ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প অন্যায্যভাবে মুনাফা করছেন বলে বিশ্বাস অধিকাংশ মার্কিনীর: জরিপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই—তিনি ও তাঁর পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সি খাত থেকে অন্যায্যভাবে মুনাফা করছেন, একইসঙ্গে ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে বলে মনে করেন দেশটির অধিকাংশ নাগরিক। বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও জরিপ সংস্থা ইপসোসের যৌথভাবে পরিচালিত একটি নতুন জনমত সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত সোমবার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির অর্ধেক সমর্থকও মনে করেন, প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রভাব বিস্তার করতে দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনে দুর্নীতি দূর করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন ট্রাম্প। সেই প্রেক্ষাপটে, তাঁর নিজের দলের সমর্থকদের এমন মনোভাব ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের এক ধনী আবাসন ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা ট্রাম্প রাজনীতিতে আসার আগেই নিজের নামকে বিশ্বজুড়ে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেন। তবে গত বছর তিনি ও তাঁর পরিবার ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল এবং নিজস্ব ট্রাম্প মিম কয়েন-সহ বেশ কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগ থেকে ১৪০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চে, ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্র্যান্ডের ক্রিপ্টো কয়েন নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে সেটিকে 'সবার চেয়ে সেরা' বলে অভিহিত করেছিলেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারী অন্তত ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের এভাবে ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন করা 'অন্যায্য' বা সঠিক নয়। পক্ষান্তরে ৩২ শতাংশ একে 'উপযুক্ত' বা সঠিক মনে করেন এবং বাকিরা কোনো মন্তব্য করেননি। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে প্রায় তিন জন এই লেনদেনকে অন্যায্য বললেও, বাকি ৭ জন একে সমর্থন জানিয়েছেন।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনকে (যা আগামী দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নির্ধারণ করবে) সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটরা নিয়মিতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে এই সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরছেন। অন্যদিকে, পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে দুর্নীতির তদন্ত চালানোর অঙ্গীকার করেছে।
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পারিবারিক ব্যবসায় তাঁর কোনো দৈনন্দিন ভূমিকা নেই এবং তাঁর যাবতীয় বিনিয়োগ স্বাধীন ট্রাস্টি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময় ক্রিপ্টোকারেন্সির কঠোর সমালোচনা করলেও—দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি বেশ কয়েকটি ক্রিপ্টো-বান্ধব নীতি গ্রহণ করেছেন।
এদিকে হোয়াইট হাউস যেকোনো ধরণের দুর্নীতির অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে জানান, "এখানে স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) নেই। প্রেসিডেন্ট কেবল আমেরিকান জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থেই কাজ করছেন।"
'এমনটি আগে কখনো দেখা যায়নি'
হোয়াইট হাউসের এই ব্যাখ্যার পরও প্রেসিডেন্সিয়াল এথিক্স বা রাষ্ট্রপতির নৈতিকতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মার্কিন সরকার ও ব্যবসার এই অভূতপূর্ব একত্রীকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের শীর্ষ এথিক্স আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার বলেন, "আমরা অতীতে কখনোই এমন কিছু দেখিনি। এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রশাসনেও—এত জটিল ও বিশাল ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের উপস্থিতি ছিল না, যা তাঁর এই দ্বিতীয় মেয়াদে দেখা যাচ্ছে।"
রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ আমেরিকান—যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র ভোটার এবং ১০ জনের মধ্যে ৯ জন ডেমোক্র্যাট সমর্থক—মনে করেন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের স্বার্থ তাঁর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে।
তবে অন্যান্য সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের আমলে দুর্নীতি বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে আমেরিকানরা বিভক্ত। ডেমোক্র্যাটদের বড় অংশ মনে করে বর্তমানে দুর্নীতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের ৫৬ শতাংশ মনে করেন পরিস্থিতি আগের চেয়ে অন্তত কিছুটা ভালো, আর বাকিদের মতে পরিস্থিতি একই রকম বা খারাপ হয়েছে।
উইসকনসিনের কুডাহি এলাকার বাসিন্দা এবং ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া টমাস স্মিট বলেন, "পরিস্থিতিটি সত্যিই উদ্বেগের। রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে নিজের ব্যবসাপাতি নিয়ে তাঁর এত ব্যস্ত থাকা উচিত নয়।" তবে তিনি যোগ করেন, শুধু ট্রাম্প নন, প্রায় সব প্রেসিডেন্টই রাজনীতি ও ব্যবসাকে কম-বেশি মিলিয়ে ফেলেন।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের দুর্নীতি নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তবে ব্যক্তিস্বার্থ ও পারিবারিক ব্যবসার এই বিষয়টি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চার দিনব্যাপী পরিচালনা করা এই অনলাইন জরিপটিতে আগস্ট ১৪ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১,১৬৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নেন। সমগ্র নমুনার ক্ষেত্রে জরিপটির মার্জিন অব এরর বা ভুলের মাত্রা ছিল ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
