্ট হাওড়ার ঘুসুড়িতে একটি বাড়িতে প্রার্থনা সভায় হামলার খবর পাওয়া যায়। চার্চ অভ দ্য গ্রেস-এর ফাদার সুরজ সরোজ বলেন, 'কমিউনিটির সদস্যদের মারধর করা হয়েছে, কয়েকজন আহতও হয়েছেন। আমি উত্তেজিত জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তারা কিছুই বুঝতে রাজি হয়নি।'
সরোজের অভিযোগ, পুলিশ থানায় তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখে, এরপর 'গির্জা, গির্জার তহবিল ও পরিচয়পত্রের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে'। তিনি বলেন, 'আমরা কোনো অভিযোগ দায়ের করিনি। তবে আমরা সব ধরনের ঘরোয়া প্রার্থনা ও পরিদর্শন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
পুলিশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
২৬ আগস্ট পূর্ব মেদিনীপুরের চেক মাইলপোস্ট গ্রামে একটি বাড়িতে প্রার্থনা সভার জন্য জড়ো হওয়া একদল মানুষও একই ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় যাজক ও তার স্ত্রীকে মারধর করে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
প্যাস্টর জয় সূত্রধর টেলিফোনে বলেন, 'তারা স্লোগান দিতে দিতে বলছিল, আমরা জোরপূর্বক ধর্মান্তর করছি…আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন আইনজীবীদের খবর দেয়। তারা থানায় এসে আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান। আতঙ্কে আমরা থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করিনি।' পরে হেরোদ মল্লিক জানান, তারা ইমেইলে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহাকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এসব হামলার জন্য দায়ী করা দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হিন্দু ডানপন্থি সংগঠন সিংহ বাহিনী। এ সংগঠনের সভাপতি দেবদত্ত মাঝি বলেন, 'উলুবেড়িয়া ও অন্যান্য স্থানে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যাপকভাবে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ চলছে। আমরা এর প্রতিবাদ করছি। এটি কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না।'
পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী উন্নয়ন ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'প্রার্থনা করা ধর্মীয় পছন্দের বিষয়। আমাদের সরকার কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাসে বিঘ্ন ঘটানোয় বিশ্বাসী নয়। তবে স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার মতো ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তাহলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এ বিষয়ে যে কারও অভিযোগ দায়ের করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।'
সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মো. সেলিম বলেন, 'বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যেও এমন ঘটনা ঘটেছে। নিজ ধর্ম পালন করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, আর বাংলায় এই অধিকার সুরক্ষিত রাখতে আমরা লড়াই করব।'
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে 'ভয়ের রাজনীতি'র অভিযোগ এনে বলেন, 'মুসলিমদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা আর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে হামলা চালানো এখন ওদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।'
বিজেপির রাজ্যসভার এওপি রাহুল সিনহা বলেন, 'আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না…এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।'
