চীন কি তাহলে লক্ষ লক্ষ উন্নত চিপ তৈরির উপায় পেয়ে গেছে?
বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের ডাচ প্রযুক্তির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৭ শতকে ডাচ অর্থায়ন ও কৃষি উদ্ভাবনব্রিটেনকে শিল্প বিপ্লবের পথে এগিয়ে দিয়েছিল, রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট ডাচদের জাহাজ নির্মাণ কৌশল শিখে রুশ নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি ৭০-এর দশকে পাকিস্তানি বিজ্ঞানী এ. কিউ. খান একটি ডাচ ল্যাব থেকে ব্লু-প্রিন্ট চুরি করে নিজ দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যা পরে উত্তর কোরিয়া, ইরান ও লিবিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতায় ডাচদের কোনো প্রযুক্তি কি আবারও বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে? সম্প্রতি ডাচ চিপ-প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএসএমএল-এর বিরুদ্ধে এমনই এক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এক্সট্রিম-আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন তৈরির একমাত্র প্রতিষ্ঠান ডাচ জায়ান্ট এএসএমএল।
উচ্চ ক্ষমতার এআই মডেল পরিচালনার জন্য এই চিপ তৈরির যন্ত্রের ওপর ২০১৯ সাল থেকেই চীনে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক দাবি করেছেন, এই ধরনের অতি সংবেদনশীল একটি মেশিন হয়তো গোপন পথে চীনে পৌঁছে গেছে।
তবে মার্কিন সচিবের এমন বিস্ফোরক দাবিকে সরাসরি 'অসম্ভব' বলে উড়িয়ে দিয়েছে এএসএমএল। ইউরোপের এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত উৎপাদিত তাদের সবকটি (৩৪০টি) ইইউভি মেশিনের নিখুঁত অবস্থান তাদের জানা রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি অকার্যকর মেশিনও রয়েছে। তাদের দাবি, এর কোনোটিই চীনে নেই।
ডাচ কোম্পানিটির দাবি, অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মেশিনগুলো পরিবহন কেবল এএসএমএল নিজেই করে থাকে এবং সার্বক্ষণিক অনলাইনে মনিটর করে। এছাড়া কারখানায় যন্ত্রাংশ বসানোর কাজ করেন কেবল তাদের নিজস্ব প্রকৌশলীরাই।
তারা দাবি করেছে, 'এএসএমএল চীনে কখনও কোনো ইইউভি মেশিনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কোনো যন্ত্রাংশ পাঠায়নি।' এদিকে, উপযুক্ত প্রমাণ চাওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন এখনও কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি বলে জানিয়েছে এএসএমএল।
ডাচ সরকার মার্কিন দাবিকে গুরুত্ব সহকারে নিলেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। জুনের শেষের দিকে ওয়াশিংটন সফরে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী সোয়ার্ড সোয়ার্ডসমা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং কংগ্রেস সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ডাচ সরকার ইইউভি প্রযুক্তিসহ তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে প্রয়োগ করে।
লাটনিকের দাবির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকার করেন সোয়ার্ডসমা। তবে তিনি বলেন, 'ডাচ সরকার এই মুহূর্তে আমেরিকার অভিযোগের কোনো তদন্ত করছে না। যদি তদন্ত করার বা এমনকি বিচার করার মতো কিছু থাকত, তবে আমরা তা করতাম।'
এই বিতর্ক নির্ভর করছে লাটনিকের দাবির কোনো ভিত্তি আছে কি না তার ওপর। এমনকি এ দাবি সমর্থনের মতো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কিছু ব্যক্তি লাটনিকের দাবিকে 'অযাচাইকৃত' তবে 'একদম ভিত্তিহীন নয়' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অনেক শিল্প বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এএসএমএল-এর তৈরি আস্ত একটি ইইউভি মেশিন গোপনে চীনে চলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে অনেকে মনে করছেন, এ সম্পর্কিত কিছু যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়ে থাকতে পারে, হয়তো এএসএমএল-এর নিজস্ব সরবরাহকারী বা তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে।
অনেকের মতে, মার্কিন ক্ষোভের আসল কারণ হয়তো এএসএমএল-এর তৈরি পুরোনো প্রযুক্তির ডিইউভি মেশিন, যা নিষিদ্ধের আওতায় নেই। ২০২৫ সালে এএসএমএল-এর মোট আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এসেছে চীনে ডিইউভি মেশিন ও সেবা রপ্তানি থেকে।
স্বপ্নের নির্মাণ
মার্কিন অভিযোগের আড়ালে মূলত চীনের অভাবনীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থামানো এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ওয়াশিংটনের আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতাই ফুটে উঠছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, চীনকে আটকানোর ক্ষেত্রে ইউরোপ যথেষ্ট কঠোর নয়।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভয়, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি করে চীনের সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। এমনকি মার্কিন চিপ-শিল্পকে জোরদার করতে চাপ দিয়ে এএসএমএল-এর ব্যবসা যুক্তরাষ্ট্রে সরাতে চাইছে ওয়াশিংটন।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, চীন নিজস্ব ইইউভি মেশিন তৈরিতে কতটা এগিয়েছে? বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক এএসএমএল প্রকৌশলীদের একটি দল ২০২৫ সালে চীনে নিজস্ব ইইউভি মেশিনের প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে এবং শেনঝেনের একটি হাই-সিকিউরিটি ল্যাবে তা পরীক্ষা করছে।
