হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প চীনের ‘আইস সিল্ক রোড’? আর্কটিকে বরফ কেটে নতুন নৌপথ বানানোর চেষ্টায় বেইজিং
উত্তরের সমুদ্রপথ দিয়ে চীন প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করেছে, তবে পরিবেশগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্ন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন প্রস্তাব করেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া জট এড়িয়ে যেতে বিশ্বের নতুন নতুন নৌপথের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তখন তিনি আর্কটিক অঞ্চলের উত্তর সমুদ্রপথের কথা ভেবেছিলেন। অবশ্য এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পারমাণবিক শক্তি চালিত আইসব্রেকার বা বরফকাটা জাহাজ দিয়ে জমে যাওয়া সমুদ্র কেটে তৈরি এবং আর্কটিক দিগন্তে কখনোই না ডোবা সূর্য দ্বারা আলোকিত এই সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার চ্যানেলের প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত—তিন দেশই এই উত্তরের সমুদ্রপথ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে চীনই প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনের শিপিং কোম্পানি সি লেজেন্ড এই পথে নিয়মিত সেবা চালু করেছে।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে আর্কটিক বৃত্তের মধ্য দিয়ে চলে গেছে উত্তর সমুদ্রপথ। উষ্ণ মাসগুলোতেই কেবল এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করা সম্ভব। তবে গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ায় সেই সময়সীমা এখন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। কিছু জাহাজের ক্ষেত্রে চীন থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে এই পথ ব্যবহার করলে সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে গুরুতর পরিবেশগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত এর সম্ভাব্য সুবিধাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালে একটি পরীক্ষামূলক যাত্রার পর সি লেজেন্ড আর্কটিক পথ দিয়ে নিয়মিত কনটেইনার পরিবহন সেবা চালু করেছে। চীনের নিংবো-ঝৌশান থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত সরাসরি এই যাত্রায় সময় লাগে মাত্র ১৮ দিন, যেখানে সুয়েজ খাল হয়ে যেতে ৪০ দিনেরও বেশি সময় লাগে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য এই পথ আদর্শ। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্য—যেসব পণ্য রপ্তানিতে চীন বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় হয়ে উঠেছে।
এই পথে একমাত্র নিয়মিত বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সি লেজেন্ড এখন পরীক্ষা করে দেখবে, আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আদৌ চীন-ইউরোপের মধ্যে একটি কার্যকর নিয়মিত বাণিজ্যপথে রূপ নিতে পারে কি না।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৭ সালে প্রথম প্রকাশ্যে চীন ও রাশিয়াকে আর্কটিক অঞ্চলের নৌপথ উন্নয়ন এবং একটি 'আইস সিল্ক রোড' নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
উত্তর সমুদ্রপথের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণকারী রাশিয়া শুরুতে আর্কটিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে সতর্ক ছিল। কিন্তু ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর মস্কো আর্কটিকের উত্তরে বেইজিংয়ের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব ও প্রবেশাধিকার আরও বেড়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক কোম্পানি রোসাটম উত্তর সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয় এবং এই পথে জাহাজ চলাচল তদারকি করে। একই সঙ্গে বেশির ভাগ জাহাজের সঙ্গে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত বরফভাঙা জাহাজও সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিবেশগত ঝুঁকি
সি লেজেন্ড বলছে, চীন ও ইউরোপের মধ্যে যাত্রার সময় কমে যাওয়ায় আর্কটিক পথ ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পথে যাত্রার অন্তর্নিহিত পরিবেশগত ঝুঁকি খুব সহজেই সেই নিঃসরণ কমার সুবিধা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে।
ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) ব্যবহার করে এমন জাহাজ পরিচালনার জন্য কিছু শিপিং কোম্পানি সমালোচনার মুখে পড়েছে। কারণ ২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলে এই ধরনের জ্বালানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বেলোনা পরিবেশ ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্কটিক অঞ্চলে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়লে তা বিশাল বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ভারী জ্বালানি তেল অন্যান্য ধরনের জ্বালানির তুলনায় বেশি ঘন হওয়ায় তা পরিষ্কার করা কঠিন।
ঠান্ডা আবহাওয়ায় তেল আরও ধীরে পচে এবং বরফের মধ্যে আটকে গেলে তা অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে তা মোকাবিলা করার জন্য রাশিয়া সম্পূর্ণভাবে অপ্রস্তুত।
উত্তর সমুদ্রপথের দীর্ঘ দূরত্ব এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কারণে কোনো স্থানে তেল ছড়িয়ে পড়লে সেখানে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেই কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
