রাশিয়া-ইউক্রেন আকাশযুদ্ধে দীর্ঘতর হচ্ছে বেসামরিক প্রাণহানির মিছিল
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের মূল রণাঙ্গন বা স্থলভাগের সামরিক অবস্থানগুলো বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে আকাশের নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াই দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশেরই এখন আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার চেয়ে আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা অনেক গুণ বেড়েছে। এর অর্থ হলো, আকাশপথে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো সহজেই তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে; ধ্বংস হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো, আর প্রতি সপ্তাহেই প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য সাধারণ নাগরিক।
আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা- অ্যাকলেড-এর পূর্ব ইউরোপ বিষয়ক রিসার্চ ম্যানেজার ওলহা পোলিশচুক বলেন, "আমরা নিশ্চিতভাবেই হামলার ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে দেখছি। একই সঙ্গে হামলার শিকার হওয়া লক্ষ্যবস্তুর ধরনেও এক ধরনের নতুন পরিবর্তন ও তীব্রতা এসেছে।"
রণাঙ্গন থেকে হাজার মাইল দূরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হানার সক্ষমতা ইউক্রেনের আগে থেকেই ছিল, তবে গত এক বছরে দেশটির ড্রোন প্রযুক্তিতে আধুনিকতা ও কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে ব্যাপক গতিতে। জুনের শেষভাগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলা জোরদার করতে ৪০ দিনের এক বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেন—যা এখনো অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা- রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাতিয়া সেসকুরিয়া বলেন, "এটি রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কারণ গত ৪০ দিনে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, আকাশপথে হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ক্রেমলিনের বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে এবং ইউক্রেন তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে বেশ সফলভাবেই আঘাত হানতে পারছে।"
অ্যাকলেড-এর বিশ্লেষক পোলিশচুকের মতে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আগে থেকে থেকে দূরপাল্লার হামলা চালানো হলেও, কিয়েভ এখন শোধনাগার, তেলবাহী ট্যাংকার, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ও সামগ্রিক জ্বালানি অবকাঠামোতে ঘন ঘন ও পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি দখলকৃত পূর্ব ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যাহত করতে আকাশপথে হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে কিয়েভ।
বিশ্লেষকরা রাশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে হামলা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান- ওয়াইল্ডবেরিজ-এর গুদামগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেন সরকারের দাবি, এই প্রতিষ্ঠানটি রণাঙ্গনে থাকা রুশ সেনাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করে, তাই গুদামগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু।
সম্প্রতি বারবার মস্কোর আকাশসীমা লঙ্ঘন করার পাশাপাশি সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে কিয়েভ।
এই ধরনের হামলা সাধারণ রাশিয়ান জনগণের সামনে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সরাসরি তুলে ধরার এবং ক্রেমলিনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম এমন ব্যবসায়ী অভিজাত শ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে তারা এই সর্বাত্মক যুদ্ধ বন্ধে ক্রেমলিনকে বাধ্য করে।
এর পাশাপাশি সেসকুরিয়া উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের এই দূরপাল্লার হামলা অভিযানের একটি "বাস্তবসম্মত উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার গ্রীষ্মকালীন সামরিক অভিযানকে শ্লথ করে দেওয়া, যাতে ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে রাশিয়াকে তাদের সামরিক সরঞ্জাম বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে হয়।"
যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো কেবল ইউক্রেন সীমান্ত এবং রণাঙ্গন সংলগ্ন এলাকায় কেন্দ্রীভূত করে রেখেছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানিয়েছিল ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রগুলো। কিন্তু কিয়েভের বর্তমান কৌশল হলো রাশিয়ার অভ্যন্তরে এবং অধিকৃত পূর্ব ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হামলা চালানো, যা রুশ বাহিনীকে তাদের প্রতিরক্ষা বলয়কে পাতলা ও দুর্বল করে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করেছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত প্রথাগত যুদ্ধবিমান ও বড় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের জন্য তৈরি, ড্রোন ঠেকানোর জন্য নয়। জুনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ব্যস্ত মহাসড়কে দাঁড়িয়ে রুশ সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাডস) দিয়ে ড্রোন ঠেকাতে দিশেহারা চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ-অধ্যুষিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। অ্যাকলেড-এর তথ্য অনুযায়ী, জুনে এই উপদ্বীপের বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে আকাশপথে এই হামলার তীব্রতা কেবল একদিকেই সীমাবদ্ধ নয়; দুপক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলায় মেতে উঠেছে।
