ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প, অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
পূর্ব ইন্দোনেশিয়ায় শনিবার ভোরে ৭.৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও এর পরপরই বেশ কয়েকটি পরাঘাত (আফটারশক) আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক প্রাদেশিক গভর্নর। এছাড়া বহু বাড়িঘর ও ভবন ধসে পড়েছে।
ভূমিকম্পের পরপরই কর্তৃপক্ষ সুনামি সতর্কতা জারি করে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে পরে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা জানায়, পর্যবেক্ষণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় উপকূলের জন্য হুমকি হওয়ার মতো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে পরে সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কে লোকজন যখন চিৎকার করে রাস্তায় ছোটাছুটি করছেন, তখন একটি ভবনের একাংশ ধসে পড়ছে। ভিডিওটি মাউমেরে বন্দরের বলে নিশ্চিত হতে পেরেছে রয়টার্স। এটি ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা অঞ্চলের প্রধান শহর। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ফ্লোরেসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইস্ট নুসা টেঙ্গারা-র তালিবুরা গ্রামের ৫১ বছর বয়সি বাসিন্দা নোনা বলেন, 'ভূমিকম্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, এর তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। আমরা তখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। ঘরের ভেতরে আমরা ১৩ জন ছিলাম। প্রাণ বাঁচাতে সবাই একসঙ্গে ছুটে বাইরে বের হয়ে যাই।'
ইস্ট নুসা টেঙ্গারার পুলিশ প্রধান রুডি দারমোকো বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ভবন ধসে ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সিক্কা রিজেন্সিতে দুইজন ও মাঙ্গারাই রিজেন্সিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তথ্য আদান-প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।
বিএনপিবি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইস্ট নুসা টেঙ্গারা, ওয়েস্ট নুসা টেঙ্গারা ও দক্ষিণ সুলাওয়েসির কিছু অংশে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কম্পনটি প্রায় এক মিনিট স্থায়ী ছিল।
সংস্থাটির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'বেশিরভাগ মানুষই তীব্র কম্পন অনুভব করেন এবং আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।'
কম্পাস টিভির ফুটেজে দেখা যায়, ইস্ট নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের এন্দে জেলার একটি হাসপাতালের রোগীদের বাইরে বের করা আনা হচ্ছে। এছাড়া অন্তত একটি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কম্পাস ডটকম।
ইন্দোনেশিয়ার ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে প্রথম কম্পনটি আঘাত হানে। এর পরপরই বেশ কয়েকটি পরাঘাত অনুভূত হয়।
বিএনপিবি জানিয়েছে, নাগেকেও এলাকার প্রায় ২ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি বাড়িঘর, গুদাম ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর ফলে ওই অঞ্চলের কিছু অংশে তীব্র যানজট তৈরি হয় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানিয়েছে, সমুদ্রের তলদেশের এই ভূমিকম্পের কারণে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড, দ্বীপপুঞ্জ বা এর কোনো অঞ্চলে সুনামির আশঙ্কা নেই।
১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত বিশাল দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অতিসংবেদনশীল ভূমিকম্প বলয় বা 'প্যাসিফিক রিং অভ ফায়ার'-এর ওপর অবস্থিত। এখানে পৃথিবীর ভূত্বকের বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের মিলন ঘটায় দেশটি তীব্র ভূমিকম্প ও সক্রিয় আগ্নেয়গিরির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
১৯৯২ সালে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামির সৃষ্টি হয়। সেই দুর্যোগে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
২০১৮ সালে পালু-কোরো ফল্টলাইনে আঘাত হানে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প। এতে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পালু শহরের উপকূলীয় এলাকাগুলো স্থানীয় সুনামিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পাশাপাশি তীব্র কম্পনে মাটি তরলীকরণ প্রক্রিয়ায় পুরো এলাকা কাদার নদীতে রূপ নেয়। এই দুর্যোগে ৪ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।
২০১০ সালে পশ্চিম সুমাত্রার উপকূলে অবস্থিত মেন্তাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাছে সমুদ্রগর্ভে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাতেরো চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় শত শত ঘরবাড়ি।
২০০৪ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলের অদূরে ৯.১ মাত্রার এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের ১২টি দেশে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
