অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়ার তথ্য ফাঁসে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গে দর-কষাকষিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদ কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ খবর প্রকাশের ফলে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল ভাবা হচ্ছে এবং এটি ইরানের সঙ্গে দরকষাকষিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
মার্কিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প যখন ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে বারবার তীব্র সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, ঠিক সেসময়েই এ খবর প্রকাশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা ছয়টি সূত্র জানায়, ট্রাম্প গোলাবারুদের ঘাটতি সম্পর্কিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন।
তাদের অনেকে জানান, ট্রাম্প বেশ কয়েক মাস ধরেই গোলাবারুদের সম্ভাব্য ঘাটতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং এসব সংবাদে প্রকাশিত কোনো তথ্যই তার অজানা না। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব তথ্য প্রকাশ হওয়ায় এবং বিষয়টি ক্রমেই জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রচুর পরিমাণে 'গোলাবারুদ' রয়েছে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু ধরনের। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্ল্যান্ট ও কারখানা নির্মাণ করছে।
তবে প্রকাশিত কিছু তথ্য যে সঠিক, তা ট্রাম্প পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছেন।
তিনি জানান, তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তিনি দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
পরবর্তীতে ওভাল অফিসে তিনি স্বীকার করেন, নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ কিছুটা 'হ্রাসমান', তবে তুলনামূলক কম উন্নত অস্ত্রের সংস্থান 'কার্যত সীমাহীন'।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হওয়ার জন্য ট্রাম্প অবশ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর অসন্তুষ্ট নন।
ট্রুথ সোশ্যালে আরেক পোস্টে ট্রাম্প জানান, পিট হেগসেথের কাজে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।
এক কর্মকর্তা জানান, 'তিনি কখনোই পিটকে দোষ দেননি। তার পুরো ক্ষোভ তথ্য ফাঁসকারীদের ওপর।'
তথ্য ফাঁসের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে ট্রাম্প বিচার বিভাগকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য প্রকাশ করে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পর তার ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়।
চলতি সপ্তাহে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগ ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থারও প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা হয়ে গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২,২০০টি প্যাট্রিয়ট এবং ৪৫২টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।
এই তথ্য প্রকাশের ফলে শুধু মার্কিন কর্মকর্তারাই নন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারাও উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প যদি চলমান সংঘাত আরও বাড়ান, তাহলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই ঘাটতি ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ আমেরিকার তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা স্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ায় তাদেরও সম্ভাব্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
আঞ্চলিক একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে এর জবাবে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি কেন্দ্র এবং পানি শোধন কারখানাগুলোতে (ডিস্যালিনেশন ফ্যাসিলিটি) পাল্টা হামলা চালানো হবে।
গত এক সপ্তাহ কাতার ও সৌদি আরবের নেতাদের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে তৈরি হওয়া জনমত নিয়ে ট্রাম্প যত বেশি ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মধ্যে ততই ধারণা জোরালো হচ্ছে যে প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী কর্মকর্তারাই এসব তথ্য ফাঁস করছেন। তাদের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে এ সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, ইরানে নতুন করে বিমান হামলা বাতিলের সিদ্ধান্তের আগে আবারও অস্ত্রভাণ্ডারের বিষয়টি ট্রাম্পের সামনে তোলা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানো নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টারাও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদ দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই অস্ত্রের মজুদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সেসময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের কাছে বিষয়টি জানতে চান। হেগসেথ তখন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পেন্টাগন সমস্যাটি সমাধানে কাজ করছে।
অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর আগেই জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ অন্যান্য সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান মার্কিন অস্ত্রের মজুদে প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে যেসব অস্ত্র ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য সংরক্ষিত।
এরপর থেকে ট্রাম্প অস্ত্রাগার খালি হওয়ার জন্য পূর্ববর্তী জো বাইডেন প্রশাসনকে দায়ী করে আসছেন। তার অভিযোগ, ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর কারণেও মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গত ২৭ জুলাই এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে। সত্যি বলতে আমি আরও বেশি অস্ত্র রাখতে চাই। কিন্তু বাইডেন ইউক্রেনকে এত বেশি অস্ত্র দিয়েছে যে আমাদের মজুদ কমে গেছে।'
পেন্টাগন দীর্ঘদিন ধরেই দ্রুত অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধে ইসরায়েল ও কিয়েভকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের পর, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বর্তমান যুদ্ধ এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত জুলাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে চাপ দিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে শীর্ষ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের প্রধানও অংশ নেন। যুদ্ধ শুরুর সময়ও একই ধরনের একটি বৈঠক হয়েছিল।
এছাড়া গত মাসে ট্রাম্প 'ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট' জারি করে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত অস্ত্র তৈরিতে বাধ্য করেন।
এক নথিতে তিনি উল্লেখ করেন, 'এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় প্রতিরক্ষা বা প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি কর্মসূচির জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।'
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদক্ষেপের ফল পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
