শেখ হাসিনাকে ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি: পার্লামেন্টকে দেশটির সরকার
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের শেষের দিকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে নিজেই সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অনুরোধও দেশটির প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের সভাপতিত্বে গঠিত পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির কাছে জমা দেওয়া সরকারের 'অ্যাকশন টেকেন' প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভারতীয় পার্লামেন্টে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি ভারতের দীর্ঘদিনের মানবিক ও সভ্যতাগত ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। যারা গুরুতর সংকট, নির্যাতন বা অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়েন, তাদের আশ্রয় দেওয়ার নীতি ভারত বরাবরই অনুসরণ করে এসেছে।
আরও জানায়, তবে এই ধরনের মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়—ভারতের ভূখণ্ড কোনোভাবেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে সংসদীয় কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারকে এই মানবিক ও নীতিগত অবস্থান বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
পাশাপাশি এ ধরনের সংবেদনশীল পরিস্থিতি যথাযথ কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালনারও সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কমিটির মতে, দীর্ঘদিন ভিসা পরিষেবায় সীমাবদ্ধতা থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কেও তার বিরূপ প্রভাব পড়ে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা পরিষেবা স্থগিত করেছিল। প্রায় দুই বছর পর, ২০২৬ সালের ২৮ জুন থেকে সেই পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি বছরেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। সেই কারণে কমিটি কেন্দ্রকে ঢাকার সঙ্গে দ্রুত নতুন করে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, নতুন জলবণ্টন চুক্তির আলোচনা হওয়া উচিত সর্বশেষ জলবিদ্যাগত তথ্য, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রেখে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে বজায় রাখার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
তাদের মতে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে অর্থনীতি, সংযোগ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ' শীর্ষক কমিটির নবম প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে দেশটির সরকারের নেওয়া পদক্ষেপসংবলিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান, ভিসা নীতি, গঙ্গার জলচুক্তির নবীকরণ এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে।