তবে এএসএমএল বলেছে, সাবেক কর্মচারীরা কোথায় কাজ করেন তা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ এবং কিছু ক্ষেত্রে 'ব্যবসায়িক গোপনীয়তা চুরির' বিরুদ্ধে কোম্পানিটি সফলভাবে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রোটোটাইপটি এখনও কোনো কার্যকরী চিপ তৈরি করেনি তবে চীন সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে কার্যকর চিপ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ এটিকে অবাস্তব মনে করেন এবং বলেন, 'চীনের একটি কার্যকরী ইইউভি মেশিন তৈরি করতে এক দশক সময় লাগতে পারে।' তবুও, তারা স্বীকার করেছেন যে, চীন ইইউভি এবং কিছু বিকল্প প্রযুক্তিতে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অগ্রগতি করছে। চীনের এই অগ্রগতিই মূলত পশ্চিমাদের প্রধান উদ্বেগের কারণ।
আমেরিকার আরেক বড় মাথাব্যথার কারণ চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে এবং এসএমআইসির প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। তারা পুরোনো ডিইউভি মেশিন ব্যবহার করেই 'মাল্টি-প্যাটার্নিং' কৌশলে ৭ ন্যানোমিটারের চেয়েও ক্ষুদ্র চিপ তৈরি করেছে, যা আগে কেবল ইইউভি মেশিন দিয়েই সম্ভব ছিল। এতে খরচ ও ত্রুটি বেশি হলেও এর মাধ্যমেই এআই দৌড়ে আমেরিকার সমান হতে কোটি কোটি উন্নত চিপ তৈরি করে ফেলতে পারে চীন।
চীনা চিপ প্রযুক্তি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি 'প্যাক্স সিলিকা' নামের একটি নতুন জোট গড়ে তুলেছে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেদারল্যান্ডসসহ ২৪টি পক্ষ সই করেছে। এর মাধ্যমে সমমনা দেশগুলোর মধ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং ইইউভি সিস্টেম সম্পর্কিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে একত্রিত করা সহজ করতে পারে।
তবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে গত এপ্রিলে দ্বিপক্ষীয় সমর্থনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে আনা 'ম্যাচ অ্যাক্ট' বিল। এটি পাস হলে চীনকে কেবল নতুন ডিইউভি মেশিন বিক্রিই বন্ধ হবে না, বরং চীনে থাকা পুরোনো শত শত ডিইউভি মেশিনের সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশ পাঠানোও বেআইনি হয়ে যাবে। ১৫০ দিনের মধ্যে ডাচরা এই কঠোর আইন না মানলে 'ফরেন ডিরেক্ট প্রোডাক্ট রুল'-এর অধীনে এএসএমএল-এর ওপর চড়া জরিমানা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
এ পদক্ষেপ মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে বিদেশি পণ্যের ওপর প্রয়োগ করে, যা তৈরিতে আমেরিকা থেকে উদ্ভূত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে; আর এএসএমএল-এর ক্ষেত্রেও তাদের এ আইন মেনে চলতে বাধ্য করবে। অন্যথায় ভারী জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
বিলটির সমর্থকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে এই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পেন্টাগনের জয়েন্ট এআই সেন্টারের প্রাক্তন কৌশল পরিচালক গ্রেগরি অ্যালেন বলেন, 'কোম্পানিগুলোকে এটি না করার জন্য বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করাকে আমি সমর্থন করি না। বরং অবৈধ করাকে সমর্থন করি।'
আমেরিকার এই একপেশে নীতিতে চরম ক্ষুব্ধ নেদারল্যান্ডস। ডাচ বাণিজ্যমন্ত্রী সজোয়ার্ডসমা জানান, ডাচ কোম্পানিগুলোর ওপর মার্কিন আইন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। তাছাড়া একদিকে আমেরিকা ডাচদের পুরোনো প্রযুক্তি চীনে বিক্রি করতে মানা করছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেরাই এনভিডিয়ার তৈরি 'এইচ২০০' এআই চিপ চীনে রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছে—যা তৈরিতে ইইউভি প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিচারিতা ডাচদের আরও সন্দিহান করে তুলেছে।
সোয়ার্ডসমা এই সপ্তাহে চীন সফরের সময় একই ধরণের আলোচনার সম্মুখীন হন। চীন 'ম্যাচ অ্যাক্ট'-এর নিন্দা জানিয়েছে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মেনে চলা বিদেশি কোম্পানিকে জরিমানা করার জন্য প্রবিধান জারি করেছে।
ইতোমধ্যে চীনে কার্যক্রম স্থানান্তর বন্ধ করতে চীনা মালিকানাধীন ডাচ চিপমেকার 'নেক্সপেরিয়া'র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর চীনের প্রতিক্রিয়ায় ধাক্কা খেয়েছে নেদারল্যান্ডস। চীন সরকার তাদের নেক্সপেরিয়ার রপ্তানি বন্ধ করে প্রতিক্রিয়া জানায়। এর ফলে ইউরোপীয় এবং জাপানি গাড়ি নির্মাতারা ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হন।
