যুদ্ধকালীন অর্থনীতির সমালোচনা: বরখাস্ত রাশিয়ার শীর্ষ ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ
ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ার অর্থনীতি এবং যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করার জের ধরে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লড়াইয়ে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের কাছে হেরে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ব্যাংক 'ভিইবি'-তে ২০১৪ সাল থেকে প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আন্দ্রেঁই ক্লেপাচ। গত মে মাসে সহকর্মী অর্থনীতিবিদদের সামনে দেওয়া এক বিস্ফোরক বক্তৃতা দেন তিনি, এ খবর রুশ গণমাধ্যমে প্রকাশের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
সর্বপ্রথম এই খবর প্রকাশ করে দ্য মস্কো টাইমস। দৈনিকটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বক্তব্যে ক্লেপাচ স্বীকার করেন যে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এবং "কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনের চেয়েও পিছিয়ে পড়ছে।"
ক্লেপাচ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর যে অভূতপূর্ব চাপ তৈরি হয়েছে, তা অনিবার্যভাবেই একটি "সামাজিক সংকট" ডেকে আনবে। আর এই সংকট এমন এক সময়ে বিস্ফোরিত হবে যখন কেউ তা একেবারেই প্রত্যাশা করবে না।
ইউক্রেনের অর্থনীতি শিগগিরই ভেঙে পড়বে—এমন ধারণাকে অলীক বা ভুল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, কিয়েভের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই বা দ্বন্দ্বে জয়ের মুখ দেখবে না রাশিয়া। ক্লেপাচ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "ইউক্রেনের সঙ্গে শক্তিক্ষয়ের এই প্রতিযোগিতায় আমরা জিততে পারব না। আমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা বা বিভ্রম কাজ করছে যে সেখানকার (ইউক্রেন) সবকিছু ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা ভেঙে পড়েনি এবং পড়বেও না। বরং উল্টো আমাদের খরচ দিন দিন বেড়েই চলেছে।"
রাশিয়ার কোনো উচ্চপদস্থ অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে এমন অকপট বক্তব্য অত্যন্ত বিরল। এটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। পুতিন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপ রাশিয়া সফলভাবে মোকাবিলা করছে এবং ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ধস কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এসব কথা বলার পরই বরখাস্ত করা হয় ক্লেপাচকে। তবে তাঁকে চাকরিচ্যুত করার পেছনে ভিইবি ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ দর্শায়নি। তবে ব্যবসায়িক গণমাধ্যম বেদোমোস্তি-কে ক্লেপাচের এক পরিচিতজন জানান, তাঁর এই বিদায় "দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত ব্যক্তিগত ও কঠোর মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বা ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না।"
রাশিয়ার স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দ্য বেল সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ক্রেমলিনের সরাসরি নির্দেশেই ক্লেপাচকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মে মাসের ওই বিতর্কিত বক্তব্যের সঙ্গেই তাঁর চাকরি হারানোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ক্লেপাচের বরখাস্তের ঘটনাটি ক্রেমলিনের শীর্ষপর্যায়ে আনুগত্যের মানসিকতা কতটা কড়া করা হয়েছে তা ফুটিয়ে তোলে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন এখন এমন কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে থাকছেন, যারা তাঁর চিন্তাভাবনা বা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস পান না।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উপদেষ্টা এবং কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো অ্যালেক্সান্দ্রা প্রোকোপেনকো ক্লেপাচকে একজন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি সরকারি অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে ভয় পেতেন না।
প্রোকোপেনকো বলেন, "ক্লেপাচকে বরখাস্ত করা হলেও তিনি যে আসন্ন আর্থিক সংকটের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তা এড়ানো যাবে না। তাঁর পূর্বাভাসগুলো কাউকে সন্তুষ্ট করার ইচ্ছার চেয়ে বরং বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল এবং তাঁর এই হিসাবগুলো প্রায়শই সরকারি পরিসংখ্যানে দেখানো তথ্যের চেয়ে কিছুটা বেশি হতাশাজনক কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ছিল।"
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। বিশাল যুদ্ধকালীন ব্যয়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার তেল-গ্যাস শিল্পে ইউক্রেনের ক্রমাগত হামলার কারণে অর্থনীতি এখন চরম চাপে পড়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি পৌঁছেছে ৫.৮৭ ট্রিলিয়ন রুবলে (প্রায় ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা পুরো বছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৩.৭৯ ট্রিলিয়ন রুবল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি। আলোচনার বিষয়ে অবগত দুটি ভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, পুতিনের নিকটতম উপদেষ্টাদের কেউ কেউ গোপনে তাঁকে সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ পরিচালনার বর্তমান ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ই-কমার্স রিটেইলার 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর বেশ কয়েকটি গুদামে ইউক্রেনীয় হামলায় শত শত কোটি ডলারের পণ্য ধ্বংস হয়েছে। এই হামলার ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং প্ল্যাটফর্মটির ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার স্বাধীন বিক্রেতা চরম বিপাকে পড়েছেন।
তবে এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধ সংকুচিত করা বা খরচ কমানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি। এর বদলে ক্রেমলিন ছোট ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর কর বাড়িয়ে এবং ধনকুবেরদের (অলিম্পার্ক) ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনায় অর্থ জোগাতে চাইছে।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর পর চলতি বছর তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় রুশ সরকারের জন্য কোটি কোটি ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব যুক্ত হয়েছে। তেলের এই বর্ধিত দর সাময়িকভাবে হলেও মস্কোর ওপর চেপে বসা অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা লাঘব করতে সাহায্য করছে।