পোলিশচুক বলেন, "ইউক্রেন যে ধরনের হামলা চালাচ্ছে, রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ঠিক একই ধরনের হামলা ইউক্রেনে ফিরে আসছে। যেমন, রাশিয়ার ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে হামলার পর এখন ইউক্রেনের অন্যতম বড় ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান- রোজেটকা'র বেশ কিছু গুদামঘরে হামলা চালানো হচ্ছে।"
অন্যদিকে রণাঙ্গনে গত কয়েক মাসে সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে অ্যাকলেড। পোলিশচুক জানান, "রুশ বাহিনী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ছোট ছোট কিছু লোকালয় পুনর্দখল করলেও—তাদের সার্বিক অগ্রযাত্রা অত্যন্ত ধীরগতির।"
সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে
আকাশযুদ্ধের এই আকস্মিক তীব্রতা বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিকে এক ভয়াবহ রূপ দিয়েছে।
গত জুন মাসে ইউক্রেনে এক মাসে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের সংখ্যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউক্রেনে অন্তত ১,৩৯৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৭,৯৭৮ জন আহত হয়েছেন—যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘের মতে, এসব হতাহতের সিংহভাগই ইউক্রেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ঘটেছে, তবে কিছু ঘটনা রুশ-অধ্যুষিত অঞ্চলেও নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৯৭ জন রুশ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে সিএনএন কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
নিজ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলার তুলনায়–- ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার নৈশকালীন হামলার তীব্রতা বহুগুণ বেশি। গত মাসে মস্কো ইউক্রেনের ওপর প্রতিদিন গড়ে ১৭২টি হামলা চালিয়েছে, যার বিপরীতে কিয়েভ প্রতিদিন গড়ে ২৮টি হামলা চালিয়েছে।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে রাশিয়া বিগত কয়েক মাস ধরে প্রতিটি হামলায় ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে কিয়েভ ও এর আশপাশের এলাকায় রাশিয়া দুই ডজনেরও বেশি ব্যালিস্টিক ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে অন্তত ১৭ জন নিহত হন। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটিকেও ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি।
জেলেনস্কি বারবার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও বেশি প্যাট্রিওট ইন্টারসেপ্টরের সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার চলমান যুদ্ধ প্যাট্রিওট সরবরাহের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গত মাসে ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে স্থানীয়ভাবে প্যাট্রিওট ইন্টারসেপ্টর তৈরির অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে কিয়েভের আশা জেগেছিল। তবে ট্রাম্প পরবর্তীতে তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটেন।
কূটনৈতিক আলোচনার কোনো সুযোগ কি আছে?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, সাড়ে চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করতে এবং ইউক্রেনের অবস্থান শক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় মিত্রদের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল।
জার্মানিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউটের মতে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছিল। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে মার্কিন কংগ্রেস ইউক্রেনের জন্য নতুন কোনো বড় ধরনের আর্থিক বা সামরিক সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেনি।
পোলিশচুক বলেন, "ইউক্রেন বর্তমানে কিছুক্ষেত্রে সামরিক গতিশীলতা লাভ করেছে এবং কিয়েভ যখন আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় রয়েছে, তখন আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এপর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষ্ফল প্রমাণিত হয়েছে।"
তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অভ্যন্তরীণ যে চাপ তৈরি হতে পারে, কেবল তার ভিত্তিতেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধসংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) বিশেষজ্ঞ সেসকুরিয়াও এই মুহূর্তে কূটনীতির জোরালো কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না।
তিনি বলেন, "সমস্যা হলো, আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সময় পুতিনের কাছে যেসব কৌশলগত প্রভাব বা সুবিধা ছিল, তা এখন আর নেই; এমনকি তখন রাশিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও অনেকটা নমনীয় ছিল।" তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ইতি টেনে ক্রেমলিনের পক্ষে বিজয় দাবি করা অত্যন্ত কঠিন।
"আমার মনে হয় দ্বিতীয় পথটি হলো সংঘাত আরও বাড়িয়ে তোলা, যার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি" –যোগ করেন তিনি।
