ট্রাম্প যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ালে ইউরোপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধের তীব্রতা ও পরিসর আরও বাড়ান, তবে ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চালানোর কথা ভাবছে ইরান। ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইরান সরকারের অন্দরমহলের দুজন ব্যক্তি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে (এফটি) বলেছেন, বুলগেরিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সম্পদগুলোতে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছে ইরানি বাহিনী। গত মাসেই মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমানগুলোর জন্য বেজমের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বুলগেরিয়া।
ওই ব্যক্তিদের একজন জানান, নতুন করে মার্কিন আগ্রাসন শুরু হলে পাল্টা হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় আছে সাইপ্রাসও। গত মার্চে সাইপ্রাসের একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল।
ওই ব্যক্তিরা আরও বলেন, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে হরমুজ প্রণালির তলদেশে পাতা সমুদ্রগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক ক্যাবলেও হামলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে ইরানি বাহিনী।
ইরান সরকার ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, যুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়াটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর আলোচনা থমে রয়েছে। গত সপ্তাহেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক পদগুলোতে রদবদল করে ক্ষমতার রাশ আরও শক্ত করেছেন। অন্যদিকে মঙ্গলবার ট্রাম্পও বলেছেন, তেহরানের সাথে 'কোনো আলোচনা বা কথাবার্তা চলছে না, এমন কোনো শিডিউলও নেই।'
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও অন্যান্য সামরিক কমান্ডাররা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বাধলে ইরান আগের কৌশল থেকে বেরিয়ে আসবে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলার গণ্ডি পেরিয়ে এবার আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে তারা।
আইআরজিসি বলেছে: 'ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর জন্য যে ঘাঁটিই ব্যবহার করা হোক না কেন, সেটাকে আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই ধরে নেওয়া হবে।'
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো সিদ্ধার্থ কৌশল ইউরোপ ও অন্যান্য জায়গায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের এই হুমকির সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেছেন: 'বাস্তব, তবে সীমিত'।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে নিশানা করতে ইরান তাদের শাহাব সিরিজের মতো মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তবে সিদ্ধার্থের মতে, বেশি দূরত্বে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চালানোর ক্ষেত্রে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বেশ সীমিত।
অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, ইরানের পাল্টা জবাবের ধরন নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের ওপর।
একটি সূত্র বলেছে, ট্রাম্প যদি তার হুমকিকে সত্যি করে ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালান হানেন, তবে সংঘাত আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে তেহরান। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো একটি জাহাজে হামলা চালালেই ওয়াশিংটন ইরানের একটি সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেবে।
দ্বিতীয় সূত্রটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালালে ইরান নিজেদের জবাব কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখায় 'আটকে রাখবে না'। ওই ব্যক্তি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, ইরান যেকোনো মূল্যে নিজেদের রক্ষা করবে। তখন মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপেও আঘাত হানা হবে।'
দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ইচ্ছা ইরান আগেই দেখিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পরের সপ্তাহগুলোতেই ওয়াশিংটন অভিযোগ তোলে, ভারত মহাসাগরে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল তেহরান—যদিও সেগুলোর কোনোটিই লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারেনি।
মার্চে তুরস্ক জানায়, ইরান থেকে ছোড়া বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ওই মাসেই সাইপ্রাসের আক্রোতিরির ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে একটি ড্রোন। পশ্চিমা কর্মকর্তারা তখন সন্দেহ করেছিলেন, ড্রোনটি সরাসরি তেহরান থেকে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কোনো প্রক্সি বাহিনী ছুড়েছিল।
তবে সূত্রগুলো বলছে, গত মাসে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে চালানো ইরানি হামলা—যাতে তিন আমেরিকান সেনা নিহত হন—ছিল তেহরানের পরিচালিত সবচেয়ে নিখুঁত দূরপাল্লার আঘাত। এই হামলা প্রমাণ করেছে, বহু দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার সক্ষমতা আছে তাদের।
প্রথম ব্যক্তি বলেন, 'এটি ইউরোপের জন্যও বার্তা: তাদের ভূখণ্ডেও ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে পারে। সুতরাং, এই যুদ্ধে তাদের অবস্থান কোথায় হওয়া উচিত, তা ইউরোপের বুঝে নেওয়া দরকার। আমাদের অবকাঠামোতে আঘাত হানার মতো বড় ভুল করলে যুদ্ধ এই অঞ্চল ছাড়িয়ে ইউরোপে পৌঁছে যেতে পারে।'
জুনে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি গত মাসেই ভেস্তে গেছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। পাল্টাপাল্টি আক্রমণও হয়, আর ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে আরোপ হয় মার্কিন অবরোধ।
এখনও পর্যন্ত হরমুজ খোলা বা চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। এই অচলাবস্থায় ট্রাম্পের বিরক্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ডগলাস ব্যারি বলেন, 'এ বছর ডিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার যে চেষ্টা ইরান চালিয়েছিল, তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে।'
এদিকে খোদ ইরান সরকারের মধ্যে কারও কারও আশঙ্কা, বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলছে তেহরান। তবে সরকারের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করে—যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিই মানবে না, তাদের বিশ্বাস করা যায় না। কাজেই চূড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তিতে ওয়াশিংটনকে বাধ্য করতে হলে তাদের ওপর আরও চড়া মূল্য চাপিয়ে দিতে হবে।
এই কট্টরপন্থি শিবিরের অন্যতম শীর্ষ মুখ মোহসেন রেজাই। সাবেক এই আইআরজিসি কমান্ডারকে গত সপ্তাহেই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা পদে বসিয়েছেন খামেনি।
ইরানি বিশ্লেষকদের কাছে রদবদলের বার্তা স্পট—টেকসই চুক্তির সম্ভাবনা যখন দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে, তখন মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফের মতো শীর্ষ মধ্যস্থতাকারীদের একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় সূত্রটি বলেছে, 'ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে গালিবাফের সঙ্গে চুক্তিতে না পৌঁছালে তোমাদের রেজাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। বার্তা হচ্ছে: "পাগলামি কোরো না, কারণ আমার মাথা তোমাদের চেয়েও বেশি মাথাগরম!'"
