আমানত বাজেয়াপ্ত করতে পারে সরকার, এমন আশঙ্কায় ব্যাংক থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তুলে নিচ্ছেন রাশিয়ানরা
ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটাতে রাশিয়ার সরকার ব্যাংকে থাকা আমানতে হাত দিতে পারে সরকার, এমন আশঙ্কা বাড়তে থাকায় রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছেন।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে রাশিয়ায় প্রচলিত নগদ অর্থের পরিমাণ ২৮৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন রুবল (প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার) বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা সপ্তম মাসে দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নগদ অর্থ বেরিয়ে গেল।
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, অর্থনীতি নিয়ে হতাশা এবং সরকার ব্যাংক আমানত আটকে দিতে বা হঠাৎ করে টাকা তোলার সীমা নির্ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কাই মানুষের আচরণে এই পরিবর্তনের কারণ।
ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনের পঞ্চম বছরে এসে রাশিয়ার মানুষ এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বেশি অনুভব করছেন। এর মধ্যে কিয়েভ মস্কোর তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্থাপনায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাবেক একজন অর্থ কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-কে বলেন, 'ড্রোন উড়ছে। বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলছে। মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। তাই হয়তো সাধারণ বুদ্ধি থেকেই মানুষ ভাবছে, টাকা ব্যাংকে না রেখে বালিশের নিচে রাখা ভালো। কারণ ব্যাংকে রাখলে সেই টাকা আর ফেরত নাও পাওয়া যেতে পারে।'
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রতি কর্মদিবসেই ব্যাংকগুলো থেকে আশঙ্কাজনক হারে নগদ টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ১২ আগস্ট সর্বোচ্চ ৫৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন রুবল (প্রায় ৬৭ কোটি ডলার) তুলে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে জুলাই মাসে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়, যার পরিমাণ ছিল ৬২০ বিলিয়ন রুবলেরও (প্রায় ৭৩০ কোটি ডলার) বেশি। ফলে বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ২ হাজার ৮২০ কোটি ডলার)।
এটি ২০২২ সালে যুদ্ধের প্রথম বছরে তুলে নেওয়া দুই ট্রিলিয়ন রুবলের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ওই বছর ফেব্রুয়ারি ও মার্চে যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তড়িঘড়ি করে ব্যাংক থেকে বেশিরভাগ টাকা তুলে নেয়।
নগদ টাকার এই অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রুশ সংবাদমাধ্যম আরবিসি-এর তথ্য অনুযায়ী, রুবলের ঘাটতি ২০২২ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নগদ অর্থের এমন ঘাটতির কারণে অনেক ব্যাংকের কাছেই সরকারি বন্ড কেনার মতো পর্যাপ্ত তহবিল থাকছে না।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়ার বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, শিগগিরই রুশ নাগরিকদের ব্যাংক আমানত বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।
তবে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ এক বিবৃতিতে এসব পোস্টকে 'ভুয়া খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও জানিয়েছেন, সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রেমলিন। যার ফলে সাধারণ রুশ নাগরিকরা তাদের কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন না। এটিও নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া কর বৃদ্ধি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারিকেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়ার একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক সাময়িকী 'দ্য বেল' এক প্রতিবেদনে জানায়, 'বিশ্বের ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থার শীর্ষ সারিতে পৌঁছাতে রাশিয়ার এক দশকেরও কম সময় লেগেছে। কিন্তু এখন রুশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের কারণেই রুশ নাগরিকরা ফের নগদ টাকার দিকে ঝুঁকছেন।'
এতে আরোও বলা হয়, 'একদিকে বাড়তি কর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আর নির্ভরযোগ্য থাকছে না।'
এই চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বড় বড় কোম্পানিগুলো। তারা রুশ নিয়ন্ত্রকদের হাত থেকে নিজেদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেই রাশিয়ার ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন রুবল (প্রায় ৯৪০ কোটি ডলার) তুলে নেওয়া হয়েছে।
ক্রেমলিনের ব্যাপক জাতীয়করণ অভিযানের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন রুবল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চলছে। উভয় কারণেই ধনাঢ্য বিলিয়নিয়ারদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানা গেছে।
তবে পুতিনের জন্য একটি বড় সুযোগ হয়ে এসেছে তার একটি পদক্ষেপ। যুদ্ধভিত্তিক ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে মার্চ মাসে তিনি ধনকুবেরদের কাছ থেকে অনুদান আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার মাধ্যমে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ফেডারেল বাজেটে শত শত বিলিয়ন রুবল জমা হয়েছে বলে সোমবার মস্কোভিত্তিক ব্যবসা-সংক্রান্ত দৈনিক 'ভেদোমোস্তি' জানিয়েছে।
রাশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে মানুষের আশাবাদ এ বছর রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। জুনে একটি জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ রুশ নাগরিক মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গত সপ্তাহের শেষে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আন্দ্রেই ক্লেপাচকে বরখাস্ত করা হয়। রুশ সংবাদমাধ্যমে তার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য প্রকাশের পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মস্কো হেরে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
'দ্য বেল' জানিয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে ওই পদে থাকা ক্লেপাচকে ক্রেমলিনের নির্দেশে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার মে মাসে দেওয়া একটি বক্তব্য সম্পর্কে ক্রেমলিন জানতে পারার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
