ইরানের মারাত্মক খায়বার-শেকান মিসাইল কি চীনের প্রযুক্তি সহায়তায় তৈরি?
ইরানের মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র "খাইবার শেকান"-এর ধ্বংসাবশেষের নতুন কিছু ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রটিতে জ্যামিং-বিরোধী স্যাটেলাইট নেভিগেশন ও দিক-পরিবর্তনক্ষম (ম্যানুভারেবল) ওয়ারহেড প্রযুক্তির সংমিশ্রণের সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে। ৪-৫ আগস্টে উত্তর-পশ্চিম ইরানে উদ্ধার হওয়া এই ধ্বংসাবশেষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটির এতদিন অপ্রকাশিত গাইডেন্স প্রযুক্তি ও থার্মাল-প্রোটেকশন আর্কিটেকচার সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাওয়া গেছে।
উদ্ধারকৃত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে একটি তাপ-সহনশীল কম্পোজিট হিট শিল্ড এবং ফোর-এলিমেন্ট 'কন্ট্রোল্ড রিসেপশন প্যাটার্ন অ্যান্টেনা' (সিআরপিএ)। এই সংযোজন নির্দেশ করে যে, ইরানি প্রকৌশলীরা প্রতিপক্ষের তীব্র ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলায় ক্ষেপণাস্ত্রের নেভিগেশন বা গতিপথ নিখুঁত রাখতে ইলেকট্রনিক কাউন্টার-কাউন্টারমেজার যুক্ত করেছেন।
জ্যামিং-বিরোধী সিআরপিএ প্রযুক্তি যেভাবে কাজ করে
একটি সাধারণ অ্যান্টেনার বদলে ৪-কম্পোনেন্টের সিআরপিএ ব্যবস্থা সংকেতের স্তর এবং শক্তি তুলনা করে নির্দিষ্ট দিক থেকে আসা জ্যামিং বা ইলেকট্রনিক সংকেত বাতিল করতে পারে। এর ফলে শত্রুপক্ষ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার চালানো সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্রটি স্যাটেলাইট নেভিগেশনে যুক্ত থাকতে পারে।
মাল্টি-কনস্টেলেশন সুবিধা: এটি যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস (জিপিএস), রাশিয়ার গ্লোনাস, ইউরোপের গ্যালিলিও-র পাশাপাশি চীনের বেইদু স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে সক্ষম। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হলেও বিকল্প নেভিগেশনের সুবিধা থাকে।
জাইরোস্কোপিক বিচ্যুতি সংশোধন: ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরের ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম (আইএনএস) দীর্ঘ পথ অতিক্রমের সময় সামান্য বিচ্যুতির শিকার হয়। সিআরপিএ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে ওই বিচ্যুতি দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব হয়।
কঠিন জ্বালানি চালিত ইঞ্জিন, মোবাইল লঞ্চার এবং প্রায় ১,৪৫০ কিলোমিটার পাল্লার সুবাদে খাইবার শেকান মিসাইলের উৎক্ষেপণের পূর্বপ্রস্তুতির সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কম লাগে। জ্যামিং-বিরোধী স্যাটেলাইট নেভিগেশন যুক্ত হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্রটির বিচ্যুতি কমে যায়, যা শত্রুপক্ষের নির্দিষ্ট বিমানঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার, রাডার স্টেশন ও মিসাইল ডিফেন্স ব্যাটারিতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সাহায্য করে।
উড্ডয়নের শেষ ধাপে (টার্মিনাল ফেইজ) ওয়ারহেডটির পথ ও গতি পরিবর্তন করার ক্ষমতার কারণে প্যাট্রিয়ট, থাড বা অ্যারোর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর পক্ষে এর পরবর্তী অবস্থান পূর্বানুমান করা এবং প্রতিরোধ করা ভীষণ কঠিন হয়ে ওঠে।
খাইবার শেকানের উদ্ধার হওয়া অ্যান্টেনাটির নকশা ও বাহ্যিক গঠন চীনের নানচিং শাইনওয়েভ টেকনোলজি-র তৈরি এসডব্লিউটি-জেআরএল১ সিরিজের সঙ্গে দৃশ্যত সাদৃশ্যপূর্ণ। এটি একটি বহুল ব্যবহৃত চীনা মাল্টি-জিএনএসএস অ্যান্টি-জ্যামিং সিস্টেম।
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই সাদৃশ্য ইরানের সামরিক বাহিনীকে চীন সরকারের প্রযুক্তি হস্তান্তর বা প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার প্রমাণ নয়। ইরান হয়তো বেসামরিক বা বাণিজ্যিক সাপ্লাই চেইন থেকে এসব খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেছে, অথবা রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে নিজস্ব নকশায় এটি তৈরি করেছে।
থাড, প্যাট্রিয়ট ও অ্যারো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ
খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ট্রাই-কনিক ম্যানুভারেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল (এমএআরভি) ব্যবহার করে, যা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর শেষ মুহূর্তে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম।
প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পূর্বানুমান করা সম্ভব হলেও, শেষ মুহূর্তে খাইবার শেকানের এমএআরভি ডানে-বামে বা উচ্চতা পরিবর্তন করতে পারায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট, থাড এবং ইসরায়েলের অ্যারো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সেটিকে ইন্টারসেপ্ট বা ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে বায়ুমণ্ডলে চরম গতিতে প্রবেশের সময় সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় উত্তাপ ও প্লাজমার কারণে স্যাটেলাইট সিগন্যাল সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের ঠিক আগের মুহূর্তে স্যাটেলাইট থেকে নির্ভুল অবস্থান সংশোধন করে নেওয়ায়, শেষ মুহূর্তের চালচলন অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও লক্ষ্যভেদী হয়।
যদিও সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় অধিকাংশ খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে, তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার প্রমাণ করছে যে, বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য প্রযুক্তি ও যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইরান তার ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়িয়ে চলেছে।
