মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ৩০ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান চলাচল অব্যাহত ইরানের
আমেরিকা যখন ইরানের বিমান খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সাফল্য উদযাপন করছে, ইরান অপরদিকে দাবি করছে—তারা শুধু তেহরান থেকেই প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান চলাচল অব্যাহত রেখেছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আমেরিকা ইরানের পুরো বিমান খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, এ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে "অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ" করা। ওয়াশিংটন বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছিল নিয়ম মেনে চলার জন্য। এরপর বেসেন্ট ঘোষণা দেন, সারাবিশ্বে ইরানের সমস্ত এয়ারলাইন্সের "কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'যদি তারা অবতরণ করে, তবে আপনি তাদের জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবেন না, অবতরণ পরিষেবা দিতে পারবেন না, এমনকি তাদের কাছে টিকিট বিক্রি পারবেন না—অন্যথায় আপনাকে ডলার লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া হবে।'
মার্কিন এ পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে তেহরান সোমবার জানায়, তারা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। তেহরানের ফ্লাইট অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রবিবার তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৪১টি ফ্লাইট উড্ডয়ন বা অবতরণ করেছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগের দুই দিনের দৈনিক গড় ফ্লাইট সংখ্যা (৮০ থেকে ৯০টি)-র তুলনায় এটি অনেক কম। ইরানের প্রধান দুটি এয়ারলাইন্স—জাতীয় পতাকাবাহী 'ইরাম এয়ার' এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন 'মাহান এয়ার' এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রবিবার তেহরান বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা ২৪টি ফ্লাইটের মধ্যে মাত্র ৫টি মাহান এয়ার এবং ২টি ইরান এয়ার পরিচালনা করেছে। অথচ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে তারা প্রত্যেকে গড়ে প্রায় ১০টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করত। এই পরিসংখ্যানটি বেসেন্টের দেওয়া তথ্যের (যিনি বলেছিলেন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে) চেয়ে বেশি, তবে তেহরান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি করা ৬০টি ফ্লাইটের চেয়ে কম।
বিমানবন্দরের পরিচালককে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে যে, 'এখনও ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান পরিষেবা চালু রয়েছে।' চীন, রাশিয়া এবং তুরস্ক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করছে তেহরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক মিত্র বেইজিং মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞাকে "অবৈধ এবং একপাক্ষিক" হিসেবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। মাহান এয়ারের ফ্লাইটগুলো আগের মতোই চীনের বিমানবন্দরগুলোতে যাতায়াত বজায় রেখেছে।
রাশিয়া এবং পাকিস্তানেও ফ্লাইট চলাচল অব্যাহত রয়েছে, যদিও কোনো দেশই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
তবে মাহান এয়ার জানিয়েছে, তুর্কি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তারা তুরস্কে তাদের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রেখেছে। তা সত্ত্বেও জাতীয় পতাকাবাহী ইরান এয়ার ইস্তাম্বুলে দৈনিক ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে, পাশাপাশি ইরানের আরও কয়েকটি ছোট এয়ারলাইন্স তুরস্কের অন্যান্য শহরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, বেলারুশ এবং মালয়েশিয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রয়োগ করা হয়নি, যেখানে মূলত ইরানের ছোট এয়ারলাইন্সগুলো সেবা দিয়ে থাকে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে কি না, তা তারা এখনো ঘোষণা করেনি।
গাল্ফ বা পারস্য উপসাগরীয় দেশসমূহ ইউরোপ, এশিয়া কিংবা আফ্রিকায় যেতে ইচ্ছুক ইরানি যাত্রীদের জন্য অন্যতম প্রধান সংযোগকেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত তার ভূখণ্ডে ইরানের সব ধরনের আসা-যাওয়ার ফ্লাইট "পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত" স্থগিত করেছে। কুয়েতের সিভিল এভিয়েশনের ডিরেক্টরেট জেনারেলের একটি সূত্র সোমবার এএফপি-কে জানান, সাত মাস আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোর কুয়েতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও তাদের বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য অনুযায়ী বিমান চলাচল বন্ধ রেখেছে। ইরানের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা 'আইএসএনএ' জানিয়েছে, ইরানি ফ্লাইটগুলো এখন আর আজারবাইজান ও জর্জিয়া এবং ইরাকে যেতে পারছে না। তবে ইরাক এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য ছাড় চাইছে ইরাক। ইরাক সরকার শনিবারে জানিয়েছে, ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পেতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে রোগী, শিক্ষার্থী ও পুণ্যার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গণমাধ্যম শাখা থেকে বলা হয়েছে, 'ইরাকের কয়েকটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দরকে এসব বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য ইরাক সরকার মার্কিন পক্ষের সাথে সরাসরি আলোচনা করছে।' বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একটি ছাড় পেলে চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা, ধর্মীয় সফর এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থসহ মানবিক কারণে ফ্লাইট পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
ইরানি এয়ারলাইন্সগুলো মূলত ইরাকি শিয়া পুণ্যার্থীদের ইরানের পবিত্র শহরগুলোতে কিংবা ইরানিদের ইরাকের তীর্থস্থানগুলোতে যাতায়াতের সুবিধা দিয়ে থাকে। এছাড়া এ ফ্লাইটগুলো ইরানে পড়তে যাওয়া ইরাকি শিক্ষার্থী এবং সেখানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের যাতায়াতে সাহায্য করে।
