কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ন্যাটোভুক্ত দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তা
ন্যাটোর দৃঢ়তা যাচাই করতে রাশিয়া কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইউরোপে ছোট পরিসরে স্থল অভিযান চালিয়ে অথবা সাইবার হামলা করে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া। চলতি শরৎ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময় এমন হামলা হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এই প্রতিবেদনটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়ন থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে তাদের ধারণা ছিল, ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালাবেন না।
গত মাসে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছিল, ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাশিয়ার কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে ছিল পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে 'ফলস ফ্ল্যাগ' (ছদ্মবেশী) হামলা।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বার্ষিকীর আগে ন্যাটোর মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ানো এবং কিয়েভকে সমর্থন অব্যাহত রাখা থেকে তাদের বিরত রাখার উদ্দেশ্যে মস্কো এসব পদক্ষেপকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।
কয়েক মাস ধরে ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে রুশ হুমকি বাড়ছে বলেও জানিয়েছেন পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোর নেতারা।
বৃহস্পতিবার লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, ক্রেমলিন ইউক্রেনের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে বাল্টিক অঞ্চলে হামলার পরিকল্পনা করছে।
রবার্তাস কাউনাস বলেন, ইউরোপকে বিভক্ত করা এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে মস্কো 'ছদ্মবেশী হামলা' চালাতে পারে।
পরে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার যেসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আসলে 'বড় সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ।'
স্ট্রিটিং গত মাসে প্লাইমাউথের কাছাকাছি ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজ নেউস্ত্রাশিমির গোলাবর্ষণের মহড়ার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি দ্য সানকে বলেন, 'চ্যানেলে গোলাবর্ষণের মতো ঘটনা লোক দেখানো, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়। অন্তত এটি ব্রিটিশদের সামনে রাশিয়ার প্রতিদিনের উসকানির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ তুলে ধরে।'
পোল্যান্ড ও তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দারা। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটো জোটকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতেই এ বিষয়ে তাদের মূল্যায়নে পরিবর্তন এসেছে। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছেন পুতিন। একই সঙ্গে ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত জয় নিশ্চিত করতেও তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন।
সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে রয়েছে সাইবার হামলা, পরিচয় গোপন রাখা কোনো গোষ্ঠীকে ভূখণ্ড দখলের জন্য পাঠানো এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সীমিত পরিসরে অনুপ্রবেশ। সীমান্তে সরাসরি অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা কম হলেও সময়ের সঙ্গে এ ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে স্থল হামলার সম্ভাবনাকে খুব একটা আমলে নেওয়া হতো না। কারণ, এমন হামলা হলে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ধারায় কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ন্যাটোর সর্বশেষ গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুতিন সামরিকভাবে ন্যাটোকে পরাজিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। তাই এর পরিবর্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অন্তর্ঘাত ও অন্যান্য মিশ্র কৌশল ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও'ডনেল বলেছেন, প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য ন্যাটো প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, জোটটি সব সময় সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের পাশে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়া যায়। ড্রোনটির উৎস এখনো স্পষ্ট নয়। তবে জার্মান রাজনীতিকরা এ ঘটনায় মস্কোকে দায়ী করেছেন।
মধ্যরাতের ঠিক আগে 'অ্যান্টনভ এয়ারলাইন্স'-এর একটি বিমানের কাছে সেমটেক্স নামের শক্তিশালী বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনটি পাওয়া যায়। ঘটনার পর বার্লিন সন্ত্রাসবিরোধী তদন্ত শুরু করেছে এবং বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
পূর্ব জার্মানির এই বিমানবন্দরটি সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জার্মান সেনাবাহিনী ও ন্যাটোর মিত্রদের সরঞ্জামও এখান দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া বিমানবন্দরটি অ্যান্টনভ জেটের ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ন্যাটো জানিয়েছে, তারা এ ঘটনার বিষয়ে অবগত।
ন্যাটোর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের উসকানির মূল উদ্দেশ্য হতে পারে জোটের ভেতরে উত্তেজনা বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোকে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত রাখা।
গত মে মাসে ভিলনিয়াসের দিকে আসা একটি আক্রমণকারী ড্রোন ঠেকাতে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান আকাশে ওড়ে। ওই ঘটনার পর লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
এর আগে গত মাসে পোল্যান্ডের একটি গ্রামের কাছে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বস্ত হওয়ার পর ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেপরোয়া হামলার অভিযোগ তোলে।
ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে টারনাওয়া-কলোনিয়া গ্রামের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে। এটিকে রাশিয়ার কেএইচ-১০১ ক্ষেপণাস্ত্র বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে প্রায় ১০ মিটার এলাকাজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়।
