রাশিয়ার সামরিক শক্তির বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে ইউক্রেন কি ভেঙে দিয়েছে!
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করেন, তখন ক্রেমলিন ইউরোপীয় নিরাপত্তার একটি পুরনো সূত্রের ওপর বাজি ধরেছিল। আর সেটি হচ্ছে– বিপুল সংখ্যক সেনা, সোভিয়েত আমলের সুবিশাল অস্ত্রাগার এবং পরমাণু শক্তির দাপট কিয়েভের যেকোনো প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেবে।
তবে চার বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর মস্কোর সেই সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ইউক্রেন টিকে রয়েছে, রাশিয়ার দ্রুত বিজয়ের স্বপ্নকে নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং এই সংঘাতকে একটি উচ্চপ্রযুক্তির শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধে (ওয়ার অব এট্রিশনে) রূপান্তরিত করেছে।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব দ্য প্রেসিডেন্সি অ্যান্ড কংগ্রেস-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জশুয়া হুমিনস্কির মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের যে গতি তৈরি করেছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য ন্যাটো দেশের চেয়েও অনেক দ্রুত।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সেনার জন্য রাশিয়ার উত্তর কোরিয়ার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতাকে মস্কোর চূড়ান্ত ধস হিসেবে দেখা ভুল। একইসঙ্গে যুদ্ধ শেষে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠবে এমনটা ভাবাও ঠিক হবে না।
বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
ইউক্রেন রাশিয়ার প্রথাগত স্থলবাহিনীর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছে এবং মস্কোর সামরিক পরিকল্পনা ও নীতির চরম ব্যর্থতা প্রকাশ করে দিয়েছে। আবার অন্যদিকে, রুশ সামরিক বাহিনীও প্রতিনিয়ত যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, অস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে। তারা এবারে এমন এক ধরনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে—যেমনটা তারা আগে কখনোই লড়েনি।
হুমিনস্কি জানান, "ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর শক্তি ধারাবাহিক ও মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।" তবে কেবল এই একটি দিক দেখে পুরো রাশিয়ান সামরিক ক্ষমতা বিচার করা বড় ভুল হবে। কারণ তাদের নর্দার্ন ও প্যাসিফিক নৌ বহরের গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে, তাদের কৌশলগত পারমাণবিক শক্তি প্রায় স্পর্শহীন অবস্থায় আছে। তাছাড়া মস্কো শক্তিশালী সাইবার ও মহাকাশ প্রযুক্তিরও অধিকারী।
তাই আসল প্রশ্ন আর এটি নয় যে রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কি না। প্রশ্ন হলো—ইউক্রেন রাশিয়ার ক্ষমতার যে সীমাবদ্ধতাগুলো উন্মোচন করেছে, তা কাটিয়ে উঠতে রাশিয়ার এই কৌশলগত রূপান্তর বা মানিয়ে নেওয়া সফল হবে কি না।
ব্যর্থ ব্লিটজক্রিগ (ঝটিকা আক্রমণ) ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা
রাশিয়ার মূল গলদ ছিল তাদের ভুল ধারণায়। হুমিনস্কির মতে, পুতিনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইউক্রেনকে একটি "তাসের ঘর" মনে করেছিল, যা সামান্য আঘাতে ভেঙে পড়বে।
কিন্তু ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ, রাশিয়ার কৌশলগত ব্যর্থতা, পশ্চিমা সহায়তা এবং দ্রুত প্রযুক্তির রূপান্তর—সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ দেয় এই যুদ্ধকে। কিয়েভের উপকণ্ঠে গোস্তোমেল বিমানঘাঁটি রক্ষায় রাশিয়ার অভিজাত এয়ারবোর্ন সেনাদের প্রতিহত করার ঘটনাটি মস্কোর পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার প্রথম বড় উদাহরণ ছিল।
পরবর্তীতে ড্রোন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং দূরপাল্লার হামলা যুদ্ধক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো মারিয়া স্নেগোভায়া জানান, ইউক্রেন প্রযুক্তির শক্তিতে উল্লেখযোগ্য গতি লাভ করেছে এবং সেনাসংকট কাটাতে ব্যাপকভাবে ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে।