অ্যালিয়ান্স প্রেন্সিপাল মেরিন রিস্ক কনসালট্যান্ট ফর এশিয়ার ক্যাপ্টেন নিতিন চোপড়া বলেন, 'এই অঞ্চলের দুর্গম অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও সহায়তার ঘাটতির কারণে যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় বিকল হয়ে থাকা এবং এর ফলে জাহাজ তলিয়ে বা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এতে একটি ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশগত তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।'
বেলোনা ব্ল্যাক কার্বনের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। ভারী জ্বালানি তেল থেকে নির্গত এই পদার্থকে তারা 'সৌর বিকিরণ শোষণকারী সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদানগুলোর একটি' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ব্ল্যাক কার্বন আর্কটিক অঞ্চলের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে অঞ্চলটি সূর্যের আরও বেশি আলো শোষণ করে এবং তাপ আটকে রাখে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও তীব্র হয়।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানো 'ছায়া বহরের' জন্য এটি বরফের মহাসড়ক
সি লেজেন্ডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা লি শিয়াওবিন চলতি মাসে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালির আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রতি দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর ফলে চীন ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
মস্কো বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে চায়। কিন্তু উত্তর সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ—যার বড় অংশই রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে—অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অত্যন্ত বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর দেশটির ওপর আরোপ করা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কোনো জাহাজ বিপদে পড়লে এবং সহায়তার প্রয়োজন হলে উদ্ধার তৎপরতাকে জটিল করে তুলতে পারে বলে বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যালিয়ান্স কমার্শিয়াল তাদের ২০২৬ সালের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল পর্যালোচনায় জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে উত্তর সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের বড় একটি অংশ রাশিয়ার তথাকথিত 'ছায়া বহর'-এর অন্তর্ভুক্ত।
এই বহরের ট্যাংকারগুলো অনেক সময় বীমা বা যথাযথ নিয়ন্ত্রক তদারকি ছাড়াই চলাচল করে এবং রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্দেশ্যে খেয়ালখুশিমতো বিভিন্ন যাত্রা পরিচালনা করে।
বেলোনার কেনসিয়া ভাখরুশেভা গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, '২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এমন একশটি জাহাজ ছিল—অথবা ওই পথে চলাচলকারী মোট পণ্যবাহী জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।'
২০২৬ সালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর সমুদ্রপথ দিয়ে 'ছায়া বহর'-এর পণ্য পরিবহন আরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর পেছনে গ্রীষ্মকালে তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া এবং সেই কারণে জাহাজ চলাচল সহজ হয়ে যাওয়ার ভূমিকা রয়েছে।
আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ভিন থাই বলেন, 'বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বছরের আরও বেশি সময় উত্তর সমুদ্রপথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা থাকতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে এমনটি ঘটছে—এমন কিছু প্রমাণও রয়েছে।
সমুদ্রের গ্রীষ্মকালীন বরফ কমে যাওয়ায় রাশিয়ার একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ মে মাসেই এই পথ দিয়ে আগাম যাত্রা শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারীরা উত্তর সমুদ্রপথ দিয়ে রাশিয়ার ট্যাংকারগুলোর একটি নজিরবিহীন বহরকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তরের একটি পথ ধরে চলতে দেখেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী এই জাহাজবহর উত্তর মেরু থেকে মাত্র ৫০০ মাইলের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে।
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উত্তর সমুদ্রপথকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাশিয়া জোরালো—সম্ভবত বেপরোয়া—চেষ্টা চালালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে এর অর্থনৈতিক হিসাব মেলে না।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, পরিচালনার উচ্চ ব্যয়, নৌযাত্রার জন্য স্বল্প সময়ের মৌসুম এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকি—সব মিলিয়ে আর্কটিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের প্রসার সম্ভবত এখনও সীমিত থাকবে।
অধ্যাপক ভিন থাই বলেন, ফলে যেকোনো তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা 'পরিবেশগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও' হতে পারে।
তিনি বলেন, 'শুধু রাশিয়ার জন্য নয়, আশপাশের অঞ্চলের জন্যও।'
তিনি আরও বলেন, 'তাহলে কি উত্তর সমুদ্রপথকে হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না, অন্তত এই মুহূর্তে নয়।'
