কিয়েভ লক্ষ্য করে ছোড়া ২৭ রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি ঠেকাতে পেরেছে ইউক্রেন
শনিবার রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। এর পরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আবারও আরও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনে ৩৫টি ক্ষেপণাস্ত্র, যার মধ্যে ২৭টি ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এবং ১৮৫টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
তিনি বলেন, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইন্টারসেপ্টর না থাকায় মাত্র একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে। এমন মন্তব্য তিনি এমন সময় করলেন, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কিয়েভে কয়েক দফা হামলার সময় এক ডজনের বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এতে ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে চার শিশু রয়েছে, যারা শরীরে শার্পনেলের আঘাত ও গভীর ক্ষতের শিকার হয়েছে।
এ সপ্তাহে রাজধানী কিয়েভে এটি দ্বিতীয় বড় হামলা। বৃহস্পতিবারের হামলায় নয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ক্রিভি রিহের কাছে একটি গ্রামের একই পরিবারের ছয় সদস্য ছিলেন। ওই দিন একটি সন্দেহভাজন রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পোল্যান্ডের ভূখণ্ডেও আঘাত হানে।
প্রায় ৩০ লাখ মানুষের শহর কিয়েভের সাতটি জেলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮টি আবাসিক ভবন, একটি স্কুল, লিথুয়ানিয়ার দূতাবাস এবং বিভিন্ন অবকাঠামো।
ইউক্রেনের প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরের দারনিৎসকি জেলায় সাতজন এবং পশ্চিম তীরের সলোমিয়ানস্কি জেলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, "ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর আমাদের মানুষের জীবন বাঁচায়। আর প্রতিটি রাত, যখন এগুলো থাকে না, তখন আরও প্রাণহানি ঘটে।"
যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। প্রায় ৭৫০ মাইল দীর্ঘ সম্মুখসারিজুড়ে লড়াই চলছে।
তবে এ বছর রাশিয়ার অগ্রগতি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। একই সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল স্থাপনা, রসদ কেন্দ্র ও অস্ত্র উৎপাদন কারখানায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে রাশিয়া কিয়েভসহ ইউক্রেনের অন্যান্য শহরে হামলা আরও জোরদার করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সংকটে রয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির কয়েক গুণ বেশি গতিতে উড়ে আসে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জরুরি ভিত্তিতে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আকাশের লড়াইই এই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করবে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা যত শক্তিশালী হবে, শান্তি তত কাছে আসবে।"
নাটো সম্মেলনে এক মাসেরও কম সময় আগে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তখন তিনি জেলেনস্কিকে বলেছিলেন, "আমরা তোমাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেব। দারুণ ব্যাপার, তাই না?"
তিনি আরও বলেছিলেন, "এতে সে আর অভিযোগ করতে পারবে না যে আমরা যথেষ্ট দিচ্ছি না। আমি বলেছি, নিজেরাই বানাও।"
তবে শুক্রবার ট্রাম্প ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন।
তিনি বলেন, "আমরা এখনো সে বিষয়ে সম্মত হইনি। আলোচনা চলছে। কিন্তু এ ধরনের প্রযুক্তি হস্তান্তর করা খুব কঠিন বিষয়।"
ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটনকে "এ ধরনের প্রযুক্তি অন্য কাউকে তৈরির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "খুব বিচক্ষণ হতে হবে, খুব সতর্ক থাকতে হবে। যাদের আপনি এই প্রযুক্তি দেবেন, তারা একদিন আপনার বিরুদ্ধেও যেতে পারে। এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়।"
এদিকে কৃষ্ণসাগরে শনিবার রাতে ইউক্রেনীয় দুটি ড্রোন হামলায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসআটমের মালিকানাধীন একটি বেসামরিক জাহাজ ডুবে গেছে বলে সংস্থাটির প্রধান আলেক্সেই লিখাচেভ জানিয়েছেন।
হিমায়িত খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রী বহনকারী ওই জাহাজের ১৭ জন নাবিকই হামলা থেকে বেঁচে গেছেন।
এ ছাড়া জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ইউক্রেন রাশিয়ার বাশকোর্তোস্তান অঞ্চলের তিনটি তেল শোধনাগারের অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। অঞ্চলটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরে।
রাশিয়ার দখলকৃত ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোলে শনিবার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ৬০ বছর বয়সী এক নারী নিহত এবং আরও দুজন আহত হয়েছেন বলে মস্কো-নিযুক্ত প্রশাসনের প্রধান মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রুশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম অ্যাস্ট্রা জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় একটি ড্রোন হামলায় উফা শহরের একটি তেল শোধনাগারে আগুন লেগেছে।