তবে এটি স্থায়ী কোনো সুবিধা নয়। ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেন এগিয়ে থাকলেও— রাশিয়া দ্রুত সেই প্রযুক্তিগুলোর বিপরীত নকশা (রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং) তৈরি করে প্রতিরোধক ব্যবস্থা বা কাউন্টার-মেজার্স গড়ে তুলছে।
@ঘাটতি মেটাচ্ছে উত্তর কোরিয়া
মস্কো-পিয়ংয়ং অংশীদারত্ব সম্ভবত যুদ্ধের প্রচণ্ড চাহিদার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। উত্তর কোরিয়া বিপুল গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইউক্রেনে লড়তে সেনা সদস্যদেরও পাঠিয়েছে। উ. কোরীয় সেনাদের রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের আচমকা অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কাজেও ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে স্নেগোভায়া মনে করেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সামরিক উৎপাদনকেও ছোট করে দেখার উপায় নেই। মস্কো ড্রোন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়েছে।
কিন্তু যুদ্ধের মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে এত উৎপাদনের পরও—রাশিয়ার পক্ষে বড় রিজার্ভ ফান্ড তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর সেখানেই শূন্যস্থান পূরণ করছে উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার সেনারা পুতিনকে একটি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেনাবাহিনীতে পূর্ণমাত্রার ভর্তি কার্যক্রম ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্র সচল রাখতে সাহায্য করছে।
ড্রোন এককভাবে যুদ্ধ জেতাতে পারে না
কনভেনশনাল বা প্রথাগত শক্তির দিক থেকে ইউক্রেন শুরু থেকেই পিছিয়ে ছিল। ট্যাংকের বদলে ট্যাংক বা গোলার বদলে গোলা ছুঁড়ে লড়াই করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ইউক্রেনের উত্তর ছিল প্রযুক্তির খরচ কমিয়ে দিয়ে রাশিয়ার বিপুল ব্যয়বহুল সরঞ্জাম ধ্বংস করা।
সস্তা ড্রোন দিয়ে অনেক দামি রাশিয়ান সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করে, ইউক্রেন তার সেনাসংকট কিছুটা সামাল দিতে পারলেও—কেবল ড্রোনই সেনা মোতায়েনের বিকল্প হতে পারে না। ইউক্রেনের জনবল বা সেনাসংকট এখনো অত্যন্ত তীব্র। কিয়েভের বাহিনী ফ্রন্টলাইনে তৈরি করা রক্ষণাত্মক "কিল জোন" শত্রুকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু কেবল ড্রোন দিয়ে এই যুদ্ধ জিততে পারবে না।
অন্যদিকে, রাশিয়াও নিজস্ব কৌশলে পরিবর্তন আনছে। সোভিয়েত যুগের ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতার সাথে তারা নতুন প্রযুক্তি, ড্রোন এবং অভিজ্ঞতা যুক্ত করে এক ভয়ঙ্কর সংমিশ্রণ তৈরি করেছে।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সীমানায় হামলা
ইউক্রেনের কৌশলগত উদ্ভাবন যুদ্ধের ভৌগোলিক মানচিত্রকেও বদলে দিয়েছে। কৃষ্ণসাগরে নিজের বিশাল নৌবহর না থাকার পরও ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌ বহরকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে রেখেছে। রাশিয়ার নৌঘাঁটি ক্রিমিয়া থেকে সরিয়ে পুতিন আরও পূর্বের নভোরোসিস্কে নিয়ে গেলেও সেখানেও ইউক্রেনীয় ড্রোন সফল আঘাত হেনেছে।
এর মাধ্যমে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে সামরিক ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্রে গভীর হামলা চালিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু, ক্ষতিগ্রস্থ হলেও রাশিয়া এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাছাড়া মস্কোর হাতে বিশাল প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে। রাশিয়ার পরমাণু শক্তি ও প্রতিরক্ষা-শিল্প সম্পূর্ণ অটুট। তাই ইউক্রেন বর্তমানে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও, পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা কতদিন বজায় থাকবে—তা যুদ্ধের ফলাফলের বড় নির্ধারক হয়ে থাকবে।
