জাপানে ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩, ধসে পড়া শপিংমলে উদ্ধার অভিযান চলছে
দক্ষিণ জাপানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পের পর গতকাল বুধবারেও উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন। এই ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং পুরো অঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক ফেটে গেছে।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পের প্রায় এক ঘণ্টা পর কুমামোতো শহরের কাছে একটি আংশিক ধসে পড়া শপিংমলে ঘটে যাওয়া একটি সম্ভাব্য বিস্ফোরণে ভবনটির বড় অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ বছর বয়সী দুই নারী নিহত হয়েছেন।
দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওই শপিংমলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি টোকিওতে সাংবাদিকদের বলেন, 'এখনও এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। এটি সময়ের বিরুদ্ধে একটি লড়াই। যত বেশি সম্ভব মানুষকে উদ্ধার ও বাঁচাতে আমরা ঘটনাস্থলে থাকা সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগাব।'
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই শপিংমলে সম্ভাব্য গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। জাপান সরকারের প্রধান মুখপাত্র মিনোরু কিহারা বলেন, উদ্ধারকারীরা ভবনের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন। তবে ঘটনার কারণ এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।
জরুরি দমকল ও উদ্ধারকারী দল, পুলিশ এবং প্রায় ১৭০ জন সেনাসদস্য ভবনের যেসব অংশ থেকে সাহায্যের আবেদন এসেছে, সেসব স্থানে উদ্ধারকাজে মনোযোগ দিচ্ছেন। ভূমিকম্পকবলিত পুরো এলাকায় উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য চার হাজার ৫০০ জনের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি কাগজ কারখানায় চিমনি ধসে পড়ার ঘটনায় সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েক ডজন আহত ব্যক্তির চিকিৎসা চলছে বলে জানা গেছে।
এক দশক আগেও প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রদেশজুড়ে প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর তারা মোট ৩৮৬টি জরুরি ফোনকল পেয়েছে। এসবের মধ্যে ভবন ধসে পড়া এবং আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের অনুরোধ ছিল।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রায় সাত লাখ জনসংখ্যার মধ্য কিউশুর সবচেয়ে বড় শহর কুমামোতো নগরীর প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে।
যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে, সেসব এলাকার বাসিন্দাদের আগামী প্রায় এক সপ্তাহ আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কায় সতর্ক থাকতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
বুধবার তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর মধ্যে এখনও ৩৬ হাজারের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
কয়েকটি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছে উকি শহরের একটি হাসপাতাল জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছে না।
হাসপাতালটির প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, 'এটি এখন অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থায়ী হাসপাতালের মতো হয়ে গেছে।'
শহরের আরেকটি হাসপাতাল জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর আহত ৮৬ জনকে ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের সক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন রোগী ভর্তি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর।
ভূমিকম্পের সময় দ্রুতগতির ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রেন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। কম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জনসাধারণের সবচেয়ে বেশি নজর ছিল প্রদেশটির সবচেয়ে বড় শপিংমলটির ধসে পড়ার ঘটনায়।
প্রায় ২০০টি দোকান থাকা ওই শপিংমলের এক পাশ সম্পূর্ণ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে ইস্পাতের কাঠামো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এবং ধ্বংসাবশেষের পাশের গাড়ি রাখার স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বলে ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে।
শপিংমল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের একজন মুখপাত্র জানান, প্রাথমিক ভূমিকম্পের পরপরই ক্রেতা ও কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তার সঠিক কারণ এখনও অস্পষ্ট।
টোকিওর শেয়ারবাজারে বুধবার দিনের শুরুতে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়। তবে প্রধান শেয়ারসূচক শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
এলাকাটিতে কারখানা থাকা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা বুধবার পর্যন্ত তাদের কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা স্থানীয় কারখানা থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার গভীর রাত থেকেই ধীরে ধীরে উৎপাদন কার্যক্রম আবার শুরু করা হয়েছে।
ভূমিকম্পে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধান মহাসড়কগুলোতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
আগ্নেয়গিরি ও সমুদ্রগর্ভের গভীর খাদবেষ্টিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'অগ্নিবলয়' অঞ্চলে অবস্থিত জাপানে বিশ্বের ৬ দশমিক ০ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্প ঘটে।
দশ বছর আগে কুমামোতোতে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২৭৫ জন নিহত এবং আরও দুই হাজার ৭৩৯ জন আহত হন। ওই ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার মধ্যে শহরের ঐতিহাসিক দুর্গের দেয়ালও ছিল। দুর্গটি অঞ্চলটির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পেও ওই দুর্গসহ বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আংশিকভাবে ধসে পড়েছে ভারী টালির ছাদযুক্ত কয়েকটি উপাসনালয় এবং সপ্তদশ শতাব্দীর একটি চা-পানাগারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
